বরাক তরঙ্গ, ২ নভেম্বর : সাহিত্য, সংগীত, নৃত্য ও কবিতার মনোজ্ঞ পরিবেশনার মধ্য দিয়ে শিলচরে অনুষ্ঠিত হলো এক বিশেষ সাহিত্য অনুষ্ঠান। সোমবার সন্ধ্যায় মেহেরপুরের একটি ব্যাঙ্কোয়েট হলে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে লেখিকা ডাঃ অপরাজিতা চক্রবর্তীর রচিত তিনটি গ্রন্থের আনুষ্ঠানিক প্রকাশ করা হয়। গ্রন্থ তিনটি হলো On Going, Good Exists for Those Who Believe In It এবং My Boat of Dreams।অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ সমর কান্তি রায় চৌধুরী। সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিলচর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগের প্রধান ড. বিশ্বদীপ চৌধুরী এবং অসম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ড. দীপেন্দু দাস।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সমর কান্তি রায় চৌধুরী ড. অপরাজিতা চক্রবর্তীর সাহিত্যিক প্রতিভার ভূয়সী প্রশংসা করেন। রুশ সাহিত্যিক আন্তন চেখভের সাহিত্যকর্মের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, ড. চক্রবর্তীর মধ্যে একজন কবির সত্তা রয়েছে। তাঁর মতে, কবিতা রচনা মোটেও সহজ কাজ নয়। এর জন্য প্রয়োজন শান্ত ও স্থির মন। চিকিৎসার মতো ব্যস্ত পেশার পাশাপাশি সাহিত্যচর্চা চালিয়ে যাওয়া যথেষ্ট কঠিন হলেও ড. চক্রবর্তী সেই অসাধ্য সাধন করেছেন। তাঁর এই সাফল্যে গর্ব প্রকাশ করে আগামী দিনেও আরও সাফল্য কামনা করেন তিনি।

ড. বিশ্বদীপ চৌধুরী তাঁর বক্তব্যে সাহিত্য ও চিকিৎসাবিদ্যার দীর্ঘদিনের নিবিড় সম্পর্কের কথা তুলে ধরেন। বিখ্যাত সাহিত্যিক আর্থার কোনান ডয়েল এবং বিশিষ্ট স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ ও লেখক ড. অলিভার স্যাকসের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিভিন্ন সময়ে বহু চিকিৎসক সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে সমাজ ও বিশ্বসাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।
তিনি বলেন, চিকিৎসা এবং সাহিত্য—উভয় ক্ষেত্রেই ধৈর্য, মানসিক দৃঢ়তা ও ভারসাম্য অত্যন্ত জরুরি। চিকিৎসকদের প্রতিনিয়ত রোগী ও জরুরি পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হয়। অন্যদিকে সাহিত্য মানুষের মনকে কোমল করে এবং মানবিকতা ও সহমর্মিতার বোধ জাগিয়ে তোলে। চিকিৎসকরা তাঁদের পেশাগত অভিজ্ঞতা সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে তুলে ধরলে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্য ও বিভিন্ন সামাজিক বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো সম্ভব। তাঁর মতে, সাহিত্যচর্চা চিকিৎসকদের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও সমৃদ্ধ করে।
অধ্যাপক ড. দীপেন্দু দাস লেখিকা ড. অপরাজিতা চক্রবর্তীকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, একজন চিকিৎসক এবং লেখক হিসেবে তিনি অত্যন্ত সুন্দরভাবে নিজের জীবনকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। যুদ্ধের কবিতা বা ‘ওয়ার পোয়েট্রি’র প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি কবি ও চিত্রশিল্পী আইজ্যাক রোজেনবার্গের সাহিত্যকর্ম নিয়ে আলোচনা করেন। পাশাপাশি আন্তন চেখভ, জন কিটস এবং বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়-সহ বিভিন্ন সাহিত্যিকের অবদানের কথা উল্লেখ করেন।

সাহিত্যের বহুমাত্রিক পরিসর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, সাহিত্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তঃবিষয়ক ক্ষেত্র। জ্ঞানের বিভিন্ন শাখা থেকে সাহিত্য তার ভাবনা ও উপাদান সংগ্রহ করে। সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মনোবিশ্লেষণ তত্ত্বের প্রসঙ্গ টেনে তিনি সাহিত্যের সঙ্গে মনস্তত্ত্ব ও মানুষের আচরণের গভীর সম্পর্কের বিষয়টি তুলে ধরেন। জ্ঞানের প্রায় প্রতিটি শাখার সঙ্গে নিবিড় সংযোগই সাহিত্যের শক্তি ও অস্তিত্বকে সমৃদ্ধ করেছে বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন। এদিন ড. দেবদত্ত ধর চন্দও লেখিকাকে অভিনন্দন জানান।
অনুষ্ঠানের সূচনা হয় প্রদীপ প্রজ্বলনের মধ্য দিয়ে। স্বাগত বক্তব্য রাখেন ড. অপরাজিতা চক্রবর্তীর পিতা ড. অলোক রঞ্জন চক্রবর্তী। মেয়ের সাফল্যে গর্ব প্রকাশ করে তিনি তাঁর জীবনযাত্রা, সৃজনশীলতা ও বিভিন্ন প্রতিভার কথা তুলে ধরেন। একজন নৃত্যশিল্পী ও চিত্রশিল্পী হিসেবে মেয়ের পরিচিতি তাঁকে গর্বিত করেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। পাশাপাশি মেয়ের সাহিত্যিক প্রতিভার নতুন দিকটি জানতে পেরে আনন্দ প্রকাশ করেন।

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন স্বয়ং ড. অপরাজিতা চক্রবর্তী। গ্রন্থ প্রকাশের পাশাপাশি সংগীত পরিবেশনা, নৃত্য, কবিতা পাঠ এবং বিশিষ্ট অতিথিদের বক্তব্যে অনুষ্ঠানটি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। অনুষ্ঠানে ড. বিশ্বদীপ আচার্য, ড. ডলি ধর, সঞ্জয় দাস-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। সাহিত্য ও সৃজনশীলতার এক সুন্দর আবহে তিনটি গ্রন্থের প্রকাশের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানটি বিশেষ তাৎপর্য লাভ করে। শেষে ধন্যবাদ জ্ঞাপনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে।



