বরাক তরঙ্গ, ১০ অক্টোবর : সাহিত্যচর্চা, সৃজনশীলতা ও মননশীলতার এক অনন্য ঐতিহ্যকে বহন করে রাধামাধব কলেজের বাংলা বিভাগের উদ্যোগে প্রকাশিত ঐতিহ্যবাহী দেয়াল পত্রিকা ‘কৃষ্ণকলি’র বিংশতম সংখ্যার শুভ উন্মোচন অনুষ্ঠিত হল শনিবার। এদিন আনুষ্ঠানিক ভাবে পত্রিকার নতুন সংখ্যার উন্মোচন করেন কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ড. অরুন্ধতী দত্ত চৌধুরী।
এদিনের অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে রাধামাধব কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ড. অরুন্ধতী দত্ত চৌধুরী বলেন, ‘কৃষ্ণকলি’ কেবল বাংলা বিভাগের একটি দেওয়াল পত্রিকা নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে রাধামাধব কলেজের দীর্ঘদিনের আবেগ, ভালোবাসা ও ঐতিহ্য। প্রতি বছরের মতো এবারও মহালয়ার পুণ্যলগ্নে এই ঐতিহ্যবাহী দেওয়াল পত্রিকার উন্মোচন হতে পেরে তিনি আনন্দ প্রকাশ করেন। তাঁর কথায়, শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল মনন, কল্পনাশক্তি ও স্বপ্ন দেখার প্রবণতার মধ্য দিয়েই তাঁদের নিজস্ব অনুভূতি ও ভাবনার প্রকাশ ঘটেছে ‘কৃষ্ণকলি’র পাতায়। ‘কৃষ্ণকলি’র বিংশতম সংস্করণকে সুশোভিত ও সার্থক করে তোলার জন্য বাংলা বিভাগের ছাত্রছাত্রী এবং শিক্ষক-শিক্ষিকাদের আন্তরিক অভিনন্দন ও ধন্যবাদ জানান তিনি।

কলেজের উপাধ্যক্ষ ড. রাহুল চক্রবর্তী তাঁর বক্তব্যে ‘কৃষ্ণকলি’র সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ব্যক্তিগত স্মৃতির কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘কৃষ্ণকলি’র নাম শুনলেই তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন, কারণ এই দেওয়াল পত্রিকার প্রথম সংখ্যা প্রকাশের সঙ্গে তিনি ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। তৎকালীন বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও কলেজের প্রাক্তন উপাধ্যক্ষ প্রয়াত ড. ননীগোপাল দেবনাথের মস্তিষ্কপ্রসূত ভাবনা থেকেই এই দেওয়াল পত্রিকার সূচনা হয়েছিল; ‘কৃষ্ণকলি’ নামটিও তাঁরই দেওয়া। এদিন তিনি নিজের স্বরচিত কবিতা ‘আমাদের কৃষ্ণকলি’ পাঠ করে শোনান। কবিতার মধ্য দিয়ে তিনি প্রয়াত ড. ননীগোপাল দেবনাথের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন, যা অনুষ্ঠানে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি করে।
বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. কালিপদ দাস তাঁর বক্তব্যে ‘কৃষ্ণকলি’র পথচলার ইতিহাস তুলে ধরেন। তিনি জানান, এই ঐতিহ্যবাহী দেওয়াল পত্রিকা প্রকাশের প্রথম ভাবনা এসেছিল তৎকালীন বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান তথা কলেজের প্রাক্তন উপাধ্যক্ষ প্রয়াত ড. ননীগোপাল দেবনাথের কাছ থেকেই। মহালয়ার পুণ্যতিথিতে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা তর্পণের মাধ্যমে তাঁদের পূর্বপুরুষদের স্মরণ করেন। সেই তাৎপর্যপূর্ণ দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে ‘কৃষ্ণকলি’র বিংশতম সংস্করণ প্রয়াত ড. ননীগোপাল দেবনাথের স্মৃতির উদ্দেশে উৎসর্গ করা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এর মধ্য দিয়ে রাধামাধব কলেজের বাংলা বিভাগ তার এক প্রিয় শিক্ষক ও এই ঐতিহ্যের অন্যতম রূপকারের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা নিবেদন করেছে। তিনি আরও বলেন, একটি দেয়াল পত্রিকার প্রতিটি লেখা, প্রতিটি কবিতা, প্রতিটি শব্দের পেছনে থাকে একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব ভাবনা, অনুভূতি এবং নিজেকে প্রকাশ করার আকাঙ্ক্ষা। অনেক সময় শ্রেণিকক্ষের চার দেওয়ালের মধ্যে যে প্রতিভা সুপ্ত অবস্থায় থাকে, সাহিত্যচর্চার এমন একটি মঞ্চ তাকে সবার সামনে তুলে ধরার সুযোগ করে দেয়। আমার বিশ্বাস, ‘কৃষ্ণকলি’ সেই সুযোগ সৃষ্টির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে করে চলেছে।

বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. সূর্যসেন দেব তাঁর বক্তব্যে ‘কৃষ্ণকলি’র সঙ্গে নিজের দীর্ঘদিনের সম্পর্কের কথা স্মরণ করেন। তিনি জানান, দেওয়াল পত্রিকাটির প্রথম সংখ্যা প্রকাশের সময় তিনি ছিলেন একজন ছাত্র এবং সেই সময় থেকেই এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত থাকার সুযোগ পেয়েছিলেন। সময়ের পরিক্রমায় আজ সেই একই ‘কৃষ্ণকলি’র বিংশতম সংস্করণ উন্মোচন অনুষ্ঠানে কলেজের শিক্ষক হিসেবে সঞ্চালনার দায়িত্ব পালন করতে পেরে তিনি গভীর আনন্দ ও গর্ব অনুভব করছেন। তাঁর এই অভিজ্ঞতা ‘কৃষ্ণকলি’র দীর্ঘ পথচলা, প্রজন্মের পরিবর্তন এবং কলেজের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতাকে বিশেষভাবে তুলে ধরে।
এদিনের অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন গ্রন্থাগারিক ড. সোনালি চৌধুরী, অধ্যাপক ড. আশিসতরু রায়, সৌম্যজ্যোতি চৌধুরী প্রমুখ। গোটা অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. সূর্যসেন দেব। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন দৈপায়ন দত্ত বিশ্বাস। উল্লেখ্য দেয়াল পত্রিকা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন কলেজ পড়ুয়া আদ্রিজা দত্ত, পায়েল চক্রবর্তী, রাজশ্রী ভট্টাচার্য, স্নেহা দত্ত, পিনাক দাস ও প্রীতম চক্রবর্তী। কলেজের অধ্যাপক-অধ্যাপিকা, অশিক্ষক কর্মচারী, গ্রন্থাগার কর্মী এবং ছাত্রছাত্রীদের উপস্থিতিতে কলেজের শিক্ষামূলক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে এক সাহিত্যঘন আবহের সৃষ্টি হয়। শিক্ষার পাশাপাশি সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চার ধারাকে আরও সমৃদ্ধ করার প্রত্যয়ে ‘কৃষ্ণকলি’র এই নতুন সংখ্যা রাধামাধব কলেজের সৃজনশীল ঐতিহ্যকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে বলে মনে করা হচ্ছে।



