‘আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ’

Spread the news

।। প্রদীপ দত্তরায় ।।
(লেখক ছাত্র সংগঠন আকসার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও গৌহাটি হাইকোর্টের আইনজীবী)
১০ অক্টোবর : কাঙ্ক্ষিত ভালো কিছুর জন্য প্রতীক্ষা না তার প্রাপ্তি- কোনটি মধুরতর? স্যামুয়েল বেকেটের কালজয়ী নাটক ‘ওয়েটিং ফর গোডো’ শুরু হয় দুই কেন্দ্রীয় চরিত্র ভ্লাদিমির আর এস্ট্রাগনের ‘গোডো’ নামক এক ব্যাক্তির প্রতীক্ষায় যে তাদের অকিঞ্চিৎকর জীবনকে অর্থবহ করে তুলতে পারে। দিনের পর দিন যায়, পাতাঝরা বসন্ত শেষ হয়, নতুন সবুজের ছোঁয়ায় প্রকৃতি আবার পাখা মেলে কিন্তু গোডো আসেনা। প্রতীক্ষা নিয়েই শেষ হয়  নাটক। রবীন্দ্রনাথের ডাকঘরের ‘অমল’ও তেমনি রাজার চিঠির অপেক্ষা করে থাকে,সে চিঠি আদৌ আসে কিনা তা গৌন হয়ে উঠে, প্রতীক্ষাই যেন মধুরতর হয়ে দাঁড়ায়।আসলে প্রতীক্ষা কল্পনায় পাখা মেলে, প্রাপ্তি বাস্তবে প্রোথিত। তাই প্রতীক্ষা সীমাহীন অবাধ, প্রাপ্তি সীমায়িত।

কথাগুলো মনে হল অন্য এক প্রসঙ্গে। সামনেই মহালয়া। পিতৃপক্ষের তর্পণ শেষে সূচনা হবে দেবীপক্ষের। সাংবাৎসরিক শারদোৎসবে আবার মাতবে আপামর বাঙালি। সারা বছরের কর্মব্যস্ততা, প্রাপ্তি অপ্রাপ্তির হিসেব, দুঃখ, শোক সবকিছুকেই ছাপিয়ে পুজোর এই কয়েক দিন অন্য এক আনন্দঘন আবেগের বার্তা বয়ে নিয়ে আসবে প্রত্যেক বাঙালির জীবনে। উৎসবের এই প্রাক মুহূর্তে স্মৃতিতে তাই উঁকি দিচ্ছে শৈশবের সেই দিনগুলো যখন পূজোর অপেক্ষাই ছিল মূল আনন্দ। পুজো আসছে এই আবেগই অনেক দিন জুড়ে শিহরণ তৈরি করত, এই প্রতীক্ষাই মনপ্রাণ জুড়ে এক অনাগত মধুর উত্তেজনার আবেশ ছড়াত।

মহালয়ার আগের রাতে প্রত্যেক বাড়িতেই চলত অন্য প্রস্তুতি। আমাদের ছোটদের ভোর রাতে ঘুম থেকে ডেকে বসিয়ে দেওয়া হত রেডিওর সামনে। আধো ঘুম আর জাগরণের মধ্যে বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের উদাত্ত কন্ঠের সেই অমোঘ উচ্চারণ ‘আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠেছে আলোক-মঞ্জীর; ধরণীর বহিরাকাশে অন্তরিত মেঘমালা; প্রকৃতির অন্তরাকাশে জাগরিত জ্যোতির্ময়ীর আগমন বার্তা’- সে আর এক অন্য অনুভূতি। যা সেই অপেক্ষাকেই অর্থবহ করে তুলত।অনাগতের অপেক্ষায় শিহরিত কিশোর মনকে দোলা দিয়ে আবার জানিয়ে যেত- ‘পুজো আসছে’।

আমার শৈশব ও কৈশোর কেটেছে মালিগাও রেলওয়ে কলোনিতে।  প্রাথমিক শিক্ষাও সেখানকার রেলওয়ে স্কুলে। পুজো আসত প্রতি বছর নিয়ম মেনে। কৈশোরের সেসব দিনে পুজোর আগে থেকেই আমাদের সবার মনে কাজ করত এক উত্তেজনা – কবে হবে পুজোর মিটিং ! সেই সভায় আমাদের প্রবেশাধিকার ছিল না। পাড়ার বয়োজ্যেষ্ঠ এবং অভিভাকরা সভায় বসে পুজোর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতেন। মিটিং এর দিন পড়ায় মোটেই মন বসত না, অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে থাকতাম কখন শেষ হবে মিটিং, কখন মিটিংয়ের  শেষে বাবা বাড়িতে এসে ঘোষণা করবেন যে  পুজোর সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে। আর তার সাথে অবশ্যই জানতে হবে কি কি বিশেষত্ব থাকবে এবারের পাড়ার পুজোতে! এনিয়েও থাকত ব্যপক কৌতুহল আর উত্তেজনা।

মিটিং এর পরেই শুরু হয়ে যেত অস্থায়ী মণ্ডপ তৈরির কাজ। যে পথ দিয়ে স্কুলে যেতাম সেই পথেই পড়ত পুজো মন্ডপ। প্রতিদিন স্কুলে যাওয়া বা আসার পথে কিছুক্ষণ প্যান্ডেলের সামনে দাঁড়িয়ে কতটা ও কিভাবে কাজ হচ্ছে তা দেখা ছিল আমাদের কৈশোরের প্রতিদিনের রুটিন। প্রতিদিন একটু একটু করে এগোত মন্ডপের কাজ। আর তার সাথে ছোট কিশোর মনেও ধাপে ধাপে রঙিন এক ক্যানভাস তৈরির প্রক্রিয়া চলত।

প্রকৃতিও এইসময় অন্য রুপে দেখা দিত। নির্মল আকাশ, তাতে পেঁজা তুলোর মতো মেঘের আনাগোনা। সন্ধ্যাবেলা পাড়ায় বেরোলেই শিউলি আর ছাতিমের মাদকতাময় গন্ধ। দেবীর আগমন বার্তাকে ছড়িয়ে দিতে প্রকৃতিও যেন সাজো সাজো রুপে আবির্ভূত হত। সামনেই পুজোর ছুটি।আর সেই সার্বিক পরিবেশ কিশোর মনেও যেন কোন এক অনির্বচনের আবেশ ছড়িয়ে দিত, প্রতীক্ষার সেসব প্রহরকে আরো ব্যঞ্জনায় ভরিয়ে দিত।

মহালয়ার আগের রাতে প্রত্যেক বাড়িতেই চলত অন্য প্রস্তুতি। আমাদের ছোটদের ভোর রাতে ঘুম থেকে ডেকে বসিয়ে দেওয়া হত রেডিওর সামনে। আধো ঘুম আর জাগরণের মধ্যে বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের উদাত্ত কন্ঠের সেই অমোঘ উচ্চারণ ‘আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠেছে আলোক-মঞ্জীর; ধরণীর বহিরাকাশে অন্তরিত মেঘমালা; প্রকৃতির অন্তরাকাশে জাগরিত জ্যোতির্ময়ীর আগমন বার্তা’- সে আর এক অন্য অনুভূতি। যা সেই অপেক্ষাকেই অর্থবহ করে তুলত।অনাগতের অপেক্ষায় শিহরিত কিশোর মনকে দোলা দিয়ে আবার জানিয়ে যেত- ‘পুজো আসছে’।

প্রতীক্ষার প্রহরে শেষ তুলির টান পড়ত পুজোর পঞ্চমী দিনে। পাড়ার সবাই মিলে সেদিন লরিতে করে ঠাকুর আনতে যাওয়া হত। ছোটদের যেতে বাধানিষেধ থাকত, কিন্তু পাড়ার দাদাদের কাছে বারবার অনুরোধ, আর অভিভাবকদের সাদর প্রশ্রয়ে লরির এক কোণে অবশেষে ঠাই মিলত, দাঁড়িয়ে চলে যাওয়া যেত সেই সফরে। সবার সাথে সেই যাওয়া আর ফিরে আসার আনন্দ আর আবেগকে এখনো বয়ে নিয়ে বেড়াই। প্রতিমাকে বরণ করে নিতে উপস্থিত থাকতেন পাড়ার সব গৃহিণীরা। উলুধ্বনি এবং শাঁখের মাঙ্গলিক ধ্বনিতে মুখরিত হত পুজো মণ্ডপ। সে এক অনির্বচনীয় পরিবেশ।

সেই বয়েসে পুজো শুরু হওয়া মানেই যেন পুজো শেষ। অসীম ব্যাস্ততার মাঝে পুজোর কটাদিন কিভাবে কেটে যেত টেরই পেতাম না। শহরের পুজো দেখা, বিভিন্ন জায়গার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বন্ধুদের সঙ্গে সারাদিন ধরে টো টো,  সবকিছু থাকলেও মন কিন্তু পড়ে থাকত সেই পাড়ার পুজো মণ্ডপেই। তাতে হয়তো বাহুল্য বা চাকচিক্যের রোশনাই থাকতনা, কিন্তু পাড়ার সবার আন্তরিক সহযোগ আর একাত্মতায় সেই পুজোমন্ডপ এক বার্ষিক মিলনমেলায় রুপান্তরিত হত, যার ভাগীদার হতেন পাড়ার প্রত্যেক পরিবার।

সবার শেষে আসত বিজয়া দশমীর মুহূর্ত। সন্ধ্যাবেলায় প্রতিমা বিসর্জনের পর সারা পাড়া জুড়ে ছড়িয়ে পড়ত এক নিস্তব্ধতা। যেন এক স্বজন হারানোর শোক।

আজ জীবনের অনেক চড়াই, উৎরাই পেরিয়ে পৌড়ত্বের দোড়গোড়ায় এসে পৌঁছেছি। ‘পুজো আসছে’ এই অনাগত উত্তেজনা আর প্রতীক্ষার প্রহর সঙ্গত কারণেই আজ আর কৈশোরের সেইসব দিনের মতো নাড়া দেয় না। হয়তো আমার মতো যারা জীবনের অনেকটা অভিজ্ঞতার পাঠ পেরিয়ে এসেছেন তাঁদের সবার ক্ষেত্রেই এই অনুভূতি প্রযোজ্য। কিন্তু সেই অনাবিল দিনগুলোকে আবার ফিরে পেতে ইচ্ছে হয়, ভীষনভাবে।

আজ যারা কিশোর, কিশোরী, যারা স্কুলের পাঠ নিচ্ছে তাঁদের জগৎ অনেক ব্যাপৃত। আন্তর্জালের সৌজন্যে প্রায় সারা পৃথিবী আজ তাদের হাতের মুঠোয়। শারদীয়া আনন্দমেলা, কিশোর ভারতী কিম্বা শুকতারা নিয়ে অপেক্ষার যুগ আর নেই। শহরাঞ্চলে পাড়ার ঘরোয়া পুজোর সংখ্যাও অপসৃয়মান। বারোয়ারী পুজোতে চাকচিক্য বেড়েছে, দর্শনার্থীদের লাইন বেড়েছে কিন্তু একাত্মতা, সংলগ্নতা কমেছে। গ্রামীণ এলাকার পুজোতে অবশ্য এখনও আন্তরিকতার ছোঁয়া পাওয়া যায়। তবে ‘পুজো আসছে’ এই শিহরণ আর রোমাঞ্চ কতটা আজকের কিশোর প্রজন্মকে নাড়া দেয় তা অজানা। হয়তো দেয়, হয়তো তার ব্যাঞ্জনা ভিন্নতর।

তবে যতই যান্ত্রিকতা আমাদের আবিষ্ট করুক না কেন, শরতের শিউলি আর কাশফুল, মহালয়ার ভোরে বীরেন্দ্র কৃষ্ণের চণ্ডীপাঠ, আর কৈশোরের সেই আবেগঘন প্রতীক্ষার প্রহর, সব অনুভূতি একাকার হয়ে যে দৃশ্যকল্প আমাদের মনোজগতে তৈরি হয়েছিল, তা চিরস্থায়ী হয়েই থেকে যাবে আজীবন।

পুজোর দিনগুলো সবার জীবনে সৌহার্দ্য আর সমৃদ্ধির বার্তা বয়ে আনুক।
সবার পুজো ভালো কাটুক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *