।। পাভলব লস্কর।।
(প্রাক্তন ছাত্রনেতা)
১ জুলাই : দেহব্যবসা এমন একটি সামাজিক বাস্তবতা, যা নিয়ে সমাজে যুগ যুগ ধরে নানা ধরনের বিতর্ক, সমালোচনা ও নৈতিক বিচার বিদ্যমান। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত নারীদেরই সমাজ দোষারোপ করে, অথচ এর পেছনে যে জটিল অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কারণ কাজ করে, সেগুলো অনেক সময় আড়ালেই থেকে যায়।
প্রকৃতপক্ষে দেহব্যবসা কেবল একজন নারীর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত বা চরিত্রের প্রশ্ন নয়; এটি দারিদ্র্য, বৈষম্য, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের অভাব, লিঙ্গবৈষম্য এবং পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার শোষণের একটি কঠিন প্রতিফলন।
অর্থনৈতিক দুর্দশা দেহব্যবসায় জড়িয়ে পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ। সমাজের নিম্ন আয়ের বহু নারী, বিশেষ করে যারা পরিবারে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি, তারা জীবিকার তাগিদে এমন কাজে বাধ্য হন যা তারা কখনও স্বেচ্ছায় বেছে নিতেন না। অনেক নারী স্বামী পরিত্যক্ত, বিধবা অথবা পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়ে জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হন। পর্যাপ্ত শিক্ষা, দক্ষতা কিংবা কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকায় তাদের সামনে বিকল্প পথ সীমিত হয়ে পড়ে। ফলে বেঁচে থাকার সংগ্রামে কেউ কেউ দেহব্যবসায় যুক্ত হতে বাধ্য হন। তাই তাদের কেবল নৈতিকতার কাঠগড়ায় দাঁড় করানো সমস্যার মূল কারণকে অস্বীকার করার শামিল।
পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা এই সমস্যাকে আরও গভীর করে তোলে। আমাদের সমাজে নারীর স্বাধীনতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা এখনও নানা বাধার মুখে। বহু ক্ষেত্রে নারীরা পারিবারিক ও সামাজিক নির্যাতনের শিকার হন। বাল্যবিবাহ, যৌতুক, পারিবারিক সহিংসতা, যৌন নির্যাতন এবং নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ অনেককে ঘরছাড়া করে। এমন দুর্বল অবস্থার সুযোগ নেয় মানবপাচারকারী চক্র ও অসাধু দালালরা। প্রতারণা, চাকরির প্রলোভন কিংবা বিয়ের আশ্বাস দিয়ে অসংখ্য নারী ও কিশোরীকে দেহব্যবসায় ঠেলে দেওয়া হয়। এখানে নারীরা অপরাধী নন; বরং তারা প্রায়ই শোষণ ও প্রতারণার শিকার।
দেহব্যবসা টিকে থাকার পেছনে শুধু সরবরাহ নয়, চাহিদাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সমাজে যখন কোনোকিছুর চাহিদা বিদ্যমান থাকে, তখনই এর উপর ব্যবসা পরিচালিত হয়। অথচ সামাজিক সমালোচনার তীর প্রায়শই কেবল নারীদের দিকেই ছোড়া হয়, কিন্তু এই বাজারের হর্তাকর্তা, ক্রেতা এবং শোষকদের ভূমিকা অনেক সময় উপেক্ষিত থাকে। ফলে দায়বদ্ধতার ভার একতরফাভাবে নারীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়, যা ন্যায়সংগত নয়।
তবে এটিও মনে রাখা জরুরি যে, সব মানুষ একই কারণে দেহব্যবসায় যুক্ত হন না। কেউ অর্থনৈতিক সংকটে বাধ্য হন, কেউ মানবপাচারের শিকার হন, আবার কোথাও কোথাও প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি নিজ সিদ্ধান্তেও যৌনকর্মে যুক্ত হতে পারেন। তাই এই বিষয়টি একমাত্রিক নয়। সব পরিস্থিতিকে একই দৃষ্টিতে বিচার করলে বাস্তবতার জটিলতা বোঝা সম্ভব হয় না। ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, জবরদস্তি, দারিদ্র্য ও শোষণের ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটকে আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
এই সমস্যার সমাধান কেবল সমালোচনা ও আক্রমণ ও হেনস্থা করার মাধ্যমে সম্ভব নয়। এর জন্য দরকার দারিদ্র্য বিমোচন, নারীর শিক্ষা নিশ্চিত করা, দক্ষতা উন্নয়ন, নিরাপদ কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচীর সম্প্রসারণ। একই সঙ্গে মানবপাচার, জোরপূর্বক যৌন শোষণ এবং নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সমাজে নারীর প্রতি সম্মান, সমঅধিকার এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা গেলে অনেক নারী বাধ্য হয়ে এই পথে নামার ঝুঁকি থেকে মুক্ত থাকতে পারবেন।
পাশাপাশি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিরও পরিবর্তন প্রয়োজন। যারা শোষণ, দারিদ্র্য বা প্রতারণার শিকার হয়ে দেহব্যবসায় যুক্ত হয়েছেন, তাদের প্রতি ঘৃণা বা অবজ্ঞা নয়, বরং মানবিক সহানুভূতি এবং পুনর্বাসনের সুযোগ সৃষ্টি করা উচিত।
সবশেষে বলা যায়, দেহব্যবসাকে শুধু নারীর নৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে সমস্যার প্রকৃত কারণ আড়াল হয়ে যায়। এর পেছনে অর্থনৈতিক বৈষম্য, সামাজিক বঞ্চনা, লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য এবং পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই এই সমস্যার সমাধানও হতে হবে মানবিক, বাস্তবসম্মত এবং বহুমাত্রিক। দোষারোপের পরিবর্তে যদি শোষণের কারণগুলো দূর করার চেষ্টা করা হয়, তবে হয়তো একটি অধিক ন্যায়ভিত্তিক, সমতাপূর্ণ ও মানবিক সমাজ গঠনের পথে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।



