১৬ জুলাই : যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বুধবার রাতভর ইরানের দক্ষিণাঞ্চল, হরমুজ প্রণালি-সংলগ্ন উপকূল এবং একাধিক কৌশলগত স্থাপনায় ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এর পাল্টা জবাবে বাহরাইন, কুয়েত ও জর্ডানে মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি করেছে তেহরান। উভয় পক্ষের এই পাল্টাপাল্টি হামলায় মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন হামলায় অন্তত ৩৫ জন নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং হরমুজ প্রণালিতে হুমকি সৃষ্টি করা ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে লক্ষ্য করেই এই অভিযান পরিচালিত হয়েছে। একই সঙ্গে নৌ অবরোধ ভেঙে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করা একটি জাহাজে হামলা চালিয়ে সেটিকে অচল করে দেওয়ার দাবিও করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
হামলার সময় হরমুজ প্রণালির কৌশলগত কেশম দ্বীপ, বন্দর আব্বাস, সিরিক, চাবাহার, কোনারাক ও রাস্কসহ বিভিন্ন এলাকায় একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। পরে রাজধানী তেহরানসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি শহরে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়।
এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরানের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, বাহরাইন ও কুয়েতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। পাশাপাশি জর্ডানের আজরাক বিমানঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের যোগাযোগ ব্যবস্থা, রাডার স্থাপনা ও জ্বালানি ডিপো লক্ষ্য করে হামলার কথাও জানানো হয়েছে। রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ফারসের দাবি, এটি ‘সায়েকেহ’ অভিযানের নবম ধাপ।
অন্যদিকে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, ‘নাসর-২’ অভিযানের অষ্টম ধাপে কুয়েতের আলি আল সালেম বিমানঘাঁটিতে সমন্বিত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। তাদের দাবি, হামলায় একটি আগাম সতর্কীকরণ রাডার এবং মার্কিন সেনাদের একটি সমাবেশস্থল লক্ষ্যবস্তু ছিল। তবে এসব দাবির স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
আইআরজিসি আরও দাবি করেছে, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের আন্দিমেস্ক শহরের আকাশে একটি মার্কিন এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
নতুন করে সংঘাত শুরুর পর গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক (মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং) কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, “যে সমঝোতা থেকে ইরান কোনো বাস্তব সুবিধা পায় না, তা মেনে চলার কোনো যৌক্তিকতা নেই।”
এদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইরান দ্রুত আলোচনায় না ফিরলে দেশটির বিদ্যুৎকেন্দ্র, সেতু ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে আরও হামলা চালানো হবে। পরে এক প্রতিরক্ষা সম্মেলনে তিনি বলেন, “ইরান এখন চাপের মধ্যে রয়েছে। তারা সমঝোতা করতে চায়। এখন দেখা যাক, আমরা চুক্তিতে পৌঁছাই, নাকি বিষয়টির চূড়ান্ত সমাপ্তি ঘটাই।”
সেন্টকমের দাবি, ইরানের বন্দরগুলোতে পুনরায় নৌ অবরোধ আরোপের পর একাধিক বাণিজ্যিক জাহাজ তাদের গন্তব্য পরিবর্তন করেছে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এর জবাবে আইআরজিসি সতর্ক করে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র নৌ অবরোধ অব্যাহত রাখলে শুধু হরমুজ প্রণালি নয়, মার্কিন মিত্রদের ব্যবহৃত অন্যান্য তেল ও গ্যাস রপ্তানি পথও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। তবে কোন কোন রুটকে লক্ষ্য করা হতে পারে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।



