বরাক তরঙ্গ, ২৪ জুলাই : অসমের ২৫টি জেলার বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে শুক্রবার জেলা আয়ুক্তদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মুখ্যমন্ত্রী ড. হিমন্ত বিশ্ব শর্মা সাম্প্রতিক বন্যা পরিস্থিতি, ক্ষয়ক্ষতি এবং ত্রাণ কার্যক্রম নিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন।
মুখ্যমন্ত্রী জানান, উজান অসমের তিনটি জেলায় সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যায় এখন পর্যন্ত ৪৭ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আরও ৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন।
বন্যার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ১৯ জুলাই থেকে নাগাল্যান্ডে হওয়া অস্বাভাবিক ভারী বৃষ্টিপাতের প্রভাবেই চরাইদেউ, শিবসাগর ও যোরহাট জেলায় ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়। ১৮ থেকে ২০ জুলাইয়ের মধ্যে নাগাল্যান্ড, অসম, মণিপুর ও মেঘালয়ে অতিবৃষ্টি হয়। ওই সময় অসমে স্বাভাবিকের তুলনায় ৩৩ শতাংশ, মণিপুরে ১২০ শতাংশ, মেঘালয়ে ৪০ শতাংশ এবং নাগাল্যান্ডে ১৮১ শতাংশ বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, নাগাল্যান্ডের মোকোকচুং জেলায় ৪৯৩ শতাংশ, ওখায় ১০৮ শতাংশ এবং মন জেলায় ৪৫ শতাংশ অতিরিক্ত বৃষ্টি হয়েছে।
অন্যদিকে চরাইদেউ জেলায় স্বাভাবিকের তুলনায় ৪৩৬ শতাংশ এবং শিবসাগরে ১৩৪ শতাংশ বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। প্রবল বর্ষণের ফলে বিস্তীর্ণ এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়ে। পাশাপাশি ব্রহ্মপুত্রের জলস্তর বেড়ে যাওয়ায় চরাইদেউ ও শিবসাগরের জল দ্রুত নদীতে নামতে পারেনি।
মুখ্যমন্ত্রী জানান, চরাইদেউ জেলার তিনটি রাজস্ব চক্রের ১৫২টি গ্রাম বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেখানে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং একজন নিখোঁজ রয়েছেন। শিবসাগরে পাঁচটি রাজস্ব চক্রের ৩৩৩টি গ্রাম বন্যার কবলে পড়েছে। সেখানে ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৬ জন নিখোঁজ। যোরহাটে মৃত্যু হয়েছে ৮ জনের। চলতি বছরে রাজ্যের মোট ৭৭টি রাজস্ব চক্র বন্যায় প্লাবিত হয়েছে।
ত্রাণ কার্যক্রম সম্পর্কে তিনি বলেন, চরাইদেউ জেলার সব বন্যাকবলিত এলাকায় ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া হলেও নাজিরা বিধানসভা কেন্দ্রের প্রায় ৩০ শতাংশ এবং শিবসাগর কেন্দ্রের প্রায় ২০ শতাংশ এলাকায় এখনও প্রশাসন পৌঁছাতে পারেনি। জল কমলেও রাস্তায় জমে থাকা বালি ও পলির কারণে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।
তিনি জানান, গুয়াহাটি, ডিব্রুগড় ও তিনসুকিয়া থেকে শিবসাগরে ত্রাণ পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী জেলা থেকে নৌকাও আনা হয়েছে খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার জন্য। আকাশপথে ত্রাণ ফেলার চেষ্টা করা হলেও অনেক সামগ্রী নষ্ট হয়েছে। প্রয়োজনে সেনাবাহিনীর সহায়তা নেওয়া হবে।
ভারতীয় বায়ুসেনার সহযোগিতার প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, এ বিষয়ে ভারতীয় বায়ুসেনা ও গণপূর্ত বিভাগের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। ২৫ জুলাই কেন্দ্রীয় সরকারের একটি প্রতিনিধি দল বন্যা পরিস্থিতি পরিদর্শনে অসমে আসবে। সম্ভাব্য রোগবালাই মোকাবিলায় ডিব্রুগড় ও যোরহাট মেডিকেল কলেজের চিকিৎসক ও নার্সদের দল প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বন্যায় গবাদিপশুর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বহু শিক্ষার্থীর বইপত্র ও গুরুত্বপূর্ণ নথিও নষ্ট হয়েছে। তিন দিনের মধ্যে কৃষি, পশুপালন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা মন্ত্রীরা ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলি পরিদর্শন করবেন। বন্যা-পরবর্তী সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত স্কুল ও অন্যান্য পরিকাঠামো মেরামত ও পুনর্নির্মাণ করা হবে। বর্তমানে দুর্গত মানুষের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন পোশাক।
নাগাল্যান্ডের নিপকো বিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে জল ছাড়া প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, বৃহস্পতিবার জল ছাড়া হলেও এখনও পর্যন্ত গোলাঘাট বা সরুপথারে তার প্রভাব পড়েনি। তবে আগামী দু’দিন আরও জল ছাড়া হতে পারে, তাই সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে তিনি বলেন, অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের কারণেই এই দুর্যোগ সৃষ্টি হয়েছে এবং বহু ব্যক্তি ও সংস্থা ত্রাণে এগিয়ে এসেছেন। বর্তমানে দুর্গতদের জন্য পোশাকের চাহিদাই সবচেয়ে বেশি।



