ক্ষমতালোভীরা কখনও প্রকৃত জননেতা হতে পারেন না : শাহাদত আহমদ চৌধুরী

Spread the news

মোহাম্মদ জনি, শ্রীভূমি।
বরাক তরঙ্গ, ১৫ জুন : রাজনীতিতে আদর্শের চেয়ে ক্ষমতাকে বড় করে দেখার প্রবণতা আজ নতুন কিছু নয়। তবে জনগণ সবসময়ই সুযোগসন্ধানী রাজনীতি আর নীতিনিষ্ঠ রাজনীতির পার্থক্য বুঝতে সক্ষম। ক্ষমতার মোহে দলবদল করে হয়তো সাময়িকভাবে রাজনৈতিক সুবিধা আদায় করা যায়, কিন্তু মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন গড়া যায় না।

কথিত আছে ক্ষমতা, পদ-পদবী কিংবা রাজনৈতিক সুবিধার জন্য আদর্শ বিসর্জন দেওয়ার সংস্কৃতি গণতন্ত্রের জন্য অশনি সংকেত। জনগণের আস্থা অর্জন করতে বছরের পর বছর সংগ্রাম করতে হয়, কিন্তু সেই আস্থা হারাতে লাগে মাত্র কয়েকটি ভুল সিদ্ধান্ত। প্রাক্তন সাংসদ সুস্মিতা দেবের বিজেপিমুখী রাজনৈতিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে ক্ষোভ উগরে দিয়ে করিমগঞ্জ জেলা কংগ্রেসের মিডিয়া বিভাগের চেয়ারম্যান  বলেছেন, ‘ক্ষমতালোভীরা কখনো জনগণের প্রকৃত নেতা হতে পারেন না। ক্ষমতার লোভে আদর্শ ও নীতিকে বিসর্জন দেওয়া ব্যক্তিরা হয়তো সাময়িকভাবে ক্ষমতার অলিন্দে স্থান করে নিতে পারেন, কিন্তু সাধারণ মানুষের হৃদয়ে কখনোই স্থায়ী আসন গড়তে পারেন না। জনগণ সবকিছু দেখেন, বিচার করেন এবং সময়মতো তার রায়ও দিয়ে দেন।

প্রাক্তন সাংসদ সুস্মিতা দেবের বিজেপির প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন এবং রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন করে প্রকাশ্যে  বিজেপিমুখী রাজনৈতিক অবস্থানের কেন্দ্র করে তীব্র সমালোচনা করে এমনই মন্তব্য করলেন করিমগঞ্জ জেলা কংগ্রেসের মিডিয়া বিভাগের চেয়ারম্যান শাহাদত আহমদ চৌধুরী। এক বিবৃতিতে বলেন, আদর্শহীন ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি কখনওই জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারে না। ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা আর জনগণের হৃদয়ে স্থান পাওয়া এক বিষয় নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি আরও বলেন  আমরা বহু আগেই সতর্ক করেছিলাম যে বরাক উপত্যকায় তৃণমূল কংগ্রেসের বিস্তার কোনো আদর্শিক রাজনীতির অংশ ছিল না। বিধানসভা নির্বাচনের আগে আমরা স্পষ্টভাবে বলেছিলাম, সুস্মিতা দেব আসলে বিজেপিরই পরোক্ষ সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন। কারণ যেসব আসনে কংগ্রেসের জয়ের সম্ভাবনা ছিল প্রবল, ঠিক সেসব আসনেই তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী দিয়ে বিরোধী ভোট বিভক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছিল। এর ফলে বিজেপির জয়ের পথ আরও সহজ হয়ে ওঠে। আজ সুস্মিতা দেবের বিজেপির প্রতি প্রকাশ্য অনুরাগ এবং রাজনৈতিক অবস্থানের পরিবর্তন আমাদের সেই বক্তব্যকেই অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণ করেছে।”

তিনি আরও বলেন, “যদি প্রয়াত কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং বরাক উপত্যকার কিংবদন্তি নেতা সন্তোষমোহন দেব আজ জীবিত থাকতেন, তাহলে কন্যার এই রাজনৈতিক অবস্থান দেখে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেতেন তিনিই। কারণ তিনি সারাজীবন আদর্শ, ত্যাগ এবং জনসেবার রাজনীতি করেছেন। তিনি কখনও ক্ষমতার জন্য নীতি বিসর্জন দেননি।”

শাহাদত চৌধুরীর বক্তব্য অনুযায়ী, বিরোধী দলে থেকেও জনগণের জন্য কাজ করা যায়, যদি সেই সদিচ্ছা এবং রাজনৈতিক সততা থাকে। তিনি বলেন, “গণতন্ত্রে বিরোধী দলের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জনগণের স্বার্থে সরকারের কাছে দাবি আদায় করতে হয়, আন্দোলন করতে হয়, সংসদে এবং রাজপথে সংগ্রাম করতে হয়। কিন্তু তার জন্য ক্ষমতাসীন দলের ছত্রছায়ায় যাওয়ার কোনও প্রয়োজন নেই।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, “কংগ্রেস সুস্মিতা দেবকে কী দেয়নি? কংগ্রেসই তাকে রাজনৈতিক পরিচিতি দিয়েছে, নেতৃত্বের সুযোগ দিয়েছে, বিধায়ক বানিয়েছে, দেশের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ কাছাড় লোকসভা আসন থেকে সাংসদ নির্বাচিত করেছে। সমাজে সম্মান, পরিচিতি এবং গ্রহণযোগ্যতা—সবই তিনি কংগ্রেসের মাধ্যমেই পেয়েছেন। কিন্তু অসমে সরকার পরিবর্তনের পর নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে তিনি কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেন। পরে তৃণমূল কংগ্রেসের মনোনয়নে রাজ্যসভার সাংসদ হন। আর আজ রাজনৈতিক সুবিধার জন্য সেই দলকেও পরিত্যাগ করে বিজেপির প্রতি অনুরাগ প্রকাশ করছেন।”

তিনি বলেন, “এ ধরনের রাজনীতি আদর্শের নয়, সুবিধাবাদের রাজনীতি। জনগণ এখন বুঝতে পারছেন, কিছু নেতা-নেত্রীর কাছে আদর্শ, নীতি বা রাজনৈতিক দর্শনের কোনও মূল্য নেই। তাদের একমাত্র লক্ষ্য ক্ষমতা এবং ব্যক্তিগত স্বার্থ। এ কারণেই জনগণের কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতা ক্রমশ কমে যায়।

বরাক উপত্যকার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে শাহাদত আহমদ চৌধুরী বলেন, “আজ বরাক উপত্যকার মানুষ নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত। শহরের প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা পর্যন্ত ভগ্নদশায় পরিণত হয়েছে। স্বাস্থ্য পরিষেবা কার্যত ভেঙে পড়েছে। জল জীবন মিশন বহু জায়গায় কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ। শিল্পায়নের কোনো নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়নি। নতুন কল-কারখানা গড়ে ওঠেনি। হাজার হাজার শিক্ষিত বেকার যুবক-যুবতী কর্মসংস্থানের অভাবে দিশেহারা। মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব, অবকাঠামোগত সংকটসহ নানা জ্বলন্ত সমস্যার কোনো কার্যকর সমাধান দেখা যাচ্ছে না।

তিনি বলেন, “বরাকের মানুষ একসময় সুস্মিতা দেবের প্রতি অনেক আশা ও আস্থা রেখেছিলেন। কিন্তু তার ধারাবাহিক রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন এবং সুযোগসন্ধানী কর্মকাণ্ডে সেই আস্থা আজ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কথায় আছে।স্থান ছাড়লে মান যায়’। আজ সুস্মিতা দেবের রাজনৈতিক অবস্থাও অনেকটা সেরকম হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কটাক্ষ করে শাহাদত চৌধুরী বলেন, “কংগ্রেসে থাকাকালীন তিনি সোনিয়া গান্ধী ও রাহুল গান্ধীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন। তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেওয়ার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিজের রাজনৈতিক আদর্শ হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। আর আজ বিজেপির প্রতি অনুরাগ দেখিয়ে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার প্রশংসা করছেন। জনগণ প্রশ্ন করছেন—আসলে তার রাজনৈতিক আদর্শ কোথায়?।

তিনি আরও বলেন, “আজ যদি তিনি দাবি করেন যে বিজেপিই বরাক উপত্যকার উন্নয়ন করেছে, তাহলে কি তিনি বলতে চান যে গত কয়েক দশকে কংগ্রেস বরাকের জন্য কিছুই করেনি? তাহলে তিনি শুধু কংগ্রেসকেই নয়, নিজের বাবা প্রয়াত সন্তোষ মোহন দেবের অবদানকেও অস্বীকার করছেন। শাহাদত চৌধুরী স্মরণ করিয়ে দেন, “শিলচর মেডিক্যাল কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, আসাম বিশ্ববিদ্যালয়, কাগজ কল, সুগার মিল, আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়াম ও ক্রীড়া অবকাঠামোসহ বরাক উপত্যকার অসংখ্য উন্নয়নমূলক প্রকল্প কংগ্রেস আমলেই বাস্তবায়িত হয়েছে। এগুলোর ইতিহাস লিখতে গেলে একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ রচনা করতে হবে।

তিনি বলেন, প্রয়াত জননেতা সন্তোষ মোহন দেব কেন্দ্রীয় মন্ত্রী থাকাকালীন বরাক উপত্যকার যোগাযোগ ব্যবস্থা, টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিলেন। সেই অবদান বারাক উপত্যকার মানুষ আজও  শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।বিবৃতির শেষে শাহাদত আহমদ চৌধুরী বলেন, সুস্মিতা দেব নিজের রাজনৈতিক স্বার্থে যেকোনও দলের নেতার প্রশংসা করতে পারেন, সেটি তাঁর ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু রাজনৈতিক সুবিধার জন্য বরাক উপত্যকার গর্ব, প্রয়াত ময়ীনুল হক চৌধুরী, সন্তোষমোহন দেব, দীনেশপ্রসাদ গোয়ালা, আলতাফ হোসেন মজুমদারসহ কংগ্রেসের প্রয়াত বর্ষীয়ান নেতাদের অবদানকে খাটো করার চেষ্টা কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বরাকের মানুষ তাদের অবদান কখনও ভুলবেন না এবং ইতিহাসও তাদের যথাযথ মর্যাদা দিয়েই স্মরণ করবে। ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী কিন্তু আদর্শ ও জনসেবা চিরস্থায়ী। জনগণের হৃদয়ে স্থান করে নিতে হলে ক্ষমতার নয়, মানুষের রাজনীতি করতে হয় এই বার্তাই আজ আবারও স্মরণ করিয়ে দিলেন করিমগঞ্জ জেলা কংগ্রেসের মিডিয়া বিভাগের চেয়ারম্যান শাহাদত আহমদ চৌধুরী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *