আজ শিক্ষক দিবস, সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ শ্রদ্ধা নিবেদন

Spread the news

৫ সেপ্টেম্বর : ভারতের ইতিহাসে সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি ছিলেন একজন বিশিষ্ট দার্শনিক, শিক্ষক, শিক্ষাবিদ, রাষ্ট্রনায়ক এবং লেখক। জ্ঞান, শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধের প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধা তাঁকে ভারত তথা বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তাঁর জন্মদিন ৫ সেপ্টেম্বর ভারতে জাতীয় শিক্ষক দিবস হিসেবে পালিত হয়।

সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ ১৮৮৮ সালের ৫ সেপ্টেম্বর তৎকালীন মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির তিরুতানিতে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ও অধ্যবসায়ী। শিক্ষার প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল এবং পরবর্তীকালে দর্শনশাস্ত্র তাঁর প্রধান অধ্যয়নের বিষয় হয়ে ওঠে।

রাধাকৃষ্ণণ ছিলেন ভারতীয় দর্শন ও তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের একজন বিশিষ্ট পণ্ডিত। তিনি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৩৩ থেকে ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত তিনি অন্ধ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন।

১৯২১ থেকে ১৯৩২ সাল পর্যন্ত তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন ও নৈতিক বিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৩৬ সাল থেকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়েও তিনি পূর্বদেশীয় ধর্ম ও নীতিশাস্ত্রের অধ্যাপক ছিলেন। তাঁর লেখনী ও বক্তৃতার মাধ্যমে তিনি ভারতীয় দর্শন ও সংস্কৃতিকে বিশ্বের দরবারে পরিচিত করে তুলেছিলেন।

স্বাধীনতার পর রাধাকৃষ্ণণ দেশের গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত হন। তিনি ১৯৫২ থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত ভারতের প্রথম উপরাষ্ট্রপতি ছিলেন। এরপর ১৯৬২ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত ভারতের দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে ১৯৪৯ থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নে ভারতের রাষ্ট্রদূত হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন। রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর সময়ে ভারত নানা রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। চিন ও পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধসহ দেশের কঠিন সময়ে তিনি তাঁর প্রজ্ঞা, বিচক্ষণতা ও নৈতিক নেতৃত্বের পরিচয় দেন।

রাধাকৃষ্ণণ বিশ্বাস করতেন, একজন প্রকৃত শিক্ষক কেবল পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান দেন না; তিনি শিক্ষার্থীদের চিন্তা করতে শেখান, নৈতিক মূল্যবোধ গড়ে তোলেন এবং জীবনের সঠিক পথ দেখান। তাঁর জন্মদিনকে স্মরণীয় করে রাখতে ভারতে প্রতি বছর ৫ সেপ্টেম্বর শিক্ষক দিবস পালিত হয়। এই দিনে আমরা দেশের সমস্ত শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি।

দেশ ও জাতির প্রতি তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য তিনি ১৯৫৪ সালে ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ভারতরত্ন লাভ করেন। তাঁর পাণ্ডিত্য, দর্শনচিন্তা ও শিক্ষাক্ষেত্রে অবদান আজও ভারতীয় সমাজে গভীরভাবে স্মরণীয়।

সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ ছিলেন জ্ঞান, শিক্ষা ও মানবতার এক অনন্য প্রতীক। শিক্ষক, দার্শনিক ও রাষ্ট্রনায়ক—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি অসাধারণ কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। তাঁর জীবন আমাদের শেখায় যে প্রকৃত শিক্ষা মানুষের জ্ঞান বৃদ্ধির পাশাপাশি তার চরিত্র ও বিবেককেও সমৃদ্ধ করে। তাই শিক্ষক দিবসে তাঁকে স্মরণ করার অর্থ শুধু একজন মহান ব্যক্তিকে শ্রদ্ধা জানানো নয়, বরং শিক্ষার আদর্শ ও শিক্ষকদের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *