ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও মানবিক মূল্যবোধের চর্চার আহ্বান জয় ঠাকুরের

Spread the news

বরাক তরঙ্গ, ২ নভেম্বর : ধর্মীয় বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিক সাধনার পথ ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও সহিষ্ণুতাই হওয়া উচিত প্রকৃত ধর্মীয় চেতনার ভিত্তি। ধর্মের নামে সংকীর্ণতা নয়, বরং মানবিক মূল্যবোধ ও পারস্পরিক সম্প্রীতির মধ্য দিয়েই সমাজে প্রকৃত ধর্মীয় আদর্শ প্রতিষ্ঠা সম্ভব। এই বার্তাই তুলে ধরলেন আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব জয় ঠাকুর। রবিবার সন্ধ্যায় জয় ঠাকুর সেবা সমিতির উদ্যোগে সুভাষনগরের ঐতিহ্যবাহী শ্রীশ্রী বিজয়কৃষ্ণ ধামে আয়োজিত বিজয়া সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি এই আহ্বান জানান। শতাধিক ভক্তের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এই ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক আলোচনা সভায় সম্প্রীতি, ধর্মীয় সহিষ্ণুতা এবং মানবিক মূল্যবোধের বিভিন্ন দিক উঠে আসে।

অনুষ্ঠানের সূচনায় সমিতির পক্ষ থেকে এলাকার শ্রদ্ধেয় আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব জয় ঠাকুরকে উত্তরীয় পরিয়ে, ফুলের মালা ও মা দুর্গার প্রতিমার স্মারক উপহার দিয়ে সংবর্ধনা জানানো হয়। এরপর উপস্থিত ভক্তদের উদ্দেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে জয় ঠাকুর সনাতন ধর্মে দুর্গাপূজার তাৎপর্য, আধ্যাত্মিক আদর্শ এবং ধর্মীয় সহিষ্ণুতার গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, সমাজে কেউ বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর আদর্শ অনুসরণ করেন, কেউ অনুকূলচন্দ্র, সাইবাবা, রামকৃষ্ণ মিশন কিংবা স্বামী স্বরূপানন্দের আদর্শে অনুপ্রাণিত হন। আবার অনেকে নিজেদের কুলগুরুর নির্দেশিত পথে চলেন। কিন্তু আধ্যাত্মিক সাধনার পথ আলাদা হলেই অন্যের বিশ্বাস ও আদর্শকে অস্বীকার করার কোনও কারণ থাকতে পারে না।

তিনি বলেন, বাড়িতে বসে যে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা আমরা পাঠ করি, সেই গীতাই শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব এবং স্বামী স্বরূপানন্দও পাঠ করেছেন। তাঁরা নিজেদের আদর্শে অবিচল থেকেও গীতার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেছেন। তাহলে আমাদের মধ্যে ধর্মীয় সংকীর্ণতা থাকবে কেন? নিজের বিশ্বাসে অটল থেকেও অন্যের ধর্মীয় আদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া জরুরি। ধর্মের উদ্দেশ্য মানুষকে বিভক্ত করা নয়, বরং মানুষের মধ্যে ভালোবাসা, সহিষ্ণুতা ও মানবিকতার বিকাশ ঘটানো।

বক্তব্যের অন্য একটি অংশে সুস্থ জীবনযাপন ও স্বাস্থ্য সচেতনতার ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেন জয় ঠাকুর। তিনি বলেন, শারীরিক সমস্যা দেখা দিলে কিংবা ওজন বেড়ে গেলে অনেকেই চিকিৎসার জন্য চেন্নাই, বেঙ্গালুরুর মতো বড় শহরে ছুটে যান। চিকিৎসকের পরামর্শ নেন, বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষাও করান। কিন্তু দৈনন্দিন জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস এবং শরীরের নিয়মিত যত্ন নেওয়ার বিষয়টি অনেক সময় উপেক্ষিত থেকে যায়। এ প্রসঙ্গে নিজের তারাপীঠ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি জানান, সেখানে মায়ের প্রসাদ গ্রহণের সময় নিজের শারীরিক অবস্থা ও ওজনের বিষয়টি তাঁর মনে আসে। পরবর্তীতে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান এবং সংশ্লিষ্ট রিপোর্ট ও চিকিৎসার কাগজপত্র সঙ্গে নিয়ে বাড়ি ফেরেন।

এই অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি বলেন, মানুষের জীবনে অর্থ, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং সুস্বাস্থ্যের প্রত্যেকটিরই আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। শুধু অর্থ উপার্জন কিংবা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনের মধ্যেই জীবনের দায়িত্ব সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। নিজের শরীর, স্বাস্থ্য, খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনের প্রতিও সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, প্রকৃত ধর্মীয় চেতনা কেবল মন্দিরে উপাসনা কিংবা ধর্মীয় আচার পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের চিন্তাভাবনা, আচরণ, পারস্পরিক সম্পর্ক এবং দৈনন্দিন জীবনযাপনে মানবিক মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটলেই ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা সার্থক হয়ে ওঠে।

অনুষ্ঠানে জয় ঠাকুর সেবা সমিতির সভাপতি অসীম বিশ্বাস, সাধারণ সম্পাদক বিশ্বজিৎ দেব, রাজু হালদার, কিশোর পুরকায়স্থ, কিশোর দত্ত, রাহুল পাল-সহ সমিতির অন্যান্য সদস্য ও ভক্তবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *