বরাক তরঙ্গ, ১৮ মে, সোমবার,
১৯৬১ সালের এই দিনটি বরাক উপত্যকার ইতিহাসে এক বেদনাবিধুর অথচ গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। মাতৃভাষা বাংলার সাংবিধানিক মর্যাদা ও ভাষাগত অধিকার রক্ষার দাবিতে রাস্তায় নেমেছিলেন সাধারণ মানুষ। কিন্তু তৎকালীন উগ্র অসমিয়া জাতীয়তাবাদী সরকারের দমনমূলক নীতির জেরে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান ১১ জন ভাষা সংগ্রামী। তাঁদের আত্মবলিদানের বিনিময়েই বরাক উপত্যকায় বাংলা ভাষা তার ন্যায্য মর্যাদা ফিরে পায়।
কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, এত দশক অতিক্রান্ত হওয়ার পরও ১৯শে মে-র ভাষা শহিদরা আজও সরকারি স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত। বরাক ও ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার মধ্যে সম্প্রীতি ও সৌভ্রাতৃত্বের কথা বারবার উচ্চারিত হলেও বাস্তবে বরাকের ইতিহাস, আবেগ ও আত্মত্যাগকে যথাযোগ্য মর্যাদা দেওয়া হয়নি বলেই সাধারণ মানুষের মনে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ জমে রয়েছে। বিশেষ করে, বিদেশি বিতাড়ন আন্দোলনে নিহতদের সরকারিভাবে শহিদের মর্যাদা দেওয়া হলেও মাতৃভাষার অধিকারের জন্য প্রাণ বিসর্জনকারী ভাষা শহিদদের এখনও সেই স্বীকৃতি না মেলা গভীর বৈষম্যের ইঙ্গিত বহন করে।
১৯শে মের ভাষা আন্দোলন কোনও বিচ্ছিন্ন আঞ্চলিক আন্দোলন ছিল না। এটি ছিল সাংবিধানিক অধিকার, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং ভাষাগত মর্যাদা রক্ষার লড়াই। নিজের মাতৃভাষায় শিক্ষা গ্রহণ, প্রশাসনিক কাজ পরিচালনা এবং সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষা করা প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক অধিকার। সেই অধিকারের দাবিতে যাঁরা জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাঁদের সম্মান জানানো শুধু সরকারের দায়িত্বই নয়, এটি সমগ্র সমাজের নৈতিক কর্তব্য।
ঘটনাটি ঘটেছিল কংগ্রেস সরকারের আমলে। এবং মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন বিমল চালিহা। হয়তো সেই সরকার উগ্রজাতীয়তাবাদীকে তোষামোদ করতে শহিদদের সরকারিভাবে স্বীকৃতি দেয়নি। কিন্তু গত দশ বছর ধরে রাজ্যে উগ্রজাতীয়তাবাদী চিন্তাধারাকে ধূলিসাৎ করা সরকার রয়েছে তারপরও কেন স্বীকৃতি মিলছে না। এমন প্রশ্ন স্বাভাবিক ভাবেই জনমনে উঁকি মারছে। সেসময় জনগণের চাপের কাছে নতি স্বীকার করে অসম সরকার গৌহাটি হাইকোর্টের চিফ জাস্টিস গোপালজি মেহরোত্রাকে দিয়ে গুলি চালনা সম্পর্কে একটি কমিশন গঠন করাতে বাধ্য হয়, ‘মেহরোত্রা কমিশন’ নামে খ্যাত এ কমিশন যথারীতি সাক্ষীসাবুদ গ্রহণ করে রিপোর্ট অসম সরকারের কাছে জমাও দিয়েছিল। কিন্তু সরকার জনতার দাবি অগ্রাহ্য করে এই রিপোর্ট প্রকাশ করেনি।
আজ প্রয়োজন রাজনৈতিক সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে ইতিহাসকে সম্মান জানানো। ভাষা শহিদদের সরকারি স্বীকৃতি প্রদান করা হলে তা কেবল শহিদ পরিবার বা বরাকবাসীর আবেগের সম্মান রক্ষা করবে না, বরং অসমের বহুভাষিক ও বহুসাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিও প্রকৃত শ্রদ্ধা প্রদর্শন করবে। এর মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও জানতে পারবে যে গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রশ্নে বরাক উপত্যকার মানুষ কখনও আপস করেনি।
১৯শে মে একটি আত্মমর্যাদা, ভাষার অধিকার এবং গণতান্ত্রিক চেতনার প্রতীক। ভাষা শহিদদের যথাযথ মর্যাদা ও সরকারি স্বীকৃতি প্রদান করেই তাঁদের আত্মত্যাগের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা নিবেদন করা সম্ভব। এখন সময় এসেছে অসম সরকার এই ঐতিহাসিক দায় স্বীকার করে ভাষা শহিদদের প্রাপ্য সম্মান আনুষ্ঠানিকভাবে প্রদান করুক।



