শমীন্দ্র পাল, কাটিগড়া।
বরাক তরঙ্গ, ৩১ জুলাই : আধুনিক পরিকাঠামো থাকলেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর অভাবে কার্যত ধুঁকছে কাছাড়ের কাটিগড়া এমজি মডেল হাসপাতাল। লক্ষাধিক মানুষের একমাত্র সরকারি চিকিৎসা ভরসাস্থল হিসেবে পরিচিত এই হাসপাতালের প্রায় ২৫টি গুরুত্বপূর্ণ পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকায় প্রতিদিন চিকিৎসা নিতে আসা শতাধিক রোগী নানা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। ফলে সরকারি স্বাস্থ্যসেবার মান নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে স্থানীয় মহলে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, সিনিয়র মেডিক্যাল অফিসার, জেনারেল মেডিক্যাল অফিসার, রেডিওলজিস্ট, সোনোলজিস্টসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদ দীর্ঘদিন ধরে খালি রয়েছে। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর এই ঘাটতির কারণে হাসপাতালের বিভিন্ন পরিষেবা ব্যাহত হচ্ছে। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো থাকলেও জনবল সংকটের কারণে তার পূর্ণ সদ্ব্যবহার সম্ভব হচ্ছে না বলে অভিযোগ।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, প্রায় এক বছর ধরে হাসপাতালটিতে রেডিওলজিস্ট ও সোনোলজিস্ট না থাকায় আল্ট্রাসনোগ্রাফি পরিষেবা কার্যত বন্ধ। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে গর্ভবতী নারী সহ অসংখ্য রোগীর ওপর। প্রতি মাসে শতাধিক অন্তঃসত্ত্বা মহিলাকে সনোগ্রাফির জন্য শিলচর কিংবা বেসরকারি ডায়াগনোস্টিক সেন্টারের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে। এতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি চিকিৎসা বিলম্বিত হওয়ায় মা ও গর্ভস্থ শিশুর স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।
শুধু গর্ভবতী নারীরাই নন, প্রতিদিন বহু রোগীকে আল্ট্রাসনোগ্রাফিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা করানোর জন্য হাসপাতালের বাইরে যেতে হচ্ছে। এতে চিকিৎসার ব্যয় বৃদ্ধি, সময় নষ্ট এবং দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগীদের দুর্ভোগ কয়েকগুণ বেড়ে যাচ্ছে। অনেক দরিদ্র রোগী অর্থাভাবে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করাতে না পেরে মাঝপথেই চিকিৎসা বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।

এরই মধ্যে বৃহস্পতিবার কাটিগড়া এমজি মডেল হাসপাতাল পরিদর্শন করেন কাছাড়ের জেলা আয়ুক্ত রাহুল কুমার গুপ্তা। পরিদর্শনকালে তিনি হাসপাতালের বহির্বিভাগ, বিভিন্ন ওয়ার্ড, ডায়ালিসিস ইউনিট, প্রসূতি বিভাগ, জরুরি পরিষেবা সহ একাধিক বিভাগ ঘুরে দেখেন এবং চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে পরিষেবার মান নিয়ে আলোচনা করেন।
তবে স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, হাসপাতালের দীর্ঘদিনের জনবল সংকট এবং শূন্য পদ পূরণের মতো মৌলিক সমস্যাগুলো পরিদর্শনের সময় প্রয়োজনীয় গুরুত্ব পায়নি। তাঁদের মতে, শুধু পরিদর্শনে সমস্যার সমাধান হবে না, শূন্য পদগুলোতে দ্রুত নিয়োগ না হলে আধুনিক এই হাসপাতালের প্রকৃত সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে না।
পরিদর্শন শেষে জেলা আয়ুক্ত কাটিগড়ার পিএম শ্রী সিদ্ধেশ্বর উচ্চতর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে চলমান জনগণনা (সেন্সাস) প্রশিক্ষণ শিবিরও পরিদর্শন করেন। সেখানে প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের অগ্রগতি সম্পর্কে খোঁজখবর নেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেন।
এদিন জেলা আয়ুক্তের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন কাটিগড়ার সার্কল অফিসার যাত্রা কান্ত কর্মকার, স্বাস্থ্য বিভাগের ভারপ্রাপ্ত যুগ্ম সঞ্চালক শিবানন্দ রায়, কাটিগড়া এমজি মডেল হাসপাতালের সুপারিন্টেনডেন্ট ডাঃ মনজুরুল হক, পূর্ত বিভাগের এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার কল্লোল বরণ নাথ সহ স্বাস্থ্য ও প্রশাসনের অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
এদিকে হাসপাতাল ঘিরে স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা এখন একটাই – এই পরিদর্শন কি দীর্ঘদিনের জনবল সংকট নিরসনের পথে বাস্তব পদক্ষেপের সূচনা করবে, নাকি আগের মতোই সমস্যাগুলো কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে? সেই উত্তরই এখন অপেক্ষা করছে কাটিগড়ার লক্ষাধিক মানুষ।



