বরাক তরঙ্গ, ২১ জুন : পাঁচ দশকের গৌরবময় পথচলার প্রাক্কালে বরাক উপত্যকা বঙ্গ সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলনের সুবর্ণ জয়ন্তী উৎসবের উদ্বোধনী মঞ্চে উঠে এল ভাষা, সংস্কৃতি, আত্মপরিচয় ও নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন। রবিবার শিলচর বঙ্গভবন মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, সময়ের পরিবর্তন হলেও বাঙালির আত্মপরিচয় রক্ষার সংগ্রাম আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
অনুষ্ঠানের মুখ্য অতিথি ছিলেন বিশিষ্ট সাহিত্যিক, গবেষক এবং ত্রিপুরা রাজ্য মধ্যশিক্ষা পর্ষদের প্রাক্তন সভাপতি মিহির কান্তি দেব। তিনি বলেন, উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বসবাসকারী বাঙালিদের সমস্যার ধরন ভিন্ন হলেও একটি বিষয় সর্বত্র অভিন্ন—অসহায়ত্বের অনুভূতি। তাঁর মতে, বাঙালির বর্তমান সংকটের শিকড় বহু গভীরে প্রোথিত এবং এর ব্যাখ্যা কেবল সমকালীন রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ঐতিহাসিক নানা প্রক্রিয়ার ফলেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
বরাক বঙ্গের কর্মকাণ্ডের প্রশংসা করে তিনি বলেন, সীমিত সামর্থ্য নিয়েও সংগঠনটি বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিশেষ করে দূরশিক্ষা কেন্দ্রের বাংলা ডিপ্লোমা কোর্স জাতীয় স্তরে স্বীকৃতি অর্জন করেছে, যা গর্বের বিষয়।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত শিলচরের বিধায়ক ডাঃ রাজদীপ রায় বাংলা ভাষার বিস্তার, ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস এবং উদ্বাস্তু বাঙালিদের নাগরিকত্বের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম ভাষা হিসেবে বাংলার গুরুত্ব অপরিসীম। পাশাপাশি ভাষা শহিদদের যথাযথ স্বীকৃতি প্রদানের বিষয়ে সরকার ইতিবাচক ভূমিকা নেবে বলেও আশ্বাস দেন।
সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন সমিতির সমন্বয়ক গৌতমপ্রসাদ দত্ত বলেন, সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চার পাশাপাশি নাগরিক অধিকার ও ভাষাগত মর্যাদার প্রশ্নেও বরাক বঙ্গ সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। বর্তমান প্রজন্মকে ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি তুলে ধরেন।
স্বাগত ভাষণে সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি সতু রায় বলেন, আত্মপরিচয় রক্ষার যে আন্দোলন কয়েকজন স্বপ্নদ্রষ্টার হাত ধরে শুরু হয়েছিল, আজ তা এক বৃহৎ সামাজিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। তিনি ভাষা শহিদদের স্বীকৃতি, শিলচর রেলস্টেশনের নামকরণ এবং বরাক বঙ্গকে আর্থিক সহায়তার বিষয়েও সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
প্রদীপ প্রজ্বলন, সম্মেলন সঙ্গীত ও বিশ্ব সঙ্গীত দিবস উপলক্ষে বিশেষ সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই অনুষ্ঠানে সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ, সমাজকর্মী ও বিভিন্ন স্তরের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। সুবর্ণ জয়ন্তীর এই মঞ্চ থেকে আবারও স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, ভাষা, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের প্রশ্নে বরাকবাসীর আন্দোলন এখনও জীবন্ত এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে।



