বেকারত্বের বাস্তবতা ও সরকারি দায়বদ্ধতা

Spread the news

।। প্রদীপ দত্তরায় ।।
(লেখক ছাত্র সংগঠন আকসার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও গৌহাটি হাইকোর্টের আইনজীবী)
৯ সেপ্টেম্বর : ২০২৬-২৭ অর্থ বর্ষের প্রথম তিন মাসে ভারতের জিডিপি বৃদ্ধির হার ৭.৮ শতাংশ। এটি জানিয়েছে অর্থ মন্ত্রক এবং স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী এই নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে বক্তব্য রেখেছেন। ইরাণ মার্কিন যুদ্ধের ঘনঘটায় আন্তর্জাতিক অর্থনীতি যে টালমাটাল অবস্থায় রয়েছে, তাঁর পরিপ্রেক্ষিতে এই হার নিঃসন্দেহে শক্তিশালী অর্থনীতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। কিন্তু এই হারের অনুপাতে চাকরি কেন সৃষ্টি হচ্ছে না এই প্রশ্ন তুলেছেন রিজার্ভ ব্যাঙ্কের প্রাক্তন গভর্ণর রঘুরাম রাজন। তবে শুধু তাঁর প্রশ্নই নয় সমাজবিজ্ঞানীরা আরো একটি তত্ত্ব শোনাচ্ছেন। তাঁরা বলছেন ২০১৪ সালে বিজেপি সরকারকে কেন্দ্রে ক্ষমতায় আনার পেছনে দেশের যুবক যুবতীদের এক বড় ভূমিকা ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক দিল্লির যন্তর মন্তর থেকে শুরু করে সারা দেশে তথাকথিত জেন জি রা যেভাবে সরকারের বিভিন্ন নীতির বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে সরব হচ্ছেন তাতে স্পষ্ট যে এসব শুধু পরীক্ষা দুর্নীতির সঙ্গে সংযুক্ত নয়। যে স্বপ্ন নিয়ে তাঁরা বিজেপি সরকারকে ক্ষমতায় বসিয়েছিলেন তার বাস্তবায়ন হয়নি, তাঁদের সার্বিক হতাশা এবং ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটছে এইসব আন্দোলনের মাধ্যমে। এবং এক্ষেত্রে যথাযথ কর্মসংস্থানের অভাব একটি অন্যতম প্রত্যক্ষ কারণ।

কর্মসংস্থান বিহীন প্রবৃদ্ধি
কোভিড মহামারীর বছরের ব্যতিক্রম ছাড়া ২০০৩ সাল থেকে এখন অব্দি ভারতীয় অর্থনীতি বৃদ্ধির হার ৬ শতাংশের উপরে রয়েছে। এই সময়সীমায় বেকারত্বের হার ঘোরাফেরা করেছে ছয় থেকে তিন শতাংশের মধ্যে। আপাতদৃষ্টিতে বেকারত্ব কমেছে বলে দাবি করা হলেও  এই হিসেবের আড়ালের প্রকৃত তথ্য  জটিল। ‘পিরওডিক লেবার ফোর্স সার্ভে’র তথ্য অনুযায়ী ১৫ থেকে ২৯ বছরের মধ্যে বেকারত্বের হার ২০২২-২৩ অর্থবর্ষ থেকে এখন অব্দি প্রায় ১০ শতাংশ, ২৫ বছরের বেশি স্নাতকদের ক্ষেত্রে বেকারত্ব ৪০ শতাংশের কাছাকাছি। ২০২২-২৩ থেকে ২০২৩-২৪ এই সময়সীমায় যে ৮.৬ কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে তার ৪ কোটিই কৃষি ক্ষেত্রে, এবং অবশ্যই নিম্ন আয়ের। এই রিপোর্ট অনুযায়ী  প্রায় ২৫ শতাংশ ভারতীয় যুবারা শিক্ষা, চাকরি বা প্রশিক্ষণ কোন কিছুর সাথেই যুক্ত নন।

এই ব্যাপারে নীতি আয়োগ-এর আগস্ট ২০২৬-এর রিপোর্ট Reimagining Skilling for Viksit Bharat@2047 উল্লেখযোগ্য ।এতে বলা হয়েছে, ২০২১ সালের তথ্যের ভিত্তিতে ১৫–২৯ বছর বয়সি প্রায় ৮.৭ কোটি ভারতীয় শিক্ষা, কর্মসংস্থান অথবা প্রশিক্ষণ—কোনোটির সঙ্গেই যুক্ত ছিলেন না (NEET)। তবে নীতি আয়োগ সতর্ক করেছে যে এই সংখ্যাকে ৮.৭ কোটি বেকার যুবক-যুবতী হিসেবে ব্যাখ্যা করা উচিত নয়। এর মধ্যে গৃহস্থালির কাজে যুক্ত ব্যক্তিসহ কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণের বাইরে থাকা বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন।

এতে স্পষ্ট যে ভারতের সমস্যা ক্রমশ শুধু কর্মসংস্থানের সুযোগের অভাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; বরং শিক্ষা ও দক্ষতার সঙ্গে বাস্তব কর্মসংস্থানের সুযোগের কার্যকর সংযোগ স্থাপন করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রিপোর্টে কর্মক্ষেত্রের প্রয়োজনের সঙ্গে শিক্ষার দুর্বল সামঞ্জস্য, বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতার অপর্যাপ্ততা এবং কর্মজীবনে প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির ঘাটতিকে বিদ্যমান ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

কর্মসংস্থান বাড়লে পন্য ও পরিষেবার বহর ও মান বাড়ে, চাকরিজীবিরা বাজারে বেশি অর্থ ব্যয় এবং বিনিয়োগ করেন যা ব্যাবসায়িক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে। সরকারি রাজস্ব বাড়ে, জনকল্যাণ খাতে সরকারি ব্যয় কমে এবং তা দেশজ উৎপাদনের স্থায়ী প্রবৃদ্ধি সূচিত করে। এর বিপরীতে বেকারত্ব শ্রমশক্তিকে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কম বেতনের অস্থায়ী বা চুক্তিভিত্তিক কাজে নিযুক্ত হতে বাধ্য করে, সরকারি রাজস্ব কমে, এতে জনগনের সামাজিক নিরাপত্তা এবং এই খাতে সরকারি ব্যয় দুটোই বাধাপ্রাপ্ত হয়। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক অসাম্য সামাজিক অস্থিরতা ও গনতান্ত্রিক পরিকাঠামোর প্রতি জনগণের অবিশ্বাসকে প্রলম্বিত করে।  ভারতের অর্থনৈতিক বৈষম্য অত্যন্ত তীব্র। জনসংখ্যার শীর্ষ ১ শতাংশ মানুষের হাতে মোট জাতীয় সম্পদের প্রায় ৪০ শতাংশ কেন্দ্রীভূত রয়েছে।
ভারতের সবচেয়ে ধনী ১০ শতাংশ মানুষ জাতীয় আয় ও সম্পদের প্রায় ৫৮ শতাংশ থেকে ৬৫ শতাংশ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখেন।

সরকারি চাকরি অসমের শিক্ষিত বেকারত্বের সমাধান নয়।। বরং প্রয়োজন এমন একটি অর্থনীতি গড়ে তোলা, যেখানে শিক্ষিত তরুণ-তরুণীরা তাঁদের যোগ্যতা ও দক্ষতার উপযুক্ত কর্মসংস্থান খুঁজে পাবেন এবং একই সঙ্গে নতুন কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে। অর্থাৎ, অসমকে ধীরে ধীরে চাকরি-প্রার্থী অর্থনীতি থেকে কর্মসংস্থান-সৃষ্টিকারী অর্থনীতিতে রূপান্তরিত করতে হবে।

জনসংখ্যার দরিদ্রতম ৫০ শতাংশ মানুষ জাতীয় আয়ের মাত্র প্রায় ১৫ শতাংশ পান এবং দেশের মোট সম্পদের ক্ষেত্রে তাঁদের মালিকানা অত্যন্ত সামান্য।
‘প্যারিস স্কুল অব ইকোনমিক্স-এর গবেষণায় দেখা গেছে, ভারতের শীর্ষ স্তরে সম্পদের কেন্দ্রীভবন ঐতিহাসিক উচ্চতায় পৌঁছেছে। এমনকি এই সম্পদ-বৈষম্য ঔপনিবেশিক আমলে দেখা মাত্রাকেও ছাড়িয়ে গেছে।

ভারতের যুবশক্তি বিশ্বের মধ্যে বৃহত্তম,যার সংখ্যা প্রায় ৩৬ কোটি। এই বৃহৎ জন সম্পদের যথাযথ ব্যবহার যেমন দেশকে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী অর্থনীতির দেশে বদলে দিতে পারে, তেমনি এই সম্পদের  অপর্যাপ্ত ব্যবহার এক বৃহৎ অর্থনৈতিক সম্পদকে সামাজিক বোঝায় রুপান্তরিত করতে পারে।

জেনজিদের সাম্প্রতিক বিক্ষোভ পরোক্ষে  সেই সত্যকে মনে করিয়ে দেবার প্রয়াস,কারণ তাঁরা দেশের উন্নয়নে অংশীদার হতে চায়, বোঝা হয়ে থাকতে অনিচ্ছুক।

প্রসঙ্গ: অসম
২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত অসমের কর্মসংস্থান দপ্তরে সক্রিয় চাকরিপ্রার্থী হিসেবে নিবন্ধিত মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৫,৪৩,৩৫০। শুধু ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই নতুন করে ৩,৫৫,৭৪১ জন চাকরিপ্রার্থী নিবন্ধিত হয়েছেন। এই পরিসংখ্যানের নেপথ্যে রয়েছে এক গভীর অর্থনৈতিক বৈপরীত্য। এটি নিছক অশিক্ষা বা কৃষিনির্ভর অর্থনীতির সংকট নয়; বরং এটি অনেকাংশে অতিরিক্ত ডিগ্রি-নির্ভরতার সংকট।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, নিবন্ধিত বেকারদের মধ্যে স্নাতকদের সংখ্যা সর্বাধিক—৬,৪৮,৮৯৯ জন। এর সঙ্গে ১,১৬,১৫৯ জন স্নাতকোত্তর যোগ করলে দেখা যায়, উচ্চশিক্ষিত তরুণ-তরুণীরাই সক্রিয় চাকরিপ্রার্থীদের প্রায় অর্ধেক। এছাড়াও রয়েছেন ৬২,৫৮১ জন কারিগরি ডিপ্লোমাধারী এবং ৬৫,৯৮৯ জন কারিগরি স্নাতক, প্রকৌশলী ও বিশেষজ্ঞ। অর্থাৎ আধুনিক ডিজিটাল অর্থনীতির জন্য যে দক্ষ মানবসম্পদ প্রয়োজন, তার একটি বড় অংশই আজ চাকরির সন্ধানে।

প্রায় ৩.৬ কোটি জনসংখ্যার রাজ্যে ১৫.৪৩ লক্ষ সক্রিয় চাকরিপ্রার্থীর উপস্থিতি একটি স্পষ্ট কাঠামোগত সমস্যার ইঙ্গিত দেয়—অসমের শিক্ষা ব্যবস্থা যত দ্রুত ডিগ্রি তৈরি করেছে, অর্থনীতি তত দ্রুত উচ্চমূল্যের আনুষ্ঠানিক চাকরি তৈরি করতে পারেনি।

ঔপনিবেশিক অর্থনীতি ও সরকারি চাকরির ওপর নির্ভরতা*
ব্রিটিশ আমলে অসমের অর্থনীতি মূলত চা, কাঠ ও তেল-কেন্দ্রিক একটি নিষ্কাশন ভিত্তিক অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর গড়ে উঠেছিল। এসব শিল্প বিপুল সম্পদ সৃষ্টি করলেও স্থানীয়ভাবে বহুমুখী উৎপাদন ও শিল্পভিত্তি গড়ে ওঠেনি। মূলধনের একটি বড় অংশ অঞ্চলটির বাইরে চলে যেত।

স্বাধীনতার পরও এই ঐতিহ্যের প্রভাব বজায় থাকে। বৃহত্তর ভারতের সাথে ভৌগোলিক দূরত্ব বিচ্ছিন্নতা বাণিজ্য ও শিল্পায়নের ক্ষেত্রে বড় বাধা সৃষ্টি করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় দীর্ঘদিনের কম বেসরকারি বিনিয়োগ, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ১৯৭০-এর দশকের শেষ থেকে ২০০০-এর দশকের গোড়া পর্যন্ত বিভিন্ন জাতিগত ও বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন। ফলে বড় শিল্পগোষ্ঠী গুলি অসমে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে অনাগ্রহী ছিল।

এই পরিস্থিতিতে সরকারই ধীরে ধীরে প্রধান নিয়োগকর্তা হয়ে ওঠে।
অসমের বহু পরিবারে সরকারি চাকরি সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে আর্থিক সীমাবদ্ধতা ও সরকারি ব্যয় সংকোচনের ফলে সরকারি চাকরির সম্প্রসারণের গতি কমে যায়।

অন্যদিকে, উচ্চশিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটে। রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় কলেজ ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে সাক্ষরতা ও সামাজিক গতিশীলতা বৃদ্ধি পেলেও শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে তৈরি হয় গভীর বিচ্ছিন্নতা।

একটি শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি হচ্ছিল মূলত প্রশাসনিক ও মানসিক শ্রমমূলক পেশার জন্য, যখন অর্থনীতি  প্রধানত কৃষি, অনানুষ্ঠানিক কাজ ও সীমিত পরিষেবা খাতের ওপর নির্ভরশীল ছিল। এই বৈপরীত্য পরবর্তীতে আরো প্রলম্বিত হয়েছে।

সংকটের স্বরূপ
গুয়াহাটি, ডিব্রুগড় ও শিলচরের মতো শহরে বহু প্রযুক্তিগত স্নাতক ও স্নাতকোত্তর তরুণ তাঁদের কুড়ির দশকের বড় অংশ কাটিয়ে চলেছেন বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক সরকারি চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতিতে।
রাজ্য সরকার পাঁচ বছরে ২ লক্ষ সরকারি চাকরি দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে এবং ইতিমধ্যে ১.৬৪ লক্ষ নিয়োগ হয়েছে। কিন্তু হিসাবটি অত্যন্ত কঠিন। এটা বলা বাহুল্য যে পাঁচ বছরে ২ লক্ষ চাকরি ১৫.৪৩ লক্ষ সক্রিয় চাকরিপ্রার্থীকে নিয়োজিত করতে পারে না।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও একটি নতুন বিপদ—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।
গত এক দশকে বেঙ্গালুরু, পুনে এবং অন্যান্য বড় শহরের আই টি পরিষেবা, গ্রাহক সহায়তা, ডেটা এন্ট্রি ও সফ্টওয়্যার প্রযুক্তিগত প্রারম্ভিক স্তরের চাকরিগুলি অসমের শিক্ষিত যুবকদের জন্য এক ধরনের বিকল্প পথ তৈরি করেছিল।

কিন্তু ‘এজেন্টিক এআই’ ও ‘মাল্টি এজেন্ট সিস্টেম’ এর দ্রুত অগ্রগতি এই পথটিও সংকুচিত করছে। ফলে প্রচলিত মুখস্থ ভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থায় পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীরা এমন চাকরির জন্য প্রস্তুত হচ্ছে, যেগুলির অস্তিত্ব ভবিষ্যতে নাও থাকতে পারে।

নিম্ন কর্মসংস্থান এবং মেধা পাচার
এই পরিস্থিতি দু’টি বিপদ তৈরি করছে। প্রথমত, শিক্ষিত যুবকদের একটি বড় অংশ তাঁদের যোগ্যতার তুলনায় অনেক নিচু স্তরের কাজে যেতে বাধ্য হচ্ছেন—পণ্য সরবরাহকারী কর্মী, খুচরা বিক্রেতা কর্মী, চুক্তিভিত্তিক কর্মী হিসেবে। রাজ্যে জোমেটো, আমাজন, ফ্লিপকার্টের মতো সংস্থায় কর্মরত পরিবহন কর্মী বা উবের,রেপিডো চালক কিংবা ই-রিকসা চালকের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান,যারা নামমাত্র বিনিময় মূল্যে শ্রম প্রদান করছেন।

দ্বিতীয়ত, যাঁদের উচ্চমানের প্রযুক্তিগত দক্ষতা রয়েছে, তাঁরা অসম ছেড়ে অন্য রাজ্যে চলে যাচ্ছেন। ফলে রাজ্য হারাচ্ছে সেই উদ্যোক্তা ও প্রযুক্তিগত প্রতিভা, যাদের দিয়েই স্থানীয় শিল্প ও ব্যবসা গড়ে উঠতে পারত। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পরিবেশগত চাপ।
অসম দক্ষিণ এশিয়ার জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলির অন্যতম। ব্রহ্মপুত্র, বরাকের বার্ষিক বন্যায় বিপুল কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, বহু পরিবার বাস্তুচ্যুত হয় এবং তরুণ প্রজন্মের কাছে ঐতিহ্যগত কৃষিকাজ ক্রমশ কম আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। ফলে গ্রাম থেকে শহরে অভিবাসন বাড়ে এবং শহরের চাকরির বাজারে নতুন চাকরিপ্রার্থীর সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পায়।

সমাধানের পথ: চাকরি নয়, কর্মসংস্থানের অর্থনীতি
সরকারি চাকরি অসমের শিক্ষিত বেকারত্বের সমাধান নয়।। বরং প্রয়োজন এমন একটি অর্থনীতি গড়ে তোলা, যেখানে শিক্ষিত তরুণ-তরুণীরা তাঁদের যোগ্যতা ও দক্ষতার উপযুক্ত কর্মসংস্থান খুঁজে পাবেন এবং একই সঙ্গে নতুন কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে। অর্থাৎ, অসমকে ধীরে ধীরে চাকরি-প্রার্থী অর্থনীতি থেকে কর্মসংস্থান-সৃষ্টিকারী অর্থনীতিতে রূপান্তরিত করতে হবে।

এর প্রথম শর্ত হল রাজ্যের নিজস্ব অর্থনৈতিক শক্তিকে নতুন করে ব্যবহার করা। চা, কৃষি, তেল ও গ্যাস, পেট্রোকেমিক্যাল, বাঁশ, হস্ততাঁত, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ এবং পর্যটন—এসব ক্ষেত্র অসমের দীর্ঘদিনের সম্পদ। কিন্তু বহু ক্ষেত্রেই অসম এখনও কাঁচামাল বা প্রাথমিক পণ্য সরবরাহকারী হিসেবেই রয়ে গেছে। চা থেকে ব্র্যান্ডেড ও মূল্য-সংযোজিত পণ্য, বাঁশ থেকে আধুনিক শিল্পপণ্য, কৃষিপণ্য থেকে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য এবং তেল-গ্যাস থেকে অনুবর্তী শিল্প ও পরিষেবা—এই মূল্য সংযোজন-এর শৃঙ্খলকে অসমের মধ্যেই যতটা সম্ভব গড়ে তুলতে হবে। কারণ প্রকৃত কর্মসংস্থান কেবল উৎপাদনে নয়, প্রক্রিয়াকরণ, প্যাকেজিং, বিপণন, পরিবহণ, প্রযুক্তি ও পরিষেবার প্রতিটি স্তরেই সৃষ্টি হয়।

অসমের ভৌগোলিক অবস্থানও একটি বড় সম্পদ। উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রবেশদ্বার এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্ভাব্য বাণিজ্যিক সংযোগস্থল হিসেবে অসমকে একটি লজিস্টিক এবং বিতরণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। উন্নত সড়ক, রেল, বিমান ও অভ্যন্তরীণ জলপথের সঙ্গে গুদাম, কোল্ড চেইন, প্যাকেজিং, ই-কমার্স প্লাটফর্ম এবং পরিবহণ-নির্ভর পরিষেবা যুক্ত করা গেলে সরাসরি এবং পরোক্ষ—দুই ধরনের কর্মসংস্থানই বাড়বে। এর সুফল শুধু গুয়াহাটিতে সীমাবদ্ধ না রেখে বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে দেওয়া জরুরি।

এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে বরাক উপত্যকায় একটি মাল্টি মডেল লজিস্টিক পার্ক স্থাপন আন্তর্জাতিক বানিজ্য ও পরিবহন খাতে নিশ্চিত ভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। এবং এই প্রকল্পের সাথে হাইস্পিড এক্সপ্রেস করিডোর, গ্রিনফিল্ড এয়ারপোর্ট এবং ময়নারবন্দ লঙ্কা রেললাইন প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে তাতে এই উপত্যকার অর্থনীতির উন্নয়ন ও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে।

তবে শিক্ষিত বেকারত্বের ক্ষেত্রে আরও একটি মৌলিক পরিবর্তন দরকার। ডিগ্রি এবং চাকরির মধ্যে যে ব্যবধান তৈরি হয়েছে, তা কমাতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে একজন তরুণের হাতে যদি কেবল একটি সার্টিফিকেট থাকে কিন্তু বাস্তব কর্মক্ষেত্রের কোনও অভিজ্ঞতা না থাকে, তবে তাঁর কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা সীমিত থাকাই স্বাভাবিক। তাই কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে শিল্পপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, ল্যাবরেটরি, ব্যাংক, এমএসএমই, আইটি সংস্থা, পর্যটন ও লজিস্টিকস প্রতিষ্ঠানের সরাসরি সংযোগ তৈরি করে সবেতন শিক্ষানবিশ কর্মসূচি ( paid apprenticeship )কে উচ্চশিক্ষার একটি স্বাভাবিক অংশ করা যেতে পারে।

দক্ষতা উন্নয়ন ( skill development) এর ক্ষেত্রেও একই পরিবর্তন প্রয়োজন। কতজন প্রশিক্ষণ নিলেন বা কতগুলি শংসাপত্র দেওয়া হল—তা দিয়ে সাফল্য বিচার না করে দেখতে হবে প্রশিক্ষণের পর কতজন চাকরি পেলেন, কতদিন সেই চাকরিতে টিকে থাকলেন এবং তাঁদের আয় কতটা বাড়ল। অর্থাৎ, ‘দক্ষতা সৃষ্টির’-এর পরিবর্তে ‘কর্মসংস্থান জনিত ফলাফল-কে সাফল্যের প্রধান সূচক করতে হবে।

কর্মসংস্থানের ব্যাপারে সরকারের সাম্প্রতিক একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ অবশ্যই ‘এডভান্টেজ অসম-এর অধীনে বর্তমানে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পের সঙ্গে  ২৭০০০ কোটি টাকার বিনিয়োগে প্রস্তাবিত টাটা সেমিকন্ডাকটর প্রকল্পকে মিলিয়ে মোট ১,০২,০০০-এর বেশি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান তৈরির উদ্যোগ।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল নারীর কর্মসংস্থান। অর্থনীতির অর্ধেক সম্ভাব্য মানবসম্পদকে যদি পারিবারিক দায়িত্বের কারণে শ্রমবাজারের বাইরে থাকতে হয়, তবে কোনও রাজ্যই তার পূর্ণ অর্থনৈতিক সম্ভাবনায় পৌঁছতে পারে না। নিরাপদ পরিবহণ, শিশুযত্ন, নমনীয় কর্মব্যবস্থা, দূরবর্তী কর্মসংস্থান, মহিলা-নির্ভর ক্ষুদ্র উদ্যোগের বাজার সম্প্রসারণ—এসবকে তাই সামাজিক কল্যাণের পাশাপাশি অর্থনৈতিক নীতির অংশ হিসেবেও দেখতে হবে।

তবে তার সঙ্গ অসমের ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প ( এমএস এমই)-গুলিও বিশেষ গুরুত্ব পাওয়ার যোগ্য। কয়েকটি বড় শিল্পপ্রকল্প অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু রাজ্যের বিপুল কর্মসংস্থান-চাহিদা পূরণে হাজার হাজার ছোট ও মাঝারি উদ্যোগের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তাদের প্রধান বাধা—ঋণ, প্রযুক্তি ও বাজার—এই তিনটি ক্ষেত্রে সরকারি সহায়তা প্রয়োজন। সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় সক্ষম স্থানীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ-কে বেশি সুযোগ দেওয়া, তাদের বৃহত্তর সাপ্লাই চেইন-এর সঙ্গে যুক্ত করা এবং ডিজিটাল মার্কেটিং ও গুণগত সরকারি স্বীকৃতি এর সহায়তা দেওয়া যেতে পারে।

একইভাবে, স্টার্ট আপ-এর ক্ষেত্রেও সাফল্যের মাপকাঠি হওয়া উচিত শুধু কতগুলি নতুন সংস্থা নিবন্ধিত হল তা নয়। বরং কতগুলি ব্যবসা তিন বছর পরেও টিকে রইল, কত রাজস্ব তৈরি করল এবং কতগুলি চাকরি সৃষ্টি করল—সেই প্রশ্নগুলিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অসমের নিজস্ব সমস্যা—বন্যা, কৃষি, পরিবহণ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পর্যটন ও জলবায়ুজনিত ঝুঁকি—সমাধানের জন্য প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগকে বিশেষ উৎসাহ দেওয়া যেতে পারে।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল নারীর কর্মসংস্থান। অর্থনীতির অর্ধেক সম্ভাব্য মানবসম্পদকে যদি পারিবারিক দায়িত্বের কারণে শ্রমবাজারের বাইরে থাকতে হয়, তবে কোনও রাজ্যই তার পূর্ণ অর্থনৈতিক সম্ভাবনায় পৌঁছতে পারে না। নিরাপদ পরিবহণ, শিশুযত্ন, নমনীয় কর্মব্যবস্থা, দূরবর্তী কর্মসংস্থান, মহিলা-নির্ভর ক্ষুদ্র উদ্যোগের বাজার সম্প্রসারণ—এসবকে তাই সামাজিক কল্যাণের পাশাপাশি অর্থনৈতিক নীতির অংশ হিসেবেও দেখতে হবে।

এর সঙ্গে দরকার একটি আধুনিক নিয়োগ বিনিময় কেন্দ্র ( job exchange centre)—যেখানে শুধু চাকরিপ্রার্থীর নাম নিবন্ধিত থাকবে না; থাকবে তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা, দক্ষতা, পছন্দের পেশা এবং নিয়োগকর্তাদের প্রকৃত চাহিদার তথ্য। কোন দক্ষতার চাহিদা বাড়ছে, কোন অঞ্চলে কোন ধরনের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে এবং কোন প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বাস্তবে চাকরি দিচ্ছে—এই তথ্যের ভিত্তিতে রাজ্যের কর্মসংস্থান নীতি পরিচালিত হওয়া উচিত।

সরকারি চাকরি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ থাকবে। কিন্তু এটিকে একমাত্র আকাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থানের পথ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করলে সমস্যার সমাধান হবে না। বরং সরকারি চাকরির পাশাপাশি বেসরকারি কর্মসংস্থান, শিক্ষানবিশি, উদ্যোক্তা এবং পেশাগত পরিষেবাকে- সমান মর্যাদার কর্মজীবনের পথ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।

সবশেষে, অসমকে একটি কঠিন কিন্তু জরুরি প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে—কেন এত শিক্ষিত তরুণ কর্মসংস্থানের জন্য রাজ্যের বাইরে চলে যাচ্ছেন? অভিবাসন নিজে কোনও সমস্যা নয়; ভালো সুযোগের সন্ধানে তরুণদের অন্যত্র যাওয়ার স্বাধীনতা থাকা উচিত। কিন্তু যদি তাঁরা শুধুমাত্র অসমে উপযুক্ত সুযোগের অভাবে চলে যেতে বাধ্য হন, তবে সেটি রাজ্যের অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতার লক্ষণ।

তাই অসমের কর্মসংস্থান নীতির সাফল্য বিচার করার নতুন মাপকাঠি প্রয়োজন। কতগুলি মউ স্বাক্ষরিত হল, কত টাকার বিনিয়োগ ঘোষণা হল, কিংবা কতগুলি প্রশিক্ষণ শংসাপত্র বিতরণ করা হল—এসবের পাশাপাশি অবশ্যই জানতে হবে:
কতজন তরুণ স্থায়ী ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান পেলেন? কতগুলি নতুন ব্যবসা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করল? তাঁদের আয় কতটা বাড়ল? এবং কতজন শিক্ষিত তরুণ অসমেই থেকে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার সুযোগ পেলেন?

এই প্রশ্নগুলির উত্তরই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে—অসম কেবল বেকারত্বকে মোকাবেলা করছে, নাকি সত্যিই কর্মসংস্থানের সমস্যার সমাধানের পথে এগোচ্ছে।

আমাদের সংবিধানের রাস্ট্র পরিচালনার নির্দেশাত্মক নীতিতে প্রত্যেক নাগরিকের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের সুযোগকে প্রাথমিকতা দেওয়া হয়েছে। প্রথম দুইটি ক্ষেত্রে সরকারি ভূমিকা মন্দের ভালো হলেও এটা অবশ্যই স্বীকার্য যে কর্মসংস্থানের বিষয়টি নীতিনির্ধারকদের প্রলম্বিত প্রতিশ্রুতিতে আর পরিসংখ্যানের কচকচানিতে মুখ ঢেকেছে। বাস্তবতা ভিন্ন।

ভারতের মতো দেশ যা বিশ্বের চতুর্থ অর্থনীতি হবার স্বপ্ন দেখছে, স্বাধীনতার আশি বছর অতিক্রান্ত হবার পর সেই দেশের যুবকদের শিক্ষান্তে যথাযথ কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেওয়া রাস্ট্রের প্রাথমিকতা হওয়া অবশ্যকর্তব্য।
তাই আর কথায় নয়, এবার তা কাজে প্রমানিত হোক।
(মতামত লেখকের ব্যক্তিগত)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *