বরাক তরঙ্গ, ১০ আগস্ট, সোমবার,
১৫ অগাস্ট ভারতের ইতিহাসে আত্মত্যাগ, স্বাধীনতার গর্ব এবং নতুন স্বপ্ন দেখার এক আবেগময় অধ্যায়। ১৯৪৭ সালের ১৫ অগাস্ট যে স্বাধীনতার সূর্যোদয় হয়েছিল, ২০২৬ সালে তার ৮০তম স্বাধীনতা দিবস উদযাপিত হচ্ছে। দীর্ঘ এই পথচলায় স্বাধীনতার সংগ্রামে আত্মবলিদান দেওয়া অসংখ্য শহিদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে দেশজুড়ে আবারও উড়বে তেরঙা, বাজবে জাতীয় সঙ্গীত। কোটি কোটি ভারতীয় শপথ নেবেন আরও উন্নত, শক্তিশালী, আত্মনির্ভর ও ঐক্যবদ্ধ ভারত গড়ে তোলার।
দিল্লির লালকেল্লা থেকে দেশের প্রত্যন্ত প্রান্ত—স্বাধীনতা দিবসের নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে উচ্চারিত হবে একই বার্তা, স্বাধীনতার মর্যাদা রক্ষা এবং ভবিষ্যতের পথে দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে চলা। স্বাধীনতা কেবল একটি রাজনৈতিক অর্জন নয়; এটি মানুষের অধিকার, মর্যাদা, সমতা ও নিরাপদ ভবিষ্যতের নিশ্চয়তারও প্রতীক।
স্বাধীনতার আট দশকের যাত্রাপথে ভারত বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, অর্থনীতি, মহাকাশ গবেষণা ও প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। চাঁদের মাটিতে পদচিহ্ন, মহাকাশ গবেষণায় ধারাবাহিক সাফল্য, ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তার এবং দেশীয় প্রতিরক্ষা উৎপাদনের অগ্রগতি নিঃসন্দেহে গর্বের বিষয়। একই সঙ্গে ৬জি প্রযুক্তির গবেষণা, সেমিকন্ডাক্টর শিল্প, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, গ্রিন হাইড্রোজেন, সৌরশক্তি এবং আত্মনির্ভর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মতো উদ্যোগ ভবিষ্যতের ভারতের সম্ভাবনাকে আরও উজ্জ্বল করছে।
কিন্তু উন্নয়নের এই সাফল্যের পাশাপাশি বাস্তবতার অন্য ছবিটিও আমাদের ভুলে গেলে চলবে না। দেশের বহু মানুষ এখনও উন্নত চিকিৎসার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। বহু পরিবার আর্থিক অনটনে দিন কাটাচ্ছে, কর্মসংস্থানের অভাবে যুবসমাজের একটি বড় অংশ অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। কারও মাথার উপর নিরাপদ ছাদ নেই, কারও ঘরে দু’বেলা খাবারের নিশ্চয়তা নেই। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য থেকে ওষুধ—ক্রমবর্ধমান মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলছে।
একদিকে প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির নতুন নতুন মাইলফলক, অন্যদিকে বেকারত্ব, দারিদ্র্য, বৈষম্য ও মূল্যবৃদ্ধির চাপ—এই দুই বাস্তবতার মধ্যে সামঞ্জস্য তৈরি করাই আজকের ভারতের বড় চ্যালেঞ্জ। স্বাধীনতার সুফল তখনই প্রকৃত অর্থে সার্থক হবে, যখন উন্নয়নের আলো সমাজের শেষ প্রান্তে থাকা মানুষের ঘরেও পৌঁছবে।
তাই স্বাধীনতার ৮০তম বছরে শুধু উৎসব নয়, আত্মসমীক্ষাও জরুরি। দেশের উন্নয়নের অর্থ কেবল বড় শিল্প, উঁচু সেতু, আধুনিক প্রযুক্তি কিংবা মহাকাশ অভিযান নয়; উন্নয়নের প্রকৃত মাপকাঠি হল সাধারণ মানুষের জীবন কতটা নিরাপদ, স্বচ্ছল ও মর্যাদাপূর্ণ হয়েছে।
এই স্বাধীনতা দিবসে তাই শপথ আরও দৃঢ় হোক—দেশের প্রতিটি নাগরিকের জীবন ও জীবিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করার, বেকার যুবকের হাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ তুলে দেওয়ার, চিকিৎসা ও শিক্ষাকে মানুষের নাগালের মধ্যে আনার এবং মূল্যবৃদ্ধির বোঝা থেকে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দেওয়ার। ধর্ম, ভাষা, জাতি, অঞ্চল ও রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে ঐক্য ও সম্প্রীতির ভারত গড়ার অঙ্গীকারও হোক আরও শক্তিশালী।
স্বাধীনতার ৮০তম বছরে আমাদের সামনে তাই একদিকে অতীতের গৌরব, অন্যদিকে ভবিষ্যতের কঠিন দায়িত্ব। শহিদের আত্মত্যাগের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা হবে এমন একটি ভারত নির্মাণ, যেখানে উন্নয়নের সুফল সবার, অধিকার সবার এবং বেঁচে থাকার মর্যাদাও সবার সমান। তেরঙার নিচে দাঁড়িয়ে সেই ভারত গড়ার শপথই হোক এবারের স্বাধীনতা দিবসের সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার।



