বরাক তরঙ্গ, ২৭ জুলাই : অসমের ঐতিহাসিক শহর শিবসাগরে বন্যার জল ধীরে ধীরে নেমে গেলেও হাজার হাজার ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের দুর্ভোগ যেন এখনই প্রকৃত অর্থে শুরু হয়েছে। জেলার বিভিন্ন এলাকায় অসংখ্য মানুষ ঘরবাড়ি, সহায়-সম্বল হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
জেলার সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলির মধ্যে অন্যতম সন্তাক গ্রামের ২২ বছর বয়সী মোহিনী মল্লিক বলেন, “কিছুই বাঁচানোর সময় পাইনি। প্রাণ নিয়ে দৌড়ে পালাতে হয়েছে। এখন আমাদের বাড়ি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। রাস্তার ধারে থাকতে হচ্ছে। খাবার, পানীয় জল, পোশাক ও ওষুধের তীব্র সংকট রয়েছে। বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ও অন্য জেলার মানুষ সাহায্য করলেও প্রশাসনের কাছ থেকে এখনও পর্যাপ্ত সহায়তা পাইনি।”
আরও এক বাসিন্দা জানান, “স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে অন্তত ১৫ বছর লেগে যাবে। বন্যা আমাদের পাঁচ মিনিট সময়ও দেয়নি। সবকিছু হারিয়ে এখন কোথা থেকে শুরু করব, সেটাই বুঝতে পারছি না।”
একসময়ের আহোম সাম্রাজ্যের রাজধানী শিবসাগরে এমন ধ্বংসযজ্ঞ গত কয়েক দশকে কেউ দেখেননি। জেলা প্রশাসনের মতে, গত ৫০ বছরের মধ্যে এটাই সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যা। জেলার কমিশনার মৃদুল যাদব জানান, বন্যায় জেলার তিনটি রাজস্ব চক্রের অন্তর্গত ৩০১টি রাজস্ব গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। প্রায় চার লক্ষ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, যার মধ্যে নজিরা ও শিবসাগর বিধানসভা এলাকায় সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় এ পর্যন্ত ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং এখনও সাতজন নিখোঁজ রয়েছেন।
উদ্ধার অভিযানে রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (এসডিআরএফ) ও জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (এনডিআরএফ)-এর দল ৬০টি উদ্ধার নৌকা ও ৬২টি দেশি নৌকার সহায়তায় প্রায় ২০ হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে যায়।
বর্তমানে পানি নামতে শুরু করায় প্রশাসন উদ্ধার অভিযান থেকে পুনর্বাসন কার্যক্রমে জোর দিচ্ছে। ভারী যন্ত্রের সাহায্যে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে রাস্তা চলাচলের উপযোগী করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে ৫০টিরও বেশি ত্রাণ শিবির ও ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্র চালু হয়েছে এবং দ্বিতীয় দফার ত্রাণ বিতরণ শুরু হয়েছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির মধ্যে মুখ্যমন্ত্রীর বিশেষ পারিবারিক সহায়তা কিট বিতরণেরও পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
বন্যায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া গ্রামগুলিতে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে প্রায় ১০ হাজার কেজি খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হয়েছে, যার ফলে প্রায় দুই হাজার পরিবার উপকৃত হয়েছে।
এদিকে, বন্যার পর জলবাহিত রোগের সংক্রমণ রোধে স্বাস্থ্য বিভাগও বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। জেলার ২০০টিরও বেশি ত্রাণ শিবিরে ৩৮টি মেডিক্যাল টিম চিকিৎসা ও প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করছে।



