বরাক তরঙ্গ, ১১ আগস্ট : ডিমাপুর ও সুমুকেদিমায় বারবার বন্যা ও জলাবদ্ধতার ঘটনা ফের একবার সামনে এনে দিয়েছে একটি বড় বাস্তবতা—বাসিন্দাদের অভিযোগ এবং মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন সমীক্ষা অনুযায়ী, এই সংকটের বড় অংশই মানুষের তৈরি। সুমুকেদিমা ও ডিমাপুর জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত চাথে ও ধানসিড়ি নদী এই সমস্যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। প্রতি বছর নদীর পাড় ভাঙনের ফলে কৃষিজমি ও বসতিপূর্ণ এলাকা ক্রমশ নদীগর্ভে চলে যাচ্ছে।
শহরাঞ্চলে পর্যাপ্ত নিকাশি ব্যবস্থা না থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। বৃষ্টির জল নদীতে পৌঁছে দেওয়ার মতো কার্যকর ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক না থাকায় মাঝারি মাত্রার বৃষ্টির পরও বিভিন্ন পাড়া জলমগ্ন হয়ে পড়ছে।
বছরের পর বছর ধরে একাধিক ব্যবস্থাগত ত্রুটি একসঙ্গে জমা হয়ে এই বারবার বন্যার পরিস্থিতি তৈরি করেছে। চাথে ও ধানসিড়ি নদী থেকে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বালি ও পাথর উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে নদীর গতিপথে পরিবর্তন ঘটেছে, কিছু ঝুঁকিপূর্ণ অংশে জলের স্রোতের গতি বেড়েছে এবং নদীভাঙন আরও তীব্র হয়েছে বলে অভিযোগ।
নদীর মূল প্রবাহ ও শাখানদীগুলিও আবর্জনা এবং কথিত দখলের কারণে সংকুচিত হয়ে পড়েছে। এর ফলে জলের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং নিম্নাঞ্চলের বসতিগুলিতে হড়পা বানের ঝুঁকি বাড়ছে।
একইসঙ্গে ডিমাপুর ও সুমুকেদিমার প্রাকৃতিক জলনিকাশি পথ এবং নালাগুলিও বিভিন্ন ভবন ও অন্যান্য নির্মাণের কারণে দখল হয়ে গেছে। এই জলপথগুলি বন্ধ বা সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় বৃষ্টির জল বেরিয়ে যাওয়ার পর্যাপ্ত পথ পাচ্ছে না। ফলে জল জমে রাস্তাঘাট ও বাড়িঘরে ঢুকে পড়ছে।
সমন্বিত পরিকল্পনার অভাবও পরিস্থিতির অন্যতম বড় কারণ। বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নিকাশি ব্যবস্থার কাজ অনেক সময় আলাদাভাবে করা হয়। নদী, নিকাশি নালা এবং শহরাঞ্চলের বসতিগুলির পারস্পরিক সংযোগ যথাযথভাবে চিহ্নিত না করেই বিভিন্ন প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। অভিযোগ, বেশ কিছু প্রকল্প পর্যাপ্ত সমীক্ষা বা জলবিদ্যাগত মূল্যায়ন ছাড়াই বাস্তবায়িত হয়েছে। ফলে পরপর বর্ষায় একই এলাকায় বারবার ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে।
বন্যাপ্রবণ এলাকায় অপরিকল্পিত নির্মাণও পরিস্থিতিকে আরও সংকটজনক করে তুলেছে। নদী বর্ষাকালে স্বাভাবিকভাবেই যে এলাকাগুলি দখল করে নেয়, সেখানেও বাড়িঘর, সীমানা প্রাচীরসহ বিভিন্ন স্থাপনা তৈরি হয়েছে। জলস্তর বেড়ে গেলে বন্যার জল শহরের ড্রেন ও নালায় ঢুকে পড়ে। এতে স্বাভাবিক নিকাশি ব্যবস্থা অতিরিক্ত চাপের মুখে পড়ে কিংবা জলের প্রবাহ উল্টে যায়, যার ফলে আশপাশের এলাকাগুলি প্লাবিত হয়।
নিকাশি নালা থেকে পলি অপসারণ বা নালা প্রশস্ত করার উদ্যোগও প্রায়শই স্থানীয় বাধা ও বিভিন্ন দফতরের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে আটকে যায়। ফলে বর্ষা শুরুর আগে গুরুত্বপূর্ণ জলনিকাশি বাধাগুলি দূর করা সম্ভব হয় না।
জানা গেছে, ২০১৭ সালেই সুমুকেদিমার CIHSR-এ চাথে নদীর সেতুর কাছে খননকাজ নিয়ে কর্তৃপক্ষ সতর্ক করেছিল। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, এরপরও ওই এলাকায় এ ধরনের কার্যকলাপ চলতে থাকায় নদীভাঙনের সমস্যা ক্রমশ বেড়েছে।



