মোহাম্মদ জনি, শ্রী ভূমি।
বরাক তরঙ্গ, ১৩ আগস্ট : বিচারাধীন মামলায় আসামির স্বেচ্ছায় অপরাধ বা দোষ স্বীকার করার আইনি অধিকার রয়েছে। তবে কোনও ব্যক্তি বা সংস্থার প্রভাব, চাপ কিংবা প্ররোচনায় ‘গিল্টি প্লিড’ করানোর চেষ্টা অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে অভিযোগ তুলেছেন শ্রীভূমি জেলার আইনজীবীরা।
বিচারাধীন মামলায় পুলিশের অযাচিত হস্তক্ষেপের অভিযোগকে কেন্দ্র করে জেলার দুটি আইনজীবী বারের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। বুধবার শ্রীভূমি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাডভোকেটস বারে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে জেলার দুটি বারের আইনজীবীরা পুলিশের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ করেন।
আইনজীবীরা অভিযোগ করেন, কোনও মামলার তদন্ত শেষ করে পুলিশ আদালতে চার্জশিট দাখিল করার পর বিচারাধীন সেই মামলার বিচারপ্রক্রিয়ায় পুলিশের সরাসরি প্রভাব বিস্তারের সুযোগ নেই। অথচ, বিভিন্ন মামলার আসামিদের মামলা শেষ করে দেওয়ার কথা বলে ডেকে এনে আদালতে ‘দোষ স্বীকার’ বা ‘গিল্টি প্লিড’ করার দিকে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে।
আইনজীবীদের দাবি, গ্রামের অশিক্ষিত কিংবা অর্ধশিক্ষিত সাধারণ মানুষ অনেক সময় ‘দোষ স্বীকার’-এর আইন ও ভবিষ্যৎ পরিণতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত থাকেন না। আদালতে নিজের মুখে অপরাধ স্বীকার করার পর তার প্রভাব ভবিষ্যতে চাকরি, পাসপোর্ট, পুলিশ ভেরিফিকেশন-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পড়তে পারে। ফলে—
বিষয়টি শুধু সংশ্লিষ্ট আসামির জন্য নয়, তার নিযুক্ত আইনজীবীর ক্ষেত্রেও সমস্যার সৃষ্টি করছে। ডিস্ট্রিক্ট অ্যাডভোকেটস বারের সভাপতি তরুণ চক্রবর্তী অভিযোগ করেন, পুলিশের কাছে আদালতে চলা মামলাগুলির তালিকা ও নির্ধারিত তারিখ সম্পর্কে তথ্য থাকে। তদন্ত শেষ করে চার্জশিট দাখিলের পর বিচারাধীন মামলায় পুলিশের সরাসরি হস্তক্ষেপের কোনও এক্তিয়ার থাকা উচিত নয়। তাঁর অভিযোগ, জেলায় ‘কনভিকশন’ বা দণ্ডের হার বাড়ানোর লক্ষ্যে আসামিদের ডেকে এনে ‘দোষ স্বীকার’ করানোর একটি কৌশল গ্রহণ করা হচ্ছে। তরুণ চক্রবর্তী আরও জানান, মামলা শেষ করে দেওয়ার কথা বলে আসামিদের আদালতে হাজির করিয়ে তাদের দিয়ে দোষ স্বীকার করানোর ফলে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হচ্ছেন।
এই পরিস্থিতির বিরুদ্ধে জেলার সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার ও নাগরিক অধিকার রক্ষার স্বার্থে দেশের রাষ্ট্রপতি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী, গৌহাটি হাইকোর্টের মুখ্য বিচারপতি, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং অসম মানবাধিকার কমিশনের কাছে স্মারকপত্র পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
শ্রীভূমি বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আতিকুল বারি চৌধুরী বলেন, একজন আসামির নিজের অপরাধ বা দোষ স্বীকার করার আইনি অধিকার রয়েছে, কিন্তু সেই স্বীকারোক্তি অবশ্যই স্বেচ্ছায় হওয়া প্রয়োজন। কোনওভাবে প্রভাবিত বা প্ররোচিত করে দোষ স্বীকার করানো গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁর মতে, দোষ স্বীকারের ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি দণ্ডপ্রাপ্ত হিসেবে রেকর্ডভুক্ত হলে ভবিষ্যতে চাকরি কিংবা পাসপোর্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পুলিশ ভেরিফিকেশনের সময় সমস্যার মুখোমুখি হতে পারেন।
ডিস্ট্রিক্ট অ্যাডভোকেটস বারের সম্পাদক বিজনকুমার পাল অভিযোগ করেন, আদালতে বিচারাধীন মামলার নির্ধারিত তারিখে আসামিদের ‘গিল্টি প্লিড’ বা দোষ স্বীকার করানোর জন্য চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তাঁর দাবি, মামলা দ্রুত শেষ করে দেওয়ার কথা বলে কখনও কখনও আসামিদের বাড়ি থেকে ডেকে এনে আদালতে হাজির করানো হচ্ছে এবং এর ফলে আইনজীবীদের ভূমিকা ও মর্যাদাও প্রশ্নের মুখে পড়ছে।
শ্রীভূমি বার অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক দুলুরঞ্জন দাস বলেন, সাধারণ মানুষের স্বার্থে জেলার দুটি বারের আইনজীবীরা ঐক্যবদ্ধ। তাঁর অভিযোগ, আজ যাদের মামলা শেষ করে দেওয়ার কথা বলে আদালতে এনে দোষ স্বীকার করানো হচ্ছে, ভবিষ্যতে সেই দণ্ডের রেকর্ডই তাদের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি কাজে সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অনলাইনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাম অনুসন্ধান করলেও তার দণ্ডের তথ্য সামনে আসতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
আইনজীবী রাজেশ মালা বলেন, আইনজীবীদের কাছে তাঁদের মক্কেলদের স্বার্থ সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পায়। তাই ‘গিল্টি প্লিড’-এর ক্ষেত্রে পুলিশের অযাচিত প্রভাব কোনওভাবেই কাম্য নয়। তাঁর মতে, বিষয়টি সমাজের জন্যও একটি অশনিসংকেত।
আইনজীবী বিভাস বর্ধন বলেন, আইনি বিচারে আদালতের মাধ্যমে কোনও আসামি দোষী সাব্যস্ত হওয়া এবং চাপ বা প্ররোচনার মাধ্যমে দোষ স্বীকার করানো—দু’টি পৃথক বিষয়। তাঁর অভিযোগ, চাপের মুখে দোষ স্বীকার করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ভবিষ্যতে বহুমুখী সমস্যার সম্মুখীন হতে পারেন। বিশেষ করে জমি বা ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ থেকে তৈরি হওয়া মামলায় দোষ স্বীকার করলে ভূমির অধিকার নিয়েও জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পাশাপাশি ড্রাইভিং লাইসেন্স নবীকরণ থেকে শুরু করে শিক্ষিত বেকারদের চাকরির সুযোগের ক্ষেত্রেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে তিনি দাবি করেন।
সাংবাদিক সম্মেলনে আইনজীবীরা স্পষ্ট করেন, তাঁদের আপত্তি স্বেচ্ছায় আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কোনও আসামির দোষ স্বীকারের অধিকারের বিরুদ্ধে নয়। তাঁদের মূল অভিযোগ বিচারাধীন মামলায় আসামিদের প্রভাবিত করে বা ভুল তথ্য দিয়ে ‘গিল্টি প্লিড’ করানোর সম্ভাব্য পুলিশি ভূমিকা নিয়ে। এই অভিযোগের যথাযথ তদন্ত ও প্রতিকার দাবি করেই বিভিন্ন সাংবিধানিক ও মানবাধিকার কর্তৃপক্ষের দ্বারস্থ হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জেলার দুটি আইনজীবী বার।



