বরাক তরঙ্গ, ২৮ সেপ্টেম্বর : বাঙালি জাতীয় পরিষদ, অসম-এর এক সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে রবিবার। পরিষদের গুয়াহাটি মহানগর জেলা কমিটি গঠন করার জন্য। গুয়াহাটিস্থিত পল্টন বাজার বাঙালি হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলে অনুষ্ঠিত এই সভায় পৌরহিত্য করেন অধ্যাপিকা মীনাক্ষী চক্রবর্তী সোম।
প্রসঙ্গত, সভায় ভাষণ প্রসঙ্গে পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি চিত্ত পাল বলেন, মুখ্যমন্ত্রী ড. হিমন্ত বিশ্ব শর্মার নেতৃত্বাধীন সরকার নিঃসন্দেহে পাহাড়-বরাক উপত্যকা সহ উজান ও নিম্ন অসমের অভূতপূর্ব উন্নয়নমূলক কাজ সম্পাদন করেছে। গুয়াহাটি থেকে নগাঁও- হাফলং দিয়ে মহাসড়কের কাজ সম্পূর্ণ হওয়ার ফলে দুই উপত্যকার মানসিক ও ভৌগলিক দূরত্ব যথেষ্ট হ্রাস পেয়েছে। গুয়াহাটি মহানগরীতে চতুর্দিকে উড়াল পুল নির্মাণের পাশাপাশি রাস্তাঘাটেরও যথেষ্ট উন্নয়ন হয়েছে। সমগ্র অসমের ক্ষেত্রে উন্নয়নের একই চিত্র পরিস্ফুট হয়ে উঠেছে। বরাক উপত্যকায় সচিবালয় নির্মাণ, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। যদিও প্রদীপের নিচে যেমন অন্ধকার থাকে, ঠিক তেমনি হিন্দু বাঙালিরা তাঁদের রাজনৈতিক অধিকারের পরিসরে অমাবস্যার চাঁদ দেখতে বাধ্য হচ্ছেন। স্বাধীনতার পর থেকেই বরাক উপত্যকার একজন জনপ্রতিনিধি কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভায় স্থান পেয়ে এসেছেন। যথাক্রমে প্রয়াত অরুন কুমার চন্দ, জ্যোৎস্না চন্দ, ময়ীনুল হক চোধুরী, রশিদা হক চৌধুরী, নীহাররঞ্জন লস্কর, সন্তোষ মোহন দেব ও কবীন্দ্র পুরকায়স্থ প্রমুখ কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছিলেন। কিন্তু বিগত সতেরো বছর ধরে নব্বই লক্ষ বাংলা ভাষাভাষী মানুষ থাকা সত্ত্বেও কেন্দ্রে একজন বাঙালি মন্ত্রী নেই। রাজনীতির ময়দানে সম্পূর্ণ নবাগত তথা জনপ্রিয় গায়ক পবিত্র মার্ঘেরিটাকে যেভাবে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সভায় স্থান করে দিয়েছেন, তদ্রূপ, মুখ্যমন্ত্রী শর্মা বরাক উপত্যকার একজন সাংসদকেও কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভায় অন্তর্ভূক্তি করিয়ে দিতে পারেন। তবেই এই জনগোষ্ঠীর প্রতি সুবিচার করা হবে। অন্যথা, শুধু মিষ্টি কথায় চিড়ে ভিজবে না।
উল্লেখ্য, চিত্ত পাল আগামি দিনে বাঙালির ভাষা-সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয় অক্ষুণ্ন রাখার স্বার্থে নিঃস্বার্থ ভাবে কাজ করার জন্য এগিয়ে আসতে আহ্বান জানান।
পরিষদের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক পঙ্কজ কুমার দেব ভাষণ প্রসঙ্গে বলেন, বাঙালি জাতীয় পরিষদ, অসম-এর আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশের সবেমাত্র দু’মাস পূর্ণ হয়েছে। এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই সংগঠনের সংবিধান প্রণয়ন থেকে শুরু করে সাংগঠনিক ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাড়া মিলেছে। ইতিমধ্যে গুয়াহাটি মহানগরকে নিয়ে মোট তিনটি জেলা কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। আগামী দিনে নিম্ন অসম, মধ্য অসম-সহ বরাক উপত্যকায় সংগঠন বিস্তারের প্রক্রিয়া শুরু হবে। একই সঙ্গে, ধীরে ধীরে সদস্যসংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। সংগঠনের কর্মসূচির প্রতি বুদ্ধিজীবী সমাজেরও আগ্রহ এবং ইতিবাচক সাড়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এই অংশগ্রহণ আগামী দিনে সংগঠনকে আরও সুসংগঠিত ও শক্তিশালী করতে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, অসমের বাঙালিদের মৌলিক ও রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাঙালি জাতীয় পরিষদ, অসম দৃঢ়ভাবে কাজ করছে এবং ভবিষ্যতেও এই অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে সংগঠিতভাবে তার ভূমিকা অব্যাহত রাখবে।
সহকারী অধ্যাপিকা মীনাক্ষী চক্রবর্তী সোম তাঁর ভাষণে নীরদ সি চৌধুরীর উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, ক্ষমতার লোভে আমরা বহুধাবিভক্ত। আমাদের তুলনায় ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষেরা যথেষ্ট ঐক্যবদ্ধ ভাবে সামাজিক কাজ করেন। সমসাময়িক রাজনীতির চতুর কৌশল বাঙালিদের বিভাজন করে রেখেছে। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডই হচ্ছে পলিটিক্স। রাজনৈতিক বিজ্ঞান হচ্ছে পলিট্রিক্স একটা তত্ব। অসমের বাঙালিরা শক্তিতে সফল হতে পারবে না। যদিও ফোঁস করার মানসিকতা তৈরি করে শক্তি প্রদর্শন করতে তিনি আহ্বান জানান।
ইউনাইটেড বাঙালি ফোরাম-এর কার্যকরী কমিটির সভাপতি সহদেব দাস বাঙালি সংগঠন গুলোকে ঐক্যবদ্ধ হতে আহ্বান জানিয়ে বলেন, হাজার হাজার বিদেশি মামলা হাইকোর্টে ঝুলে রয়েছে। তদুপরি, ট্রাইব্যুনালেও অসংখ্য মামলা নিস্পত্তি বিহীন হয়ে ঝুলে রয়েছে। শাসন ক্ষমতায় যে সরকারই আসুক না কেন, বাঙালির এই সমস্যা অনন্তকাল ধরে সমস্যা হয়ে থাকবে। চিত্ত পালের নেতৃত্বে বাঙালি জাতীয় পরিষদকে আগামি দিনে রাজ্যের বাঙালিদের মনে আশার সঞ্চার করতে পারবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী শুভ্রাংশু দেব রিটায়ার্ড (আই আর এস)বলেন, আমাদের প্রথমে বাঁচার লড়াই করতে হবে। নাগরিকপঞ্জীর নাগপাশ থেকে বেরিয়ে বাঙালির অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সভায় কেন্দ্রীয় কমিটির অর্থ সচিব আশিষ দত্ত বক্তব্য রাখেন। গুয়াহাটি হাইকোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট প্রচারবিমুখ আশিষ দাশগুপ্ত এই সভায় অংশগ্রহণ করেন। গুয়াহাটি মহানগর জেলা কমিটিতে সহকারী অধ্যাপিকা মীনাক্ষী চক্রবর্তী সোমকে সভানেত্রী ও অঙ্কিত কুণ্ডু কে সাধারণ সম্পাদক মনোনীত করে এক কমিটি গঠন করা হয়েছে।



