।। মিলন উদ্দিন লস্কর ।।
(সাংবাদিক, শিলচর)
৩ মে : মণিপুরে সহিংসতার সূচনার তিন বছর পূর্তির দিনেও পরিস্থিতি পুরোপুরি শান্ত হয়নি। ২০২৩ সালের ৩ মে শুরু হওয়া সহিংসতার তৃতীয় বর্ষপূর্তি কোনো সমাধানের বার্তা নিয়ে আসেনি। বরং দিনটি চিহ্নিত হয়েছে স্মরণ, বিতর্ক এবং ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যার মাধ্যমে। উপত্যকায় সভা, পাহাড়ে স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধা নিবেদন এবং নাগরিক সমাজের বৈঠক—প্রতিটি ক্ষেত্রেই ঘটনার আলাদা ব্যাখ্যা উঠে এসেছে। ফলে একক কোনো মূল্যায়নের বদলে শোক, ক্ষোভ এবং অনুত্তরিত প্রশ্নই সামনে এসেছে।
সহিংসতার পর নিরাপত্তা জোরদার, অস্ত্র উদ্ধার এবং একাধিক গ্রেফতারের মাধ্যমে পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। বড় সংঘর্ষ কমেছে ঠিকই, কিন্তু স্থায়ী শান্তি এখনও অধরা। বর্তমানে মণিপুর কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত—পাহাড় ও উপত্যকা যেন আলাদা ভূখণ্ডে পরিণত হয়েছে। বাফার জোনগুলো সাময়িক নিরাপত্তা ব্যবস্থা থেকে বাস্তবিক সীমারেখায় রূপ নিয়েছে, যা ভৌগোলিক বিভাজনের পাশাপাশি বিশ্বাসের সংকটও গভীর করেছে।
ইম্ফলে বাজার, স্কুল ও যান চলাচল স্বাভাবিক থাকলেও এই স্বাভাবিকতা অনেকটাই উপরের স্তরে সীমাবদ্ধ। মাঝেমধ্যে গুলি চলা, অস্ত্র উদ্ধার ও গ্রেপ্তারের ঘটনা প্রমাণ করে যে অন্তর্নিহিত উত্তেজনা এখনও রয়ে গেছে। সুশীল সমাজের মতে, প্রশাসন সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে কিছুটা সফল হলেও মূল সমস্যার সমাধান করতে পারেনি।
সোসম-এর মুখপাত্র নাহাকপাম শান্তা বলেন, প্রতিদিন অস্ত্র উদ্ধার ও গ্রেপ্তার হলেও সমস্যার মূলে পৌঁছানো যাচ্ছে না। তিনি সরকারি পদক্ষেপের বাস্তব মূল্যায়ন এবং গত তিন বছরের ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশের দাবি জানান।
এদিকে, সংকট ঘিরে ভিন্ন ভিন্ন বয়ান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী এন. বীরেন সিংহ এই সহিংসতাকে কেবল অভ্যন্তরীণ জাতিগত সংঘাত হিসেবে না দেখে অবৈধ অনুপ্রবেশ ও জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, মণিপুরের ঐতিহ্য সহাবস্থানের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।
অন্যদিকে, কুকি-জো সম্প্রদায়ের একাংশ এই ব্যাখ্যা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের মতে, ২০২৩ সালের সহিংসতা প্রান্তিকীকরণ, নিরাপত্তাহীনতা এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতার ফল। রবিবার চোরাচান্দপুর, কাংপোকপি ও মোরেহসহ কুকি অধ্যুষিত এলাকায় ‘বিচ্ছেদ দিবস’ পালনের মাধ্যমে এই বিভাজন আরও স্পষ্ট হয়েছে।
কুকি অধিকারকর্মী কেলঙ্গোই সাকেইবাহকাই বলেন, বিশ্বাসের সংকট এতটাই গভীর যে আগের মতো সহাবস্থান আর সম্ভব নয়।
সব মিলিয়ে, তিন বছর পর মণিপুর কোনো একক বয়ানে আবদ্ধ নয়। সুশীল সমাজের কাছে এটি অমীমাংসিত সংকট, রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে নিরাপত্তা সমস্যা, কুকি-জো জনগোষ্ঠীর একাংশের কাছে অস্তিত্বের প্রশ্ন এবং শিক্ষাবিদদের মতে এটি একটি জটিল কাঠামোগত ব্যর্থতার প্রতিফলন।
আগামী পথও অনিশ্চিত। বাস্তুচ্যুত মানুষের পুনর্বাসনের ধীরগতি, বাফার জোনের স্থায়িত্ব এবং পুনর্মিলনের সুস্পষ্ট পরিকল্পনার অভাব প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক উদ্যোগের সীমাবদ্ধতাকে স্পষ্ট করছে। ২০২৭ সালের বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে—সমাধানের বদলে রাজনৈতিক বিতর্কই হয়তো প্রাধান্য পাবে।
তিন বছর আগে শুরু হওয়া সহিংসতা আজ হয়তো প্রতিদিনের শিরোনাম নয়, কিন্তু মণিপুরে তার প্রভাব এখনও গভীর—মানুষের স্মৃতিতে, রাজনীতির অন্দরে এবং ভিন্নমুখী সত্যের সংঘাতে।



