বরাক তরঙ্গ, ২৭ এপ্রিল, সোমবার,
শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড—এই বহুল উচ্চারিত সত্য আজ বরাক উপত্যকার বাস্তবতায় যেন ক্রমশ ফিকে হয়ে আসছে। প্রতিটি অভিভাবক সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যতের আশায় শিক্ষার উপর ভরসা রাখেন। কিন্তু যখন সেই শিক্ষাই একাংশ অসাধু চক্রের কাছে লাভের ব্যবসায় পরিণত হয়, তখন তা শুধু হতাশাজনক নয়, সমাজের জন্য গভীর সংকটের ইঙ্গিত বহন করে।
বর্তমানে বরাকের অলি-গলি থেকে গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অস্বাভাবিক বিস্তার। নাম-যশ বা মানের তোয়াক্কা না করেই গড়ে উঠছে একের পর এক তথাকথিত আধুনিক স্কুল। বাহ্যিক চাকচিক্য, ইংরেজি মাধ্যমের লেবেল এবং উন্নত শিক্ষার প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করা হচ্ছে। অথচ বাস্তবে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় অংশেরই নেই কোনও সরকারি অনুমোদন, বৈধ কাগজপত্র বা প্রয়োজনীয় ডাইস কোড। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আর্থিক শোষণের অভিযোগ। ভর্তি সময় নানা ছাড়ের প্রতিশ্রুতি দিলেও পরে নির্দিষ্ট প্রকাশনীর ব্যয়বহুল বই, নির্দিষ্ট দোকান থেকে ইউনিফর্ম ও অন্যান্য সামগ্রী কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে অভিভাবকদের। এতে করে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো মারাত্মক আর্থিক চাপে পড়ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, কোনও অনুমোদন ছাড়াই প্লে-স্কুল থেকে উচ্চমাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া। অথচ একটি স্বীকৃত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য প্রয়োজন নির্দিষ্ট অবকাঠামো, প্রশিক্ষিত শিক্ষক-শিক্ষিকা, মানসম্মত পাঠক্রম এবং প্রশাসনিক অনুমোদন। এই মৌলিক শর্তগুলোর অধিকাংশই উপেক্ষিত হচ্ছে।
শিক্ষার মান নিয়েও প্রশ্ন উঠছে জোরালোভাবে। অনেক ক্ষেত্রে অদক্ষ ও অপ্রশিক্ষিত শিক্ষকদের দিয়ে পাঠদান করানো হচ্ছে, যেখানে ডিএলএড বা বিএড যোগ্যতা বাধ্যতামূলক। স্বল্প বেতনে শিক্ষক নিয়োগ করে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার খরচ কমানো হলেও, তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের উপর। ফলে প্রকৃত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়ে তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।
এই পরিস্থিতি নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক এবং তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপের দাবি রাখে। প্রশাসন ও শিক্ষা দপ্তরের উচিত কঠোর নজরদারি জোরদার করা, ভুয়ো ও অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে কঠিন ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং শিক্ষাক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি অভিভাবকদেরও সচেতন হতে হবে—প্রলোভনের ফাঁদে না পড়ে সঠিক তথ্য যাচাই করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।



