মব লিঞ্চিং : সভ্য সমাজের জন্য এক গভীর কলঙ্ক, ঐক্যবদ্ধভাবে মোকাবিলা করতে হবে

Spread the news

বরাক তরঙ্গ, ৮ জুন, সোমবার,
কোনও সভ্য ও গণতান্ত্রিক সমাজে আইনের শাসনের বিকল্প হতে পারে না জনতার বিচার। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হল, সাম্প্রতিক সময়ে দেশে বিভিন্ন প্রান্তে মব লিঞ্চিং বা উন্মত্ত জনতার হাতে মানুষ হত্যার ঘটনা বারবার সামনে আসছে। কখনও চুরির সন্দেহে, কখনও গোরু পাচারের অভিযোগে, কখনও বা গুজবের ভিত্তিতে নিরীহ মানুষকে নির্মমভাবে মারধর করে হত্যা করা হচ্ছে। এই প্রবণতা শুধু আইনশৃঙ্খলার জন্য নয়, মানবতা ও সামাজিক সম্প্রীতির জন্যও ভয়াবহ হুমকি।

মব লিঞ্চিংয়ের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিক হল, এতে বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ন হয়। কোনও ব্যক্তি অপরাধী কি না, তা নির্ধারণ করার দায়িত্ব আদালত ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার। কিন্তু যখন একদল মানুষ নিজেরাই বিচারক, জুরি ও জল্লাদের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, তখন রাষ্ট্রের আইনি কাঠামো প্রশ্নের মুখে পড়ে। এমন পরিস্থিতি গণতন্ত্রের ভিত্তিকেই দুর্বল করে দেয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহারও এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলছে। যাচাই-বাছাই ছাড়া ছড়িয়ে পড়া গুজব, বিদ্বেষমূলক প্রচার এবং উসকানিমূলক বার্তা মুহূর্তের মধ্যে জনমনে উত্তেজনা সৃষ্টি করছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, একটি ভুয়া বার্তাই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ভয়াবহ সহিংসতার রূপ নিয়েছে। তাই প্রযুক্তির এই যুগে তথ্য যাচাইয়ের সংস্কৃতি গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।

মব লিঞ্চিংয়ের ঘটনায় জাতি, ধর্ম বা সম্প্রদায়ের বিভাজন টেনে আনার প্রবণতাও সমানভাবে উদ্বেগজনক। কোনও অপরাধ বা সহিংস ঘটনার বিচার ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, আইনের ভিত্তিতেই হওয়া উচিত। মানবজীবনের মূল্য সর্বত্র সমান। তাই কোনও ঘটনার প্রতিবাদও হওয়া উচিত মানবিক ও ন্যায়বিচারের দৃষ্টিকোণ থেকে।

কার্বি আংলঙের এমন এক কর্মকাণ্ডে সম্প্রতি নগাঁও জেলা ও দায়রা আদালত ২০ জন দোষীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করার পাশাপাশি প্রত্যেককে ২০ হাজার টাকা করে জরিমানা করেছে। কার্বি আংলংয়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে গিয়ে দুই যুবক নীলোৎপল দাস ও অভিজিৎ নাথ উন্মত্ত জনতার আক্রমণের শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছিলেন। ঘটনাটি ২০১৮ সালের ৮ জুন ডকমকা এলাকার পাণজুরি গ্রামে সংঘটিত হয়েছিল।

একই ঘটনা পাথারকান্দির মামবাড়িতে ঘটে গত সপ্তাহে। তিন কিশোরকে গরু চোর সন্দেহে গণপিটুনি ও এয়ারগান দিয়ে গুলির ঘটনায় সভ্য সমাজকে কলঙ্কিত করেছে।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার, প্রশাসন, রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন এবং সাধারণ নাগরিক—সকলেরই দায়িত্ব রয়েছে। দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, দোষীদের কঠোর শাস্তি এবং গুজব রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে সমাজে সহনশীলতা, আইনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং মানবিক মূল্যবোধের চর্চা বাড়াতে হবে। মানবতার স্বার্থে, গণতন্ত্রের স্বার্থে এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার স্বার্থে মব লিঞ্চিংয়ের বিরুদ্ধে সর্বস্তরের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *