।। নীলকণ্ঠ চৌধুরী।।
১০ অক্টোবর : মহালয়ার মধ্য দিয়েই সূচনা হয় শারদীয় দুর্গোৎসবের আবহের। পিতৃপক্ষের অবসান ঘটিয়ে দেবীপক্ষের আগমনের বার্তা নিয়ে আসে এই পুণ্যতিথি। বাঙালি হিন্দুদের কাছে মহালয়া কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং আবেগ, ঐতিহ্য ও শারদীয় উৎসবের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত এক বিশেষ দিন। বিশ্বাস অনুযায়ী, এই দিনেই দেবী দুর্গার মর্ত্যে আগমনের সূচনা ঘটে। তাই মহালয়ার ভোর মানেই চণ্ডীপাঠ, স্তোত্র, মন্ত্রোচ্চারণ এবং মহিষাসুরমর্দিনীর স্তবগানে মুখরিত এক আবেগঘন পরিবেশ।
সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসারে, মহালয়া হলো পিতৃপক্ষ ও দেবীপক্ষের সন্ধিক্ষণ। আশ্বিন মাসের অমাবস্যায় পিতৃপক্ষের অবসান ঘটে এবং শুরু হয় দেবীপক্ষের। এই দিন প্রয়াত পূর্বপুরুষদের স্মরণ করে তাঁদের আত্মার শান্তি কামনায় তর্পণ ও জলদান করা হয়। পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের এই প্রথা বহু প্রাচীনকাল থেকে চলে আসছে।
‘মহালয়া’ শব্দটির ব্যাখ্যা নিয়ে বিভিন্ন মত প্রচলিত রয়েছে। একটি ব্যাখ্যা অনুসারে, ‘মহা’ ও ‘আলয়’ শব্দের সমন্বয়ে মহালয়া শব্দের উৎপত্তি। ধর্মীয় বিশ্বাসে, এই তিথিতে পূর্বপুরুষদের স্মরণ ও তাঁদের উদ্দেশ্যে তর্পণ করার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। অন্যদিকে, মহালয়াকে দেবীর আবাহন এবং মহাশক্তির আরাধনার সূচনাপর্ব হিসেবেও দেখা হয়।
মহালয়ার দিন ভোরে বাঙালি পরিবারগুলিতে রেডিও বা অন্যান্য মাধ্যমে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ শোনার দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য রয়েছে। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে চণ্ডীপাঠ, স্তোত্র ও মন্ত্রোচ্চারণ বাঙালির শারদীয় আবেগের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। দেবী দুর্গার আবির্ভাব, অসুররাজ মহিষাসুরের সঙ্গে তাঁর যুদ্ধ এবং শেষ পর্যন্ত অশুভ শক্তির বিনাশের কাহিনি এই স্তোত্রগাথায় বিশেষভাবে উঠে আসে।
পিতৃপক্ষের শেষ দিনে প্রয়াত পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে তিল, জল ও অন্যান্য উপকরণ দিয়ে তর্পণ করা হয়। শাস্ত্রীয় রীতি অনুযায়ী, পিতৃপুরুষদের উদ্দেশ্যে নিবেদনের সময় ‘স্বধা’ এবং দেবতাদের উদ্দেশ্যে নিবেদনের সময় ‘স্বাহা’ উচ্চারণের প্রথা রয়েছে। ধর্মীয় ব্যাখ্যায়, স্বধা ও স্বাহার মাধ্যমে পিতৃপুরুষ এবং দেবতাদের প্রতি শ্রদ্ধা ও নিবেদনের ভাব প্রকাশ পায়।
মহালয়ার মধ্য দিয়ে অন্ধকার পিতৃপক্ষের অবসান ঘটিয়ে আলোকময় দেবীপক্ষের সূচনা হয়। এই দিন থেকেই দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে বাঙালির মনে উৎসবের আনন্দ ও প্রস্তুতি আরও জোরালো হয়ে ওঠে। মন্দিরে মন্দিরে চণ্ডীপাঠ, শঙ্খধ্বনি ও বিশেষ পূজার মাধ্যমে দেবীকে আবাহন করা হয়।
দেবীপক্ষের সূচনার পর দুর্গাপূজার প্রস্তুতি ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ক্রমশ এগিয়ে চলে। নবদুর্গা উপাসনার প্রথায় দেবীর নয়টি রূপের আরাধনা করা হয়। এই নয়টি রূপ হলো—শৈলপুত্রী, ব্রহ্মচারিণী, চন্দ্রঘণ্টা, কুষ্মাণ্ডা, স্কন্দমাতা, কাত্যায়নী, কালরাত্রি, মহাগৌরী ও সিদ্ধিদাত্রী। বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচলিত আচার ও পঞ্জিকা অনুসারে এই উপাসনার রীতিতে কিছু পার্থক্য দেখা যায়।
প্রচলিত পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে, শরৎকালে দুর্গাপূজার সঙ্গে শ্রীরামচন্দ্রের অকালবোধনের বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। রাবণের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়লাভ এবং সীতাকে উদ্ধার করার উদ্দেশ্যে শ্রীরামচন্দ্র দেবী দুর্গার আরাধনা করেছিলেন বলে রামায়ণভিত্তিক কাহিনিতে উল্লেখ রয়েছে। বসন্তকালের বাসন্তী পূজার পরিবর্তে শরৎকালে দেবীর এই আরাধনা হওয়ায় একে ‘অকালবোধন’ বলা হয়।
কালিকাপুরাণের বর্ণনা অনুসারে, রাবণবধে শ্রীরামচন্দ্রকে সাহায্য করার জন্য ব্রহ্মা রাত্রিকালে দেবীর বোধন করেছিলেন। সেই পৌরাণিক আখ্যানের সূত্র ধরেই শরৎকালের দুর্গাপূজায় দেবীকে জাগ্রত ও আবাহনের বিশেষ রীতি প্রচলিত হয়েছে বলে মনে করা হয়।
দেবতাদের নিদ্রা ও বোধনের ধারণা
পুরাণভিত্তিক বিশ্বাস অনুসারে, সূর্যের উত্তরায়ণ দেবতাদের দিন এবং দক্ষিণায়ন দেবতাদের রাত হিসেবে বিবেচিত হয়। উত্তরায়ণে সূর্য ক্রমশ উত্তর দিকে এবং দক্ষিণায়নে দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হয়। প্রচলিত ধর্মীয় ব্যাখ্যায়, দক্ষিণায়নের সময় দেবতারা নিদ্রিত থাকেন বলে এই সময়ে দেবীর পূজা শুরুর আগে বোধনের প্রয়োজন হয়।
শরৎকাল দক্ষিণায়নের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যায় এই সময়কে দেবতাদের রাত্রিকাল হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে। তাই দেবী দুর্গার আরাধনার আগে তাঁকে জাগ্রত করে আবাহন করার যে আচার, তার নাম ‘বোধন’।
সব মিলিয়ে, মহালয়া বাঙালির কাছে পূর্বপুরুষদের স্মরণ, ধর্মীয় আচার, পৌরাণিক ঐতিহ্য এবং শারদীয় আনন্দের এক অনন্য সমন্বয়। মহালয়ার ভোরে চণ্ডীপাঠের ধ্বনি যেন মনে করিয়ে দেয়—আসন্ন দুর্গোৎসবের হাত ধরে অশুভ শক্তির বিনাশ ও শুভশক্তির জয়ের প্রত্যাশায় আবারও শুরু হচ্ছে বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসবের দিনগণনা।



