মানুষের ধর্ম, বাংলার পথ

Spread the news

।। বিধায়ক দাশ পুরকায়স্থ ।।
৬ জুলাই :
ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে বাঙালির আত্মপরিচয় কেবল একটি ভাষাগত পরিচয় নয়; এটি একই সঙ্গে একটি বৌদ্ধিক, সাংস্কৃতিক এবং নৈতিক ঐতিহ্যের নাম। এই ঐতিহ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে প্রশ্ন করার সাহস, প্রতিষ্ঠিত সত্যকে যাচাই করার প্রবণতা এবং মানুষের মর্যাদাকে ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা। তাই বাংলার ইতিহাসে যে ধারাটি সবচেয়ে লক্ষণীয়, তা অন্ধ আনুগত্যের নয়; বরং যুক্তি, মানবতা ও আত্মসমালোচনার।

এই ঐতিহ্যের শিকড় খুঁজতে গেলে আমাদের বহু শতাব্দী পেছনে ফিরে যেতে হয়। মধ্যযুগীয় বাংলার সহজিয়া সাধক সরহপাদ (সররুহপাদ) সেই সময়ে এমন কথা বলেছিলেন, যখন ব্রাহ্মণ্যবাদের সামাজিক কর্তৃত্ব প্রায় প্রশ্নাতীত। অথচ তিনিই অকপটে লিখেছিলেন— “ব্রাহ্মণ ব্রহ্মার মুখ থেকে হয়েছিল। তা না হয় হয়েছিল। এখন তো অন্যরা যেরকম, ব্রাহ্মণও সেরকমই হয়। যদি বল, সংস্কারে ব্রাহ্মণ হয়, তাহলে চণ্ডালকে সংস্কার দাও, সেও ব্রাহ্মণ হোক; যদি বল, বেদ পড়লে ব্রাহ্মণ হয়, তাহলে সকলে বেদ পড়ুক, সকলে ব্রাহ্মণ হোক।”_

চর্যাপদ থেকে সমকাল : বাঙালির ধর্মবোধ, যুক্তির ঐতিহ্য ও রাজনীতির পাঠ

এই কয়েকটি পংক্তি কেবল একটি ধর্মীয় মতবাদের সমালোচনা নয়; এটি জন্মগত শ্রেষ্ঠত্বের ধারণার বিরুদ্ধে এক মৌলিক মানবতাবাদী ঘোষণা। সমাজে মানুষের মর্যাদা জন্মে নয়, কর্মে—এই ধারণা বাংলার মাটিতে বহু আগেই উচ্চারিত হয়েছিল।

সরহপাদ এখানেই থেমে থাকেননি। বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠানের প্রতিও তিনি তীব্র সংশয় প্রকাশ করেছিলেন— “ঈশ্বরপরায়ণরা গায়ে ছাই মাখে, মাথায় জটা ধরে, প্রদীপ জ্বালিয়ে ঘরে বসে থাকে, ঈশান কোণে বসে ঘণ্টা চালে, আসন করে বসে, চোখ মিটমিট করে, কানে খুসখুস করে ও লোককে ধাঁধা দেয়।”

এমনকি তিনি জৈন ক্ষপণক ও বৌদ্ধ শ্রমণদের প্রতিও সমান সমালোচনামুখর ছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল স্পষ্ট—কোনও সম্প্রদায়, কোনও পোশাক, কোনও আচার মানুষকে মুক্তি দিতে পারে না, যদি মানুষের অন্তর মুক্ত না হয়। শেষ পর্যন্ত মানুষকে “সহজ”-এর পথেই ফিরতে হবে—মানবিকতার, সরলতার ও আত্মসন্ধানের পথে।

এই দৃষ্টিভঙ্গিই বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক গভীর ভিত্তি নির্মাণ করে। পরবর্তীকালে চর্যাপদ, বৈষ্ণব সহজিয়া, বাউল, লালন, চণ্ডীদাস, এমনকি উনিশ শতকের নবজাগরণ—সব কিছুর মধ্যেই নানা রূপে ফিরে এসেছে একই প্রশ্ন: ধর্ম কি মানুষের জন্য, না মানুষ ধর্মের জন্য?

বাংলার ইতিহাস তাই কেবল ধর্মচর্চার ইতিহাস নয়; এটি ধর্মকে প্রশ্ন করারও ইতিহাস। এখানেই বাংলার স্বাতন্ত্র্য।

বাংলার এই বৌদ্ধিক ঐতিহ্য কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি হাজার বছরের সাংস্কৃতিক বিবর্তনের ফল। পাল যুগে বৌদ্ধ দর্শনের বিকাশ, চর্যাপদের সহজিয়া ভাবধারা, পরে বৈষ্ণব আন্দোলনের মানবপ্রেম, সুফি সাধকদের উদার জীবনদর্শন এবং বাউল-ফকিরদের অসাম্প্রদায়িক চেতনা—সব মিলিয়ে বাংলার সমাজে এমন এক মানসিকতার জন্ম দিয়েছিল, যেখানে মানুষের পরিচয় ধর্মের চেয়ে বড়, আর বিবেকের স্থান ছিল শাস্ত্রের অন্ধ আনুগত্যের ঊর্ধ্বে।

এই কারণেই বাংলায় ধর্মীয় জীবন কখনও সম্পূর্ণভাবে পুরোহিততন্ত্র বা মৌলবিতন্ত্রের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে চলে যায়নি। শ্রীচৈতন্যের প্রেমধর্ম জাতপাতের কঠোরতা ভাঙার কথা বলেছে; চণ্ডীদাস ঘোষণা করেছেন, “সবার উপরে মানুষ সত্য।” লালন প্রশ্ন করেছেন, “সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে?” ঊনবিংশ শতকে রাজা রামমোহন রায় সতীদাহের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বিধবা বিবাহের দাবিতে সমাজের রোষের মুখোমুখি হয়েছেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ ও ধর্মীয় বিভাজনের বিরুদ্ধে মানবতার দর্শন প্রতিষ্ঠা করেছেন। কাজী নজরুল ইসলাম ধর্মকে ভালোবাসার ভাষায় ব্যাখ্যা করেছেন, বিদ্বেষের ভাষায় নয়।

অবশ্য এই ইতিহাসের অর্থ এই নয় যে বাংলা কখনও সাম্প্রদায়িকতার স্পর্শ পায়নি। দেশভাগ, দাঙ্গা, উদ্বাস্তু সংকট, রাজনৈতিক সহিংসতা—এসব বাংলার ইতিহাসেও রয়েছে। মানুষের দুর্বলতা থেকে বাংলা কখনও সম্পূর্ণ মুক্ত ছিল না। কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হলো, প্রতিটি সংকটের পরই বাংলার সাহিত্য, সংস্কৃতি ও নাগরিক সমাজের ভেতর থেকে আবারও সম্প্রীতি, সহাবস্থান ও মানবিকতার পক্ষে শক্তিশালী কণ্ঠস্বর উঠে এসেছে। এই আত্মসমালোচনার ক্ষমতাই বাংলার বিশেষ শক্তি।

সমসাময়িক রাজনীতির প্রেক্ষাপটেও এই ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারকে মনে রাখা জরুরি। গত এক দশকে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি নাটকীয়ভাবে বদলেছে। দীর্ঘকাল ধরে ক্ষমতায় থাকা সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, স্বজনপোষণ, প্রশাসনিক পক্ষপাত, কর্মসংস্থানের সংকট এবং নানা বিতর্ক সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে। সেই অসন্তোষের বড় একটি অংশ বিরোধী শক্তির দিকে প্রবাহিত হয়েছে। গণতন্ত্রে এটিই স্বাভাবিক—যখন শাসকের প্রতি আস্থা ক্ষয় হয়, তখন ভোটার বিকল্পের সন্ধান করেন।

কিন্তু এই পরিবর্তনের অর্থ এই নয় যে বাঙালি সমাজ তার ঐতিহাসিক মানসিকতাও বদলে ফেলেছে। সরকার পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা এবং একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক মতাদর্শকে নিঃশর্ত সমর্থন—এই দুটি বিষয় এক নয়। অনেক ক্ষেত্রেই মানুষ একটি সরকারের বিরুদ্ধে ভোট দেন, কিন্তু সেই সঙ্গে অন্য কোনও রাজনৈতিক শক্তির প্রতিটি আদর্শ বা বক্তব্যকেও সমর্থন করেন না। গণতান্ত্রিক সমাজে এই সূক্ষ্ম পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলার রাজনৈতিক বাস্তবতাকে বুঝতে হলে তাই শুধু নির্বাচনের ফল নয়, বাংলার দীর্ঘ সাংস্কৃতিক স্মৃতিকেও বুঝতে হবে। যে সমাজ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে প্রশ্ন করতে শিখেছে, সে সমাজ কোনও মতাদর্শকেই চিরস্থায়ী বা প্রশ্নাতীত বলে মেনে নেয় না। বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতির এই বৈশিষ্ট্যই তাকে ভারতের অন্য অনেক অঞ্চলের তুলনায় আলাদা পরিচয় দিয়েছে।

বাংলার এই মননশীল ধর্মচেতনা উনিশ শতকেও এক নতুন রূপে আত্মপ্রকাশ করে। শ্রীরামকৃষ্ণ, মা সারদা এবং স্বামী বিবেকানন্দ—এই ত্রয়ী কোনও রাজনৈতিক মতাদর্শ নির্মাণ করেননি; তাঁরা নির্মাণ করেছিলেন এক মানবমুখী ধর্মবোধ, যার ভিত্তি ছিল প্রেম, সহিষ্ণুতা, সেবা এবং আত্মোন্নয়ন।

শ্রীরামকৃষ্ণের বিখ্যাত উক্তি—”যত মত, তত পথ”—কেবল ধর্মীয় সহনশীলতার একটি স্লোগান নয়; এটি ভারতীয় ধর্মদর্শনের এক গভীর মানবিক ব্যাখ্যা। তিনি কোনও একটি পথকে একমাত্র সত্য বলে প্রতিষ্ঠা করতে চাননি। বরং নিজেই বিভিন্ন ধর্মপথে সাধনা করে দেখাতে চেয়েছিলেন যে সত্যের অনুসন্ধান নানা পথেই সম্ভব। তাঁর কাছে ধর্ম ছিল মানুষের অন্তরের পরিবর্তনের বিষয়; অন্যকে পরাজিত করার অস্ত্র নয়।

মা সারদার জীবন ছিল সেই দর্শনের সবচেয়ে নিঃশব্দ অথচ সবচেয়ে শক্তিশালী প্রকাশ। তিনি কখনও বিদ্বেষের ভাষায় কথা বলেননি। তাঁর অমর বাণী—”যদি শান্তি চাও, কারও দোষ দেখো না”—আজও সামাজিক সহাবস্থানের এক অনন্য শিক্ষা। তিনি মানুষকে ধর্ম, জাত বা সম্প্রদায়ের পরিচয়ে বিচার করেননি; প্রত্যেক মানুষের মধ্যে নিজের সন্তানকেই দেখেছেন। বাংলার সামাজিক সংস্কৃতিতে এই মাতৃভাব গভীর ছাপ রেখে গেছে।

বাংলার শক্তি অন্যত্র। এই ভূখণ্ডের প্রকৃত উত্তরাধিকার চর্যাপদের সহজিয়া, চৈতন্যের প্রেম, লালনের মানবধর্ম, রামমোহনের যুক্তিবাদ, বিদ্যাসাগরের সামাজিক ন্যায়, রবীন্দ্রনাথের বিশ্বমানবতা, নজরুলের সাম্যের গান, শ্রীরামকৃষ্ণের “যত মত, তত পথ”, মা সারদার সর্বজনীন মাতৃত্ব এবং স্বামী বিবেকানন্দের “শিবজ্ঞানে জীবসেবা”—এই দীর্ঘ ধারাবাহিকতায়। এই উত্তরাধিকার কোনও রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়; এটি সমগ্র বাঙালি সমাজের অর্জন।

স্বামী বিবেকানন্দ এই আধ্যাত্মিক মানবতাবাদকে জাতীয় জীবনের কর্মসূচিতে রূপান্তরিত করেছিলেন। তাঁর কাছে ধর্ম মানে কেবল মন্দির, পূজা বা আচার ছিল না; ধর্ম ছিল মানুষের সেবা। “জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর”—এই ভাবনাকে তিনি সামাজিক দায়িত্বের ভিত্তিতে পরিণত করেন। তিনি দুর্বলতা, কুসংস্কার এবং সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে আজীবন সংগ্রাম করেছেন। তাঁর আহ্বান ছিল আত্মবিশ্বাসী, শিক্ষিত, কর্মঠ এবং মানবিক সমাজ গড়ে তোলার।

এই তিনজনের জীবনদর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মিল রয়েছে। তাঁরা কেউই মানুষের মনে অন্য ধর্মের প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি করে সমাজ পরিবর্তনের কথা বলেননি। তাঁরা ধর্মকে ব্যবহার করেননি রাজনৈতিক শত্রু তৈরির জন্য। তাঁদের কাছে ধর্ম ছিল আত্মশুদ্ধির পথ, আর সমাজসেবা ছিল সেই ধর্মের স্বাভাবিক প্রকাশ।

এই কারণেই বাংলার ধর্মীয় সংস্কৃতি ঐতিহাসিকভাবে মন্দির-মসজিদ নিয়ে প্রতিযোগিতার চেয়ে বিদ্যালয়, আশ্রম, পাঠাগার, সেবাকেন্দ্র, সাংস্কৃতিক মঞ্চ এবং বৌদ্ধিক বিতর্কের মধ্যেই বেশি বিকশিত হয়েছে। মতের অমিল ছিল, তর্ক ছিল, আদর্শগত সংঘর্ষও ছিল; কিন্তু সেই সংঘর্ষের আদর্শ রূপ ছিল যুক্তির, বিদ্বেষের নয়।

আজকের রাজনৈতিক পরিবেশে এই ঐতিহ্যের মূল্য আরও বেড়ে যায়। যে কোনও রাজনৈতিক দল—সে ক্ষমতাসীন হোক বা বিরোধী—যদি মনে করে যে ধর্মীয় মেরুকরণই বাংলার স্থায়ী রাজনৈতিক ভিত্তি হয়ে উঠবে, তবে তারা বাংলার সমাজমনকে সম্পূর্ণভাবে বুঝতে পারছে না। একইভাবে সংখ্যালঘু সমাজের মধ্যেও যদি ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা হয়, সেটিও বাংলার দীর্ঘ মানবতাবাদী ঐতিহ্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

বাংলার ইতিহাস বারবার একটি কথাই শিখিয়েছে—এই ভূখণ্ডে ধর্ম টিকে থাকে, কিন্তু ধর্মান্ধতা দীর্ঘস্থায়ী হয় না; বিশ্বাস টিকে থাকে, কিন্তু বিদ্বেষ শেষ পর্যন্ত মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন গড়তে পারে না। কারণ বাংলার আত্মপরিচয়ের কেন্দ্রে রয়েছে মানুষ, আর মানুষের ঊর্ধ্বে কোনও রাজনৈতিক পরিচয় কখনও দীর্ঘকাল প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি।

বাংলার রাজনীতির ইতিহাস আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—এখানে জনগণ কোনও রাজনৈতিক দলকে চিরস্থায়ী অধিকারপত্র দেয় না। এই মাটিতে কংগ্রেস দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থেকেছে, তারপর বামফ্রন্টের উত্থান হয়েছে; আবার তিন দশকেরও বেশি সময় পরে বামফ্রন্টকে সরিয়ে ক্ষমতায় এসেছে তৃণমূল কংগ্রেস। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতীয় জনতা পার্টিও বাংলার রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এই পরিবর্তনগুলির মধ্যে একটি অভিন্ন সত্য রয়েছে—বাংলার ভোটার শেষ পর্যন্ত নিজের বিচারবুদ্ধিকেই প্রাধান্য দেন। তিনি শাসককে ক্ষমতায় আনেন, আবার প্রয়োজন মনে করলে তাকেই কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেন।

এই বাস্তবতা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়। কোনও রাজনৈতিক দলের পক্ষে এটা ধরে নেওয়া ঠিক হবে না যে, নির্বাচনী সাফল্য মানেই তার সমগ্র আদর্শকে বাঙালি সমাজ নিঃশর্তভাবে গ্রহণ করেছে। অনেক সময় মানুষ একটি সরকারকে অপসারণ করতে ভোট দেয়; কিন্তু সেই ভোটকে কোনও নির্দিষ্ট মতাদর্শের প্রতি স্থায়ী আনুগত্য হিসেবে ব্যাখ্যা করা রাজনৈতিক ভুল হতে পারে।

পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পেছনে দুর্নীতি, প্রশাসনিক অস্বচ্ছতা, কর্মসংস্থানের সংকট, আইনশৃঙ্খলা নিয়ে উদ্বেগ এবং শাসনের প্রতি মানুষের অসন্তোষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। সেই অসন্তোষকে বোঝা যেমন জরুরি, তেমনি এটাও বোঝা জরুরি যে বাংলার মানুষ একই সঙ্গে স্বাধীনচেতা। তারা ক্ষমতার অপব্যবহার যেমন প্রত্যাখ্যান করে, তেমনি ধর্মের নামে ঘৃণা, বিভাজন কিংবা প্রতিশোধের রাজনীতিকেও সহজে আত্মস্থ করে না।

এই কথাটি সব রাজনৈতিক শক্তির জন্যই সমানভাবে প্রযোজ্য। সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের নামে যদি বিদ্বেষের রাজনীতি হয়, তা বাংলার ঐতিহ্যের পরিপন্থী। আবার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নামে যদি বিচ্ছিন্নতাবাদ, মৌলবাদ বা অন্য সম্প্রদায়ের প্রতি ঘৃণাকে উৎসাহ দেওয়া হয়, তাও সমানভাবে এই মাটির সংস্কৃতির বিরুদ্ধে। ঘৃণার কোনও ধর্ম নেই; সাম্প্রদায়িকতারও কোনও একক মুখ নেই। তার রূপ ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু তার পরিণতি সর্বদাই একই—সমাজকে বিভক্ত করা।

বাংলার শক্তি অন্যত্র। এই ভূখণ্ডের প্রকৃত উত্তরাধিকার চর্যাপদের সহজিয়া, চৈতন্যের প্রেম, লালনের মানবধর্ম, রামমোহনের যুক্তিবাদ, বিদ্যাসাগরের সামাজিক ন্যায়, রবীন্দ্রনাথের বিশ্বমানবতা, নজরুলের সাম্যের গান, শ্রীরামকৃষ্ণের “যত মত, তত পথ”, মা সারদার সর্বজনীন মাতৃত্ব এবং স্বামী বিবেকানন্দের “শিবজ্ঞানে জীবসেবা”—এই দীর্ঘ ধারাবাহিকতায়। এই উত্তরাধিকার কোনও রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়; এটি সমগ্র বাঙালি সমাজের অর্জন।

আজ যখন রাজনীতি প্রায়শই মানুষের পরিচয়কে সংকুচিত করে কেবল ধর্ম, জাত বা ভোটব্যাঙ্কে পরিণত করতে চায়, তখন বাংলার ইতিহাস আমাদের অন্য এক পথের কথা মনে করিয়ে দেয়। সেই পথ প্রতিপক্ষকে শত্রু নয়, ভিন্নমতের মানুষ হিসেবে দেখতে শেখায়; ধর্মকে আধিপত্যের নয়, আত্মশুদ্ধির বিষয় হিসেবে উপলব্ধি করতে শেখায়; রাষ্ট্রকে প্রতিশোধের নয়, ন্যায়বিচারের প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে আহ্বান জানায়।

অতএব, বাংলার ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে কোনও একটি রাজনৈতিক দলের জয়ের উপর নয়; নির্ভর করবে বাংলা তার নিজস্ব সভ্যতার স্মৃতি কতখানি ধরে রাখতে পারে তার উপর। যদি আমরা প্রশ্ন করার সাহস হারাই, তবে চর্যাপদের ঐতিহ্য হারাব। যদি মানুষকে ধর্মের আগে না দেখি, তবে চণ্ডীদাস, লালন, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলকে হারাব। আর যদি বিদ্বেষকে রাজনীতির স্বাভাবিক ভাষা হিসেবে মেনে নিই, তবে শ্রীরামকৃষ্ণ, মা সারদা ও স্বামী বিবেকানন্দের উত্তরাধিকারও বিস্মৃত হবে।

বাংলা বারবার প্রমাণ করেছে, এই মাটিতে মতের লড়াই হতে পারে, তর্ক হতে পারে, ক্ষমতার পরিবর্তন হতে পারে; কিন্তু বাংলার আত্মা তখনই বেঁচে থাকে, যখন সে মানুষের পাশে দাঁড়ায়। কারণ বাংলার সবচেয়ে বড় ধর্ম কোনও সম্প্রদায়ের নাম নয়—বাংলার সবচেয়ে বড় ধর্ম তার মানবতা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *