‘বাঙালি’ ও ‘বাংলাদেশি’ এক নয়, দুই পরিচয়ের মধ্যে রয়েছে মৌলিক পার্থক্য

Spread the news

বরাক তরঙ্গ, ২ নভেম্বর, সোমবার,
‘বাঙালি’ এবং ‘বাংলাদেশি’—এই দুটি পরিচয়কে এক করে দেখার প্রবণতা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। অথচ ভাষাগত ও জাতিগত পরিচয়ের সঙ্গে কোনও দেশের নাগরিকত্বের পরিচয়ের মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। বাঙালি একটি জাতিসত্তার পরিচয়, অন্যদিকে বাংলাদেশি একটি রাষ্ট্রীয় নাগরিকত্বের পরিচয়। বাংলা যাঁদের মাতৃভাষা, যাঁরা বাঙালি ভাষা ও সংস্কৃতির ধারক, তাঁরা বাঙালি। আর বাংলাদেশি বলতে বোঝায় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের নাগরিককে। সুতরাং বাংলা ভাষায় কথা বললেই কাউকে বাংলাদেশি আখ্যা দেওয়া সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।

সম্প্রতি শ্রীভূমিতে প্রতিমা বিসর্জনযাত্রাকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া এক অনভিপ্রেত ঘটনাকে ঘিরে রাজ্যের বিভিন্ন মহলে বাঙালি ও অসমিয়া জাতিসত্তা নিয়ে নানা মন্তব্য শোনা যাচ্ছে। এরই মধ্যে একাংশের মানুষ বাঙালিদের বাংলাদেশি বলে চিহ্নিত করার চেষ্টা করছেন। এমনকি কারও কারও বক্তব্যে বাংলা ভাষায় কথা বলার সঙ্গে বাংলাদেশি পরিচয়কে এক করে দেখা হচ্ছে। এই ধরনের মন্তব্য শুধু বিভ্রান্তিকরই নয়, বরং ভাষা, ইতিহাস ও জাতিসত্তা সম্পর্কে অজ্ঞতারও পরিচয় বহন করে।

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, বর্তমান বাংলাদেশের ভূখণ্ড একসময় অবিভক্ত ভারতের অংশ ছিল। দেশভাগের পর পূর্ববঙ্গ পৃথক রাষ্ট্রীয় পরিচয় লাভ করে। কিন্তু দেশভাগের ফলে বাঙালি জাতিসত্তা বিভক্ত হয়ে যায়নি। পশ্চিমবঙ্গ ও বর্তমান বাংলাদেশ ছাড়াও ভারতের বিভিন্ন রাজ্য এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে বাঙালিদের বসবাস রয়েছে। তাঁদের ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য ভারতীয় সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

ত্রিপুরায় বাংলা অন্যতম প্রধান সরকারি ভাষা। অসমের বরাক উপত্যকার কাছাড়, করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দি জেলায় বাংলা বহুল প্রচলিত এবং সরকারি ভাষার স্বীকৃতিও রয়েছে। শুধু তাই নয়, আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জেও বাংলা একটি উল্লেখযোগ্য ভাষা। ঝাড়খণ্ডে ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে বাংলা দ্বিতীয় সরকারি ভাষার মর্যাদা পেয়েছে। পাশাপাশি বিহার ও ওড়িশার বিভিন্ন অঞ্চলেও বাংলা ভাষার প্রচলন এবং স্বীকৃতি রয়েছে।

অতএব, ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বসবাসকারী বাংলা ভাষাভাষী মানুষদের বাংলাদেশি বলে দাগিয়ে দেওয়ার কোনও যুক্তি নেই। তাঁরা ভারতীয় নাগরিক হতে পারেন, আবার তাঁদের মাতৃভাষা বাংলা হওয়ায় তাঁরা বাঙালি। এখানে কোনও বিরোধ নেই। একইভাবে অসমিয়া ভাষায় কথা বলা মানেই কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বা রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের অধিকারী হওয়া নয়।

বস্তুত, ভাষা ও জাতিসত্তার পরিচয়কে নাগরিকত্বের পরিচয়ের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা সমাজে বিভ্রান্তি ও বিভাজন সৃষ্টি করে। শ্রীভূমির সাম্প্রতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবেগের বশে কোনও একটি জনগোষ্ঠীকে সামগ্রিকভাবে অপমানিত বা সন্দেহের চোখে দেখা উচিত নয়। কোনও ব্যক্তির অপরাধ বা অনভিপ্রেত আচরণের দায় কখনও একটি সম্পূর্ণ জাতিগোষ্ঠীর উপর চাপানো যায় না।
মনে রাখা প্রয়োজন, বাঙালি ও বাংলাদেশি এক নয়। বাঙালি একটি ভাষিক ও সাংস্কৃতিক জাতিসত্তার পরিচয়, আর বাংলাদেশি একটি রাষ্ট্রের নাগরিকত্বের পরিচয়। এই সাধারণ সত্যটুকু উপলব্ধি করা জরুরি। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ইতিহাসবোধ এবং সাংবিধানিক মূল্যবোধের ভিত্তিতেই অসমের বহুভাষিক ও বহুজাতিক সমাজে শান্তি, সম্প্রীতি ও সহাবস্থান বজায় রাখা সম্ভব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *