।। এস এম জাহির আব্বাস ।।
(সাংবাদিক, শ্রীভূমি)
৫ সেপ্টেম্বর : একটি জাতির ভবিষ্যৎ কোথায় নির্মিত হয়? সংসদে, সচিবালয়ে, আদালতে কিংবা শিল্পপ্রতিষ্ঠানে? নিঃসন্দেহে এসব প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু ভবিষ্যৎ নির্মাণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটি হলো শ্রেণিকক্ষ। কারণ সেখানেই তৈরি হয় আগামী দিনের নাগরিক, বিজ্ঞানী, প্রশাসক, চিকিৎসক, উদ্যোক্তা, সাংবাদিক, শিল্পী এবং নেতৃত্ব।আর সেই শ্রেণিকক্ষের কেন্দ্রে যিনি দাঁড়িয়ে থাকেন, তিনি শিক্ষক। প্রতি বছর ৫ সেপ্টেম্বর ভারতে শিক্ষক দিবস পালিত হয়। বিশিষ্ট দার্শনিক, শিক্ষাবিদ ও ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণনের জন্মদিন উপলক্ষে এই দিনটি শিক্ষক দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। দিনটি নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয়; শিক্ষা ও শিক্ষকের সামাজিক মর্যাদা, দায়িত্ব এবং রাষ্ট্রের কাছে তাঁদের প্রত্যাশা নিয়ে নতুন করে ভাবারও একটি সুযোগ।কিন্তু প্রশ্ন হলো বছরে একটি দিন শিক্ষককে সম্মান জানালেই কি শিক্ষকের প্রতি আমাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়?
শিক্ষক দিবসের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য শিক্ষকতা নিছক একটি পেশা নয়। একটি শিশুর জ্ঞান, চিন্তা, নৈতিকতা, মূল্যবোধ এবং সামাজিক আচরণ গঠনে শিক্ষকের ভূমিকা অত্যন্ত গভীর। একটি ভালো শিক্ষক একটি শিক্ষার্থীর জীবনের গতিপথ বদলে দিতে পারেন। আবার একজন শিক্ষার্থীর প্রতি অবহেলা বা অযাচিত চাপ তার আত্মবিশ্বাস নষ্ট করে দিতে পারে। এই কারণেই শিক্ষককে কেবল ‘পাঠদানকারী’ হিসেবে দেখলে চলবে না। তিনি একই সঙ্গে জ্ঞানদাতা, পথপ্রদর্শক, পরামর্শদাতা এবং নাগরিকত্বের ভিত্তি নির্মাণকারী।তবে বর্তমান সময়ে শিক্ষকের এই ভূমিকা আগের তুলনায় আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
তথ্যের যুগে শিক্ষকের নতুন চ্যালেঞ্জ ডিজিটাল প্রযুক্তি শিক্ষার পরিসরকে অভূতপূর্বভাবে বিস্তৃত করেছে। একটি স্মার্টফোনের মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থী বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের জ্ঞানভাণ্ডারে প্রবেশ করতে পারছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারও শিক্ষাক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
কিন্তু এর সঙ্গে এসেছে নতুন ঝুঁকি।ভুল তথ্য বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট, নকল বা কৃত্রিমভাবে তৈরি তথ্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আসক্তি এবং মনোযোগের সংকট শিক্ষার্থীদের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এই বাস্তবতায় শিক্ষক আর কেবল তথ্যের উৎস নন। বরং তাঁর দায়িত্ব হয়ে উঠেছে শিক্ষার্থীকে শেখানো—কোন তথ্য গ্রহণযোগ্য, কীভাবে তথ্য যাচাই করতে হয় এবং জ্ঞানকে কীভাবে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে হয়। প্রযুক্তি শিক্ষকের বিকল্প নয়; বরং সঠিক শিক্ষকের হাতে প্রযুক্তি হতে পারে শিক্ষার শক্তিশালী সহায়ক মাধ্যম।
পরীক্ষার ফলাফলই কি শিক্ষার একমাত্র মানদণ্ড? আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার একটি বড় সমস্যা হলো—শিক্ষার সাফল্যকে এখনও অনেকাংশে পরীক্ষার ফলাফল দিয়ে বিচার করা হয়।একজন শিক্ষার্থী কত নম্বর পেল, কোন বিভাগে পড়ল, কোন প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হলো এসব গুরুত্বপূর্ণ হলেও শিক্ষার চূড়ান্ত সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি হতে পারে না।শিক্ষার লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন মানুষ তৈরি করা, যে যুক্তি দিয়ে চিন্তা করতে পারে, ভুল স্বীকার করতে পারে, অন্যের মতামতকে সম্মান করতে পারে, অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারে এবং সমাজের প্রতি নিজের দায়িত্ব বুঝতে পারে।উচ্চ নম্বরের শিক্ষার্থী যদি মানবিক মূল্যবোধে দরিদ্র হয়, তবে সেই শিক্ষাকে কতটা সফল বলা যায় এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।শিক্ষকই পারেন শিক্ষাকে পরীক্ষার খাতা থেকে জীবনের বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করতে।
শিক্ষকদের কর্মপরিবেশ নিয়েও ভাবতে হবেশিক্ষক দিবসে শিক্ষকদের প্রশংসা করা সহজ; কিন্তু তাঁদের কর্মপরিবেশ নিয়ে আলোচনা তুলনামূলকভাবে কম।বিশেষ করে সরকারি ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকস্বল্পতা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, পর্যাপ্ত শিক্ষাসামগ্রীর অভাব এবং অতিরিক্ত প্রশাসনিক দায়িত্বের মতো সমস্যা রয়েছে। অনেক শিক্ষককে পাঠদানের পাশাপাশি বিভিন্ন অশিক্ষামূলক দায়িত্বও পালন করতে হয়।
এর সরাসরি প্রভাব পড়ে শ্রেণিকক্ষের ওপর।একজন শিক্ষককে যদি পর্যাপ্ত সময়, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ এবং উপযুক্ত কর্মপরিবেশ দেওয়া না যায়, তাহলে শুধু তাঁর কাছ থেকে উন্নত শিক্ষাদান প্রত্যাশা করা বাস্তবসম্মত নয়।তাই শিক্ষার মান উন্নয়নের আলোচনা করতে গেলে শিক্ষকের মানোন্নয়ন ও কর্মপরিবেশের উন্নয়নকে একই গুরুত্ব দিতে হবে।
শিক্ষক প্রশিক্ষণ সময়ের দাবি শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে শিক্ষকের দক্ষতারও পরিবর্তন প্রয়োজন। আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় শুধু বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন প্রযুক্তির ব্যবহার, শিশুমনোবিজ্ঞান, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা, মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে প্রাথমিক সচেতনতা এবং নতুন শিক্ষণ-পদ্ধতির সঙ্গে পরিচিতি।নিয়মিত প্রশিক্ষণ তাই শিক্ষকদের জন্য অতিরিক্ত সুবিধা নয়; এটি একটি পেশাগত প্রয়োজন।শিক্ষককে যদি আমরা জাতি গড়ার কারিগর বলি, তাহলে সেই কারিগরের হাতে আধুনিক সরঞ্জাম তুলে দেওয়ার দায়িত্বও রাষ্ট্রের।
শিক্ষকের মর্যাদা ফিরিয়ে আনা জরুরি একটি সমাজ কোন পেশাকে কতটা মর্যাদা দেয়, তা সেই সমাজের মূল্যবোধের পরিচয় বহন করে।শিক্ষককে সম্মান করার অর্থ শুধু শিক্ষক দিবসে শুভেচ্ছা জানানো নয়। তাঁর মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া, পেশাগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ তৈরি করা এবং তাঁর কাজের সামাজিক মূল্য স্বীকার করাও সম্মানের অংশ।একই সঙ্গে শিক্ষকদের কাছ থেকেও দায়িত্বশীলতা প্রত্যাশিত। শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বিপুল সামাজিক আস্থা। সেই আস্থার মর্যাদা রাখতে হলে শিক্ষককে পেশাগত সততা, নিরপেক্ষতা ও মানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে।অধিকার যেমন আছে, তেমনি দায়িত্বও আছে।
অভিভাবক-শিক্ষক সম্পর্কেও পরিবর্তন প্রয়োজন শিক্ষার্থীর সাফল্যের দায়িত্ব শুধু শিক্ষকের নয়, পরিবারেরও। সন্তানকে ভালো ফল করানোর প্রতিযোগিতায় অনেক সময় অভিভাবকরা শিক্ষার্থীর মানসিক চাপের বিষয়টি ভুলে যান।আবার কোনো ব্যর্থতার জন্য শিক্ষককে একতরফাভাবে দায়ী করার প্রবণতাও স্বাস্থ্যকর নয়।প্রয়োজন শিক্ষক অভিভাবক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক।একটি শিশুর দুর্বলতা চিহ্নিত করে তাকে সাহায্য করা, তার প্রতিভা বিকাশের সুযোগ তৈরি করা এবং তার মানসিক অবস্থাকে গুরুত্ব দেওয়া—এই তিনটি ক্ষেত্রেই পরিবার ও বিদ্যালয়ের সমন্বয় অপরিহার্য।
শিক্ষক দিবস হোক আত্মসমালোচনার দিন ৫ সেপ্টেম্বর এলেই বিদ্যালয়-কলেজে নানা অনুষ্ঠান হয়। শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের ফুল দেন, শুভেচ্ছা জানান, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। এসব আয়োজনের নিজস্ব সৌন্দর্য রয়েছে। কিন্তু শিক্ষক দিবসের তাৎপর্য তার চেয়েও বড়। এই দিন আমাদের প্রশ্ন করতে হবে আমরা কি শিক্ষাকে শুধু চাকরি পাওয়ার মাধ্যম হিসেবে দেখছি? আমরা কি শিক্ষার্থীর সৃজনশীলতা ও প্রশ্ন করার অধিকারকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছি? আমরা কি শিক্ষককে তাঁর প্রয়োজনীয় মর্যাদা ও কর্মপরিবেশ দিতে পারছি?আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো কি সত্যিই বৈষম্যহীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক?প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করতে আমরা কতটা সফল?এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজাই হতে পারে শিক্ষক দিবসের প্রকৃত উদ্যাপন।
একটি উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে শিক্ষককে কেন্দ্র করেই নীতি নির্ধারণ করতে হবে। পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ, নিয়মিত প্রশিক্ষণ, আধুনিক শিক্ষাসামগ্রী, ডিজিটাল অবকাঠামো, প্রত্যন্ত এলাকার বিদ্যালয়গুলোর উন্নয়ন এবং শিক্ষকদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।কারণ শিক্ষায় বিনিয়োগের ফল তাৎক্ষণিকভাবে দেখা যায় না। কিন্তু এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব একটি দেশের অর্থনীতি, সমাজ ও গণতন্ত্রের ওপর পড়ে।
শিক্ষায় ব্যর্থতার মূল্য একটি প্রজন্মকে দিতে হয়।শিক্ষক দিবস তাই কেবল শিক্ষকদের ফুল দেওয়ার দিন নয়; এটি শিক্ষা নিয়ে রাষ্ট্র ও সমাজের দায় পুনর্বিবেচনার দিন।যে শিক্ষক একটি শিশুকে প্রথম অক্ষর চিনিয়েছেন, যে শিক্ষক ব্যর্থতার পরও তাকে আবার চেষ্টা করতে শিখিয়েছেন, যে শিক্ষক প্রশ্ন করতে উৎসাহ দিয়েছেন, যে শিক্ষক বইয়ের বাইরের পৃথিবীকে চিনিয়েছেন—তাঁর অবদান কোনও পরীক্ষার নম্বর কিংবা কোনো সনদ দিয়ে মাপা যায় না।আজকের শিক্ষার্থীই আগামী দিনের সমাজ নির্মাণ করবে। আর সেই সমাজের ভিত্তি নির্মাণের দায়িত্ব যাঁদের হাতে, তাঁদের যথাযথ সম্মান, প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা কোনো অনুগ্রহ নয় এটি রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব। শিক্ষককে সম্মান করা মানে শুধু একজন মানুষকে সম্মান করা নয় জ্ঞান, বিবেক, মানবিকতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সম্মান করা। ৫ সেপ্টেম্বর তাই হোক একটি দিনের আনুষ্ঠানিকতা নয় বরং একটি অঙ্গীকারের দিন।শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেব শিক্ষককে মর্যাদা দেব এবং এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলব যেখানে পরীক্ষায় সফল হওয়ার পাশাপাশি মানুষ হিসেবেও সফল হয়ে উঠবে আমাদের আগামী প্রজন্ম।শুধু পাঠদান নয় একজন শিক্ষক তৈরি করেন ভবিষ্যৎ গড়ে দেন সমাজ ও জাতির চরিত্র। তাই শিক্ষক দিবসের এই বিশেষ দিনে যাঁরা মানুষ গড়েন, তাঁদের প্রতি রইলো শ্রদ্ধা।



