কৃষকের সার পাচার—সিন্ডিকেটের শিকড় কোথায়?

Spread the news

বরাক তরঙ্গ, ৫ অক্টোবর, সোমবার,
অসমের কৃষকদের জন্য বরাদ্দ ইউরিয়া সার যদি সত্যিই রাজ্যের সীমানা পেরিয়ে মিজোরাম হয়ে মায়ান্মারের দিকে পাচার হয়ে থাকে, তবে বিষয়টি নিছক অবৈধ ব্যবসার অভিযোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে রয়েছে কৃষকের অধিকার, সরকারি ভর্তুকি-নির্ভর সরবরাহব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক নজরদারির কার্যকারিতা। সম্প্রতি বরাকের তিন জেলায় বিপুল পরিমাণ সার বাজেয়াপ্ত হওয়ার ঘটনায় যে প্রশ্নগুলি সামনে এসেছে, সেগুলির নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এখন অত্যন্ত জরুরি।

অভিযোগ উঠেছে, কৃষকদের জন্য বরাদ্দ ইউরিয়া সার বরাকের বিভিন্ন সীমান্তপথ ধরে মিজোরামে পাচার করা হচ্ছে এবং সেখান থেকে তা মায়ান্মারে পৌঁছনোর সম্ভাবনা রয়েছে। অভিযোগের সত্যতা তদন্তসাপেক্ষ। কিন্তু যদি এই অভিযোগের পেছনে সংগঠিত কোনও চক্র থেকে থাকে, তাহলে শুধু পরিবহণকারী বা ছোটখাটো মজুতদারকে চিহ্নিত করে তদন্ত শেষ করা চলবে না। সার কোথা থেকে বেরোচ্ছে, কার নামে বরাদ্দ হচ্ছে, কোন ডিলারের মাধ্যমে সরবরাহ করা হচ্ছে, কীভাবে পরিবহণের অনুমতি মিলছে এবং কোন পথে তা সীমান্তের দিকে যাচ্ছে—প্রতিটি ধাপ খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

কৃষকের জন্য বরাদ্দ সার কোনও সাধারণ বাজারজাত পণ্য নয়। সরকারি ব্যবস্থায় কৃষকদের কাছে পৌঁছনোর কথা যে সার, তা যদি কালোবাজারি বা পাচারের পথে চলে যায়, তাহলে কৃত্রিম ঘাটতি তৈরি হতে পারে। এর প্রভাব পড়বে কৃষকের উৎপাদন খরচ, চাষের সময়সূচি এবং সামগ্রিক কৃষি অর্থনীতির ওপর। শেষ পর্যন্ত এর বোঝা বহন করতে হবে সেই কৃষককেই, যার জন্য বরাদ্দ করা হয়েছিল সারটি।

তাই ট্রাক আটক, সার বাজেয়াপ্ত এবং কয়েকজনকে গ্রেফতার করাই যেন তদন্তের শেষ ধাপ না হয়। প্রয়োজন সরবরাহ-শৃঙ্খলের গোড়ায় পৌঁছনো। বরাদ্দের ডিজিটাল নথি, ডিলারদের হিসাব, পরিবহণের কাগজপত্র, গন্তব্যের তথ্য, প্রয়োজনে জিপিএস রেকর্ড এবং সীমান্তবর্তী এলাকার নজরদারি—সবকিছুকে তদন্তের আওতায় আনতে হবে। কোথাও প্রশাসনিক গাফিলতি, যোগসাজশ বা নিয়মবহির্ভূত সুবিধা দেওয়ার প্রমাণ মিললে দায় নির্ধারণও জরুরি।

একই সঙ্গে তদন্তের ক্ষেত্রে সতর্কতাও জরুরি। কোনও সরকারি কর্মী, ব্যবসায়ী, পরিবহণকারী বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তাঁকে দোষী ধরে নেওয়া যায় না। প্রমাণের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা যেমন দরকার, তেমনই নির্দোষ কাউকে শুধুমাত্র অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযুক্ত না করাও তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতার শর্ত।

কৃষকের সার নিয়ে কোনও সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকলে তার শিকড় কতদূর বিস্তৃত, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন। প্রশাসনের সামনে তাই শুধু পাচার রোখার নয়, পাচারের পথ বন্ধ করার দায়ও রয়েছে। কৃষকের প্রাপ্য সরকারি সহায়তা যাতে সীমান্তপথে অদৃশ্য না হয়ে যায়, তা নিশ্চিত করতে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ এবং প্রমাণভিত্তিক তদন্তের কোনও বিকল্প নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *