বন্যা-পরবর্তী পুনর্বাসনে কড়া নির্দেশ, শিবসাগর-চরাইদেও পরিদর্শনে মন্ত্রী কৃষ্ণেন্দু পাল

Spread the news

মোহাম্মদ জনি, শ্রীভূমি।
বরাক তরঙ্গ, ৮ আগস্ট :
সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্ভোগ ও বন্যা-পরবর্তী পরিস্থিতি সরেজমিনে খতিয়ে দেখতে শনিবার শিবসাগর ও চরাইদেও জেলা পরিদর্শন করেন অসম সরকারের জনস্বাস্থ্য কারিগরি (PHE), পার্বত্য ও বরাক উপত্যকা উন্নয়ন বিভাগের মন্ত্রী কৃষ্ণেন্দু পাল। ত্রাণ, পুনর্বাসন, নিরাপদ পানীয় জল, স্যানিটেশন ও জনস্বাস্থ্য পরিষেবা দ্রুত স্বাভাবিক করার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের একাধিক নির্দেশ দেন তিনি।

মুখ্যমন্ত্রী ড. হিমন্ত বিশ্ব শর্মার নির্দেশে মন্ত্রীর এই সফর বলে জানা গেছে। এদিন তিনি শিবসাগরের নেপালিখুটি এলাকার বিহুবরসহ বিভিন্ন বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ভারত সরকারের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী পবিত্র মার্গেরিটা, নজিরা বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক ময়ূর বরগোহাঁই এবং জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন আধিকারিকরা।

পরিদর্শনের সময় মন্ত্রী বন্যাদুর্গত মানুষের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন এবং তাঁদের সমস্যার কথা শোনেন। বন্যায় ঘরবাড়ি ও কৃষিজমির ক্ষয়ক্ষতি, খাদ্য ও পানীয় জলের সংকট, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং পুনর্বাসনের পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজ নেন তিনি। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে কী ধরনের সরকারি সহায়তা প্রয়োজন, তাও পর্যালোচনা করা হয়।

পরে শিবসাগর জেলা আয়ুক্তের কার্যালয়ের চুকাফা কনফারেন্স হলে উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বন্যায় ক্ষয়ক্ষতি, ত্রাণ ও পুনর্বাসন, পানীয় জল সরবরাহ, স্যানিটেশন, সড়ক যোগাযোগ এবং জনস্বাস্থ্য পরিষেবা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

মন্ত্রী স্পষ্ট নির্দেশ দেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কোনো পরিবার যেন সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত না হয়। ক্ষতিগ্রস্ত পানীয় জল প্রকল্প দ্রুত মেরামত, প্রয়োজনে বিকল্প উৎস থেকে নিরাপদ জল সরবরাহ, রাস্তা ও অন্যান্য পরিকাঠামো পুনরুদ্ধার এবং পুনর্বাসনের কাজ দ্রুত শেষ করার ওপর জোর দেন তিনি। মানুষের দুর্ভোগ কমাতে কোনও ধরনের গাফিলতি বরদাস্ত করা হবে না বলেও আধিকারিকদের সতর্ক করেন।

মন্ত্রী বলেন, বন্যা-পরবর্তী পুনর্গঠন শুধু রাস্তা ও পরিকাঠামো মেরামতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নিরাপদ পানীয় জল, স্বাস্থ্য সুরক্ষা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, সরকারি পরিষেবা পুনরায় সচল করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে দ্রুত স্বনির্ভর করে তোলাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি বিভাগকে সমন্বয়ের মাধ্যমে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পুনর্বাসন ও পুনরুদ্ধারের কাজ সম্পন্ন করার নির্দেশ দেন তিনি।

এদিকে, শনিবার সন্ধ্যায় চরাইদেও জেলা আয়ুক্তের কার্যালয়ে বন্যা-পরবর্তী জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যালোচনা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বৈঠকে অংশ নেন অসমের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী অশোক সিংহল এবং জল জীবন মিশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কৈলাশ কার্তিক, আইএএস। উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রী কৃষ্ণেন্দু পাল, সোনারি বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক ধৰ্মেশ্বৰ কোঁওর, চরাইদেওর জেলা আয়ুক্ত নেহা যাদব এবং বিভিন্ন দপ্তরের ঊর্ধ্বতন আধিকারিকরা।

বৈঠকে বন্যার পর নিরাপদ পানীয় জল সরবরাহ ও জলবাহিত রোগ প্রতিরোধকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। পানীয় জলের উৎস পরীক্ষা, ক্লোরিনেশন, পাইপলাইন ও জল সরবরাহ ব্যবস্থার কার্যকারিতা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে বিকল্প পানীয় জলের ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হয়। ডায়রিয়া, কলেরা, টাইফয়েড, হেপাটাইটিস ও জন্ডিসের মতো জলবাহিত রোগের সংক্রমণ রুখতে প্রত্যন্ত এলাকায় মেডিক্যাল টিম মোতায়েন, পর্যাপ্ত ওষুধ ও ORS মজুত এবং স্বাস্থ্য শিবির পরিচালনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাশাপাশি আশ্রয়কেন্দ্রগুলিতে স্বাস্থ্যবিধি বজায় রাখা এবং সাধারণ মানুষকে পানি ফুটিয়ে বা বিশুদ্ধ করে পান করার পরামর্শ দেওয়া হয়।

স্বাস্থ্য মন্ত্রী অশোক সিংহল বলেন, বন্যার পর জলবাহিত রোগের আশঙ্কা বেড়ে যায়। তাই প্রতিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে প্রস্তুত রাখার পাশাপাশি সম্ভাব্য সংক্রমণের ক্ষেত্রে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ ও জনস্বাস্থ্য কারিগরি বিভাগের মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদার করার ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।

শিবসাগরের বৈঠকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বন্যাকবলিত এলাকাগুলিতে নিয়মিত নজরদারি চলছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা তৈরি, ত্রাণ বিতরণ, নিরাপদ পানীয় জল সরবরাহ, স্যানিটেশন এবং পুনর্বাসনের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন ব্লকের আধিকারিক, জেলা পরিষদের প্রতিনিধি এবং PHE বিভাগের প্রকৌশলীরা নিজ নিজ এলাকার পরিস্থিতি ও ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন।

বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন শিবসাগরের জেলা আয়ুক্ত মৃদুল যাদব, অতিরিক্ত জেলা আয়ুক্ত প্রদীপ কুমার দাস, প্রধান প্রকৌশলী (জল) পল্লব কুমার দাস, প্রধান প্রকৌশলী (স্যানিটেশন) ভাস্কর জ্যোতি শর্মা, বিজেপির শিবসাগর জেলা সভাপতি বিতুপন রাইডংগিয়া, জেলা পরিষদের প্রতিনিধি, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের আধিকারিক, BDO এবং মাঠপর্যায়ের কর্মীরা।

মন্ত্রী কৃষ্ণেন্দু পাল জানান, মুখ্যমন্ত্রী ড. হিমন্ত বিশ্ব শর্মার নেতৃত্বে রাজ্য সরকার বন্যাকবলিত প্রতিটি মানুষের পাশে রয়েছে। সরকারের লক্ষ্য শুধু ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া নয়, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা। সেই লক্ষ্যে ত্রাণ, পুনর্বাসন, নিরাপদ পানীয় জল, স্যানিটেশন ও জনস্বাস্থ্য পরিষেবায় সংশ্লিষ্ট সব বিভাগকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

শিবসাগর ও চরাইদেওতে ধারাবাহিক পর্যালোচনা বৈঠকের মাধ্যমে প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে—বন্যা-পরবর্তী পুনর্গঠন ও পুনর্বাসনে কোনো ধরনের গাফিলতি বরদাস্ত করা হবে না। দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, মাঠপর্যায়ে কার্যকর বাস্তবায়ন এবং আন্তঃবিভাগীয় সমন্বয়ের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবনযাত্রা যত দ্রুত সম্ভব স্বাভাবিক করাই এখন প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *