দুই শতাধিক মানুষের স্বাক্ষরে জোরালো হলো বরাকবাসীর দাবি_____
বরাক তরঙ্গ, ১৬ জুন : বরাক উপত্যকায় গৌহাটি হাইকোর্টের একটি স্থায়ী বেঞ্চ প্রতিষ্ঠার দাবিকে আরও শক্তিশালী করতে হাইকোর্ট বেঞ্চ দাবি বাস্তবায়ন কমিটি, কাছাড় জেলা কমিটির উদ্যোগে মঙ্গলবার বড়খলা বাজার সংলগ্ন সেডো কমিউনিটি সেন্টারে এক সচেতনতা সভা ও গণস্বাক্ষর অভিযান অনুষ্ঠিত হয়। কর্মসূচিতে স্থানীয় বাসিন্দা, শিক্ষাবিদ, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সমাজকর্মী, ছাত্রছাত্রী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিপুল সংখ্যক মানুষ অংশগ্রহণ করেন। বিশেষভাবে স্থানীয় মহিলাদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি অনুষ্ঠানটিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে।
বিকাল ৫টায় সচেতনতা সভার মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। সভায় উপস্থিত ছিলেন হাইকোর্ট বেঞ্চ দাবি বাস্তবায়ন কমিটি, কাছাড় জেলা কমিটির সভাপতি ধ্রুবকুমার সাহা, উপদেষ্টা ও বিজেপি নেতা উদয়শঙ্কর গোস্বামী, শিক্ষাবিদ বিভাশ দেব, সমাজসেবী রসরাজ দাস, আইনজীবী ধর্মানন্দ দেব, আইনজীবী তুহিনা শর্মাসহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি।
অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত ভাষণ প্রদান করেন স্বপন দেব। তিনি বলেন, বরাক উপত্যকায় হাইকোর্ট বেঞ্চ প্রতিষ্ঠার দাবি সময়োপযোগী, ন্যায়সঙ্গত এবং বিচারপ্রাপ্তির সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

সভাপতির বক্তব্যে ধ্রুবকুমার সাহা বলেন, বরাক উপত্যকার প্রায় চল্লিশ লক্ষ মানুষের জন্য একটি স্থায়ী হাইকোর্ট বেঞ্চ আজ সময়ের দাবি। বিচার সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রয়োজনে সাধারণ মানুষকে শত শত কিলোমিটার দূরে গৌহাটি যেতে হয়, যার ফলে সময়, অর্থ ও শ্রমের অপচয়ের পাশাপাশি ন্যায়বিচার প্রাপ্তিতেও বাস্তব সমস্যার সৃষ্টি হয়।
বিজেপি নেতা উদয়শঙ্কর গোস্বামী দাবির প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে কমিটির কার্যক্রমের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ তুলে ধরে হাইকোর্ট বেঞ্চ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করেন।
আইনজীবী ধর্মানন্দ দেব তথ্যসমৃদ্ধ পাওয়ার পয়েন্ট উপস্থাপনার মাধ্যমে হাইকোর্ট বেঞ্চ প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক ও আইনগত প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। তিনি ব্রিটিশ আমলের ফোর্ট উইলিয়াম কোর্ট থেকে শুরু করে শিলংয়ে উচ্চ আদালতের কার্যক্রম, গৌহাটি হাইকোর্টের প্রতিষ্ঠা এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের বিচারব্যবস্থার বিকাশের ইতিহাস ব্যাখ্যা করেন। পাশাপাশি ১৯৭২ সালে জেলা বার অ্যাসোসিয়েশনের প্রস্তাব এবং ২০১৮ সালে গৌহাটি হাইকোর্ট প্রকাশিত একটি গ্রন্থে এই দাবির উল্লেখ থাকার বিষয়টিও তিনি তুলে ধরেন।
তিনি আরও বলেন, ভৌগোলিক অবস্থান, জনসংখ্যা, মামলার সংখ্যা এবং বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগ বিবেচনায় বরাক উপত্যকায় একটি স্থায়ী হাইকোর্ট বেঞ্চ প্রতিষ্ঠা অত্যন্ত জরুরি। দেশের বিভিন্ন স্থানে হাইকোর্টের বেঞ্চ প্রতিষ্ঠিত হলেও বরাক উপত্যকার দীর্ঘদিনের ন্যায়সঙ্গত দাবি এখনও বাস্তবায়িত না হওয়া হতাশাজনক।

শিক্ষাবিদ বিভাশ দেব, সমাজসেবী রসরাজ দাস এবং অন্যান্য বক্তারাও তাঁদের বক্তব্যে এই দাবির প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেন এবং সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান। তাঁরা বলেন, এটি কোনো রাজনৈতিক দাবি নয়; বরং বিচারপ্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি জনস্বার্থমূলক আন্দোলন।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন আইনজীবী তুহিনা শর্মা এবং সমাপ্তি পর্বে ধন্যবাদজ্ঞাপন করেন বিজেপি নেতা পিনাক দাস। তিনি উপস্থিত সকল অতিথি, বক্তা ও অংশগ্রহণকারীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
সচেতনতা সভার পর আয়োজিত গণস্বাক্ষর অভিযানে নারী-পুরুষ, ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবীসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ লক্ষ্য করা যায়। আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয় যে, এদিন দুই শতাধিক মানুষ হাইকোর্ট বেঞ্চ প্রতিষ্ঠার দাবির সমর্থনে স্বাক্ষর প্রদান করেন।
হাইকোর্ট বেঞ্চ দাবি বাস্তবায়ন কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, বরাক উপত্যকায় গৌহাটি হাইকোর্টের একটি স্থায়ী বেঞ্চ প্রতিষ্ঠার দাবিতে আগামী দিনগুলোতেও ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন সচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে। কমিটির নেতৃবৃন্দ দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে, বরাকবাসীর ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা ও ব্যাপক গণসমর্থনের মাধ্যমে একদিন এই দীর্ঘদিনের ন্যায়সঙ্গত দাবি অবশ্যই বাস্তবায়িত হবে।



