মোহাম্মদ জনি, শ্রীভূমি।
বরাক তরঙ্গ, ৬ মে : করিমগঞ্জ লোকসভার সাংসদ কৃপানাথ মালা নামটি এখন এলাকায় বেশ পরিচিত… তবে কাজের জন্য নয়, বরং অদৃশ্য থাকার অসাধারণ প্রতিভা-র জন্য! গত লোকসভা নির্বাচনে পাথারকান্দি রামকৃষ্ণনগর সহ উত্তর ও দক্ষিণ করিমগঞ্জের মানুষ দুই হাত উজাড় করে ভোট দিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল উন্নয়ন, পরিবর্তন, আর কিছুটা ‘দেখা পাওয়ার আশা। কিন্তু ভোটের পর সেই আশা যেন ‘মোবাইলের নেটওয়ার্ক এর মতো কখনো আসে, বেশিরভাগ সময়ই থাকে না! তার তহবিল অর্থ উন্নয়ের কাজে ব্যায় করা তো দূর। জনগণের খোঁজ নিতে আসতেও দেখা য়ায়,না। তিনি হলেন করিমগঞ্জ লোকসভা কেন্দ্রের রেকর্ড ভোটে জয়ী হওয়া দুবারের বিজেপির সাংসদ কৃপানাথ মালাকে ঘিরে বর্তমানে জেলায় এক অদ্ভুত নীরব আলোড়ন তৈরি হয়েছে। যাকে গত লোকসভা নির্বাচনে পাথারকান্দি রামকৃষ্ণনগ উত্তর ও দক্ষিণ করিমগঞ্জের ভোটাররা বিপুল সমর্থন দিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো দিল্লির মসনদে সংসদ বানিয়ে পাঠিয়েছিলেন, সেই প্রতিনিধিকেই আজ অনেকেই খুঁজে পাচ্ছেন না কমপক্ষে জনজীবনের সমস্যার পাশে তো নয়ই। ভোটের সময়কার চিত্রটা ছিল একেবারেই ভিন্ন। উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি, এলাকার সার্বিক অগ্রগতির আশ্বাস, এবং পিছিয়ে পড়া অঞ্চলের উন্নয়নের নানা পরিকল্পনার কথা শুনে মানুষ আশাবাদী হয়েছিল। উত্তর ও দক্ষিণ করিমগঞ্জের সাধারণ মানুষ মনে করেছিলেন, এবার হয়তো দীর্ঘদিনের অবহেলার অবসান ঘটবে। কিন্তু সময় যত গড়িয়েছে, ততই সেই আশার জায়গায় জায়গা করে নিয়েছে হতাশা এবং এখন তা ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে ক্ষোভে।
অভিযোগ উঠছে, সাংসদ তহবিল থেকে উল্লেখযোগ্য কোনও উন্নয়নমূলক প্রকল্প উত্তর ও দক্ষিণ করিমগঞ্জে দৃশ্যমান নয়। যেসব এলাকায় রাস্তা, পানীয়জল, স্বাস্থ্য পরিষেবা বা অন্যান্য মৌলিক পরিকাঠামোর উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি ছিল, সেখানেই কার্যত স্থবিরতা। স্থানীয়দের কথায় পরিবর্তন তো দূরের কথা, পুরনো সমস্যাগুলোই আরও জটিল হয়ে উঠছে। অনেকেই ব্যঙ্গ করে বলছেন সাংসদ আছেন, তবে শুধু কাগজে-কলমে। পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনের সময়। রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই নির্বাচনে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সাংসদের উপস্থিতি ছিল প্রায় অদৃশ্য। দলের প্রার্থী ও কর্মীরা যেখানে মাঠে নেমে লড়াই করছিলেন, সেখানে সাংসদের অনুপস্থিতি নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। বিরোধীরা তো বটেই, শাসক দলের অন্দরেও এ নিয়ে চাপা অসন্তোষ তৈরি হয়। ফলাফল ঘোষণার পর উত্তর ও দক্ষিণ করিমগঞ্জে শাসক দলের শোচনীয় পরাজয় সেই প্রশ্নগুলোকে আরও জোরালো করে তোলে। এই প্রেক্ষাপটে সোশ্যাল মিডিয়া হয়ে উঠেছে জনমতের এক বড় প্ল্যাটফর্ম। ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ কিংবা স্থানীয় অনলাইন ফোরাম সব জায়গাতেই এখন একটাই আলোচনার বিষয়: “সাংসদ কোথায়?” দলীয় একাংশ কর্মী-সমর্থকরাও প্রকাশ্যে ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন। কেউ লিখছেন, “ভোটের আগে যিনি ঘরে ঘরে পৌঁছে গিয়েছিলেন, ভোটের পরে তিনি যেন উধাও।” আবার কেউ ব্যঙ্গ করে মন্তব্য করছেন এবার ভোট দেওয়ার আগে লোকেশন শেয়ার নিতে হবে!
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জনসংযোগের অভাব এবং দৃশ্যমান উন্নয়নমূলক কাজের ঘাটতি এই দুইয়ের মিলিত প্রভাবই আজকের এই পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে। সাধারণ মানুষ এখন আর শুধু প্রতিশ্রুতি শুনতে চান না; তারা দেখতে চান বাস্তব কাজ, চোখে পড়ার মতো পরিবর্তন। আর সেই জায়গাতেই বড়সড় ফাঁক তৈরি হয়েছে বলে মত অনেকের। সব মিলিয়ে করিমগঞ্জে এখন এক নতুন ‘ট্রেন্ড’ দেখা যাচ্ছে ব্যঙ্গ আর হতাশার মিশেলে সাংসদ খোঁজো অভিযান। প্রশ্ন একটাই জনগণের এই ক্রমবর্ধমান ক্ষোভের মধ্যে কবে আবার দৃশ্যমান হবেন তাঁদের নির্বাচিত প্রতিনিধি? নাকি এই ‘অদৃশ্য উপস্থিতি’ই আগামী দিনের রাজনীতির নতুন বাস্তবতা হয়ে উঠবে?



