সংগ্রামের চেতনা নিয়ে আজও পালিত হচ্ছে মে দিবস

Spread the news

।। আশু চৌধুরী ।।
(শিলচর)
১ মে : “একদিন এমন সময় আসবে, যখন কবরের নিস্তব্ধতায় শায়িত আমাদের নীরবতা জ্বালাময়ী বক্তৃতার চেয়েও অধিক শক্তিশালী হয়ে উঠবে। তা শ্রমিকশ্রেণীর চূড়ান্ত বিজয়ের সংগ্রামে অনুপ্রেরণা জোগাবে এবং শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।” — আগস্ট স্পাইজ
১৮৮৭ সালের ১১ নভেম্বর ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে শ্রমিক আন্দোলনের এই অন্যতম নেতা যে কথা বলেছিলেন, তা আজ ইতিহাসে অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণিত। তাঁদের আত্মত্যাগ ব্যর্থ হয়নি; বরং শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে তা এক অবিস্মরণীয় অধ্যায় হয়ে রয়েছে। সেই উত্তরাধিকার থেকেই ‘মে দিবস’ আজ আন্তর্জাতিক মর্যাদা পেয়েছে—শ্রমিকদের ঐক্য, সংগ্রাম ও অধিকারের প্রতীক হিসেবে।

মে দিবস আজ শুধু একটি তারিখ নয়; এটি হাজার হাজার শ্রমজীবী মানুষের পদচারণায় মুখরিত মিছিলের প্রতীক, একই পতাকার নিচে আপসহীন লড়াইয়ের অঙ্গীকার। এটি বিশ্ব শ্রমিকের ঐক্যের আহ্বান, আন্তর্জাতিক সংহতি ও সৌভ্রাতৃত্বের দিন। শ্রমজীবী মানুষের কাছে মে দিবস মানে উৎসব, জাগরণের গান, সংগ্রামে ঐক্য এবং ন্যায়ের পথে এগিয়ে চলার প্রেরণা।

তবে এই অবস্থানে পৌঁছানোর পথ মোটেও সহজ ছিল না। শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাস রচিত হয়েছে দীর্ঘ সংগ্রাম, শোষণ, জুলুম, ধর্মঘট, প্রতিবাদ ও রক্তক্ষয়ের মধ্য দিয়ে। একসময় শ্রমিকদের দিনে ১৮ থেকে ২০ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে বাধ্য করা হতো। কাজের সময় কমানোর দাবিতে উনিশ শতকের শুরু থেকেই আন্দোলন শুরু হয়, যা ধীরে ধীরে শক্তিশালী শ্রমিক সংগঠনে রূপ নেয়।

১৮৮৬ সালের ১ মে থেকে আট ঘণ্টা কাজের দাবিতে যুক্তরাষ্ট্রে যে ঐতিহাসিক আন্দোলন শুরু হয়, তা শ্রমিক আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। সেই সংগ্রামের পথ ধরেই ১৮৮৯ সালে প্যারিসে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সম্মেলনে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় প্রতি বছর ১ মে বিশ্বব্যাপী শ্রমিকদের ঐক্য ও সংগ্রামের দিন হিসেবে পালন করা হবে।
এরপর থেকে মে দিবস হয়ে ওঠে শ্রমিকশ্রেণীর অধিকার আদায়ের প্রতীক। রাশিয়ার ১৯১৭ সালের বিপ্লবসহ নানা ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে যুক্ত হয়ে এটি আরও শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সামাজিক তাৎপর্য অর্জন করে।

আজও বিশ্বজুড়ে মে দিবস পালিত হয় সংগ্রামের চেতনা নিয়ে। যদিও বহু দেশে শ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তবুও বিশ্বের বড় একটি অংশ এখনও শোষণ ও বৈষম্যের শৃঙ্খলে আবদ্ধ। তাই মে দিবস আজও প্রাসঙ্গিক, এটি শোষণমুক্ত সমাজ গড়ার শপথ, সাম্রাজ্যবাদ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের দিন।

বর্তমানে এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিশ্বের প্রায় সব দেশেই মে দিবস পালিত হয়। বহু দেশে এটি সরকারি ছুটির দিন। মিছিল, সমাবেশ ও নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে শ্রমজীবী মানুষ তাঁদের অধিকার ও ঐক্যের বার্তা তুলে ধরেন। মে দিবস শুধু অতীতের স্মৃতি নয়, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সংগ্রামের দিশা। শ্রমিকদের রক্তে অর্জিত এই দিন নতুন ভোরের প্রতিশ্রুতি বহন করে, যেখানে ন্যায়, সমতা ও মর্যাদার ভিত্তিতে গড়ে উঠবে এক মানবিক সমাজ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *