বরাক তরঙ্গ, ৭ জুলাই : অসম বিধানসভায় সরকারি সহযোগী ভাষার তালিকায় পূর্ববর্তী অসমিয়া, ইংরেজি ও বোরো ভাষার সাথে নতুন করে স্বীকৃতি দেওয়া হল হিন্দিভাষাকে। বিধানসভার অধ্যক্ষ এই ব্যাপারে সম্প্রতি বিবৃতি দিয়েছেন। কিন্তু রাজ্যের এক তৃতীয়াংশ ভাষিক জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা বাংলাকে সরকারি ভাষার স্বীকৃতি দেবার ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ বা কোন বিবৃতির খবর নেই। এতে সংখ্যার দিক দিয়ে রাজ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই জনগোষ্ঠীকে কি অপমান করা হচ্ছে না – এই প্রশ্ন তুলল বরাক ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট।
এক প্রেস বার্তায় বিডিএফ মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক জয়দীপ ভট্টাচার্য বলেন, রাজ্যে বোরোভাষীর সংখ্যা চার শতাংশ,হিন্দিভাষীর সংখ্যা সাত শতাংশ। কিন্তু তা কোন বড় বিষয় নয়, উভয় ভাষাকে সরকারি ভাষার স্বীকৃতি দেবার উদ্যোগ প্রশংসনীয়, যদিও বিধানসভার অধ্যক্ষ হিন্দিকে যে রাষ্ট্রভাষা বলে উল্লেখ করেছেন তা ভিত্তিহীন। ভারতে রাষ্ট্রভাষা বলে কিছু নেই, সংবিধানে ভারতীয় ভাষা হিসেবে ২২টি ভাষা স্বীকৃত ও সমঅধিকার ভুক্ত। কিন্তু যা বোধগম্য নয়, তা হল রাজ্যের প্রায় এক কোটি জনসংখ্যার মানুষ যে ভাষায় কথা বলেন তাঁদের মাতৃভাষাকে সরকারি স্বীকৃতি দিতে সরকার আগ্রহী বা উদ্যোগী নয় কেন ? সরকার রাজ্যের বাঙালিদের কি চোখে দেখে তা বিধানসভা অধ্যক্ষের সাম্প্রতিক বক্তব্যের মাধ্যমে স্পষ্টতই প্রমানিত। রাজ্যিক ভাষার স্বীকৃতি চাইলে দিশপুরের অনেকেই বলেন যে বরাক উপত্যকায় তো অনেক আগে থেকেই বাংলা সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃত,তাই নতুন স্বীকৃতির কি দরকার! তিনি বলেন, এই প্রসঙ্গে দুটো বিষয় মনে রাখা দরকার। প্রথমতঃ বোরো ভাষাও স্থানীয় সরকারি ভাষা হিসেবে বোরোল্যান্ডে স্বীকৃত এবং তা রাজ্যিক স্বীকৃতির ব্যাপারে প্রতিবন্ধক হয়নি। দ্বিতীয়ত বরাকে যে বাঙলা ভাষা সরকারি স্বীকৃতি পেয়েছে তা কোন সরকার স্বপ্রনোদিত হয়ে মোটেই দেয়নি। দীর্ঘ আন্দোলন ও একাদশ শহিদের প্রানের বিনিময়ে এই অধিকার অর্জিত হয়েছে।
জয়দীপ বলেন, বাংলা ভাষা সরকারি স্বীকৃতি পেলেই যে রাজ্যের বাঙালিদের বিশাল কিছু প্রাপ্তি হবে তেমন নয়। কিন্তু বিধানসভা বিভিন্ন সরকারি নামফলকে বাকি ভাষার সঙ্গে বাংলা সংযোজিত হলে, কাজকর্মে এই ভাষার স্বীকৃতি মিললে তাকে বাঙালিরা স্বাগত জানাতেন।কারণ এই ধরনের পদক্ষেপ একটি জাতি গোষ্ঠীর প্রতি সরকারি মনোভাব এবং আস্থাকে প্রতিফলিত করে। জয়দীপ বলেন, এটা মনে রাখতে হবে যে এবারের নির্বাচনে শাসক দলের জয়লাভের পেছনে বাঙালিদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। উভয় উপত্যকার বৃহৎ সংখ্যক বাঙালিদের ভোট না পেলে এই সাফল্য আসত না। তাই অবশ্যই এই জনগোষ্ঠীর প্রতি সরকারের দায়িত্ব রয়েছে।
জয়দীপ আরও বলেন যে অসমের বাঙালিরা উত্তরোত্তর আর্থ- সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকার হারাচ্ছেন। বিগত নির্বাচনে বাঙালি প্রার্থী দেবার ব্যাপারে কোন রাজনৈতিক দলই তেমন আগ্রহ দেখায়নি। রাজ্যের এক তৃতীয়াংশ হওয়া সত্ত্বেও আসাম মন্ত্রীসভায় একমাত্র একজন বাঙালি ঠাঁই পেয়েছেন। সরকারি চাকরিতে বাঙালিদের বঞ্চনা সুবিদিত। ডিলিমিটেশন করে বাঙালিদের বিধানসভায় আসন সংখ্যা কমানো হয়েছে। সব মিলিয়ে সবদিক দিয়েই বাঙালিদের কোনঠাসা করে রাখা হয়েছে।
তিনি বলেন যে অধিকার পেতে গেলে আওয়াজ তুলতে হবে, রাস্তায় নেমে আন্দোলন করতে হবে। তিনি বলেন বাঙালা ভাষার রাজ্যিক সহযোগী ভাষার স্বীকৃতি পেতে হলে বরাক উপত্যকার বাঙালি বিধায়ক ও সাংসদদের জাতির স্বার্থে সরব হতে হবে। সাধারণ নাগরিকদের সোচ্চার হতে হবে। তিনি বলেন যেখানে আসাম তথা উত্তর পূর্বাঞ্চলের প্রতিটি জনগোষ্ঠী নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি ও উন্নয়নের ব্যাপারে ভীষণভাবে সচেতন, জাতির প্রশ্নে দলমত নির্বিশেষে জনপ্রতিনিধি সহ নাগরিকরা একজোট হবার অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে, সেখানে নিজেদের স্বার্থের প্রশ্নে বাঙালির উদাসীনতা লক্ষনীয়। তিনি বলেন এই ব্যাপারে সবাইকে সচেতন হতে হবে। অন্যথা রাজ্যের বাঙালিরা সব রাজনৈতিক দলের কাছে শুধুমাত্র ভোটব্যাঙ্ক হিসেবেই বিবেচিত হবেন, প্রাপ্য অধিকার ও মর্যাদা কখনই জুটবে না।



