প্রয়াত অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুল শুক্কুর লস্কর

Spread the news

বরাক তরঙ্গ, ২৫ সেপ্টেম্বর : দীর্ঘদিনের অসুস্থতার সঙ্গে লড়াইয়ের পর শুক্রবার সকালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন দক্ষিণ ধলাইয়ের প্রবীণ শিক্ষক ও সমাজসচেতন ব্যক্তিত্ব আব্দুল শুক্কুর লস্কর। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। নর্থহাওয়াইথাং গ্রামের নিজ বাড়িতে সকাল ১০টা নাগাদ তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর প্রয়াণের খবর ছড়িয়ে পড়তেই নর্থহাওয়াইথাংসহ দক্ষিণ ধলাইয়ের বিভিন্ন প্রান্তে শোকের আবহ নেমে আসে।

১৯৪৭ সালের ১ জানুয়ারি জন্মগ্রহণকারী আব্দুল শুক্কুর লস্করের শিক্ষকতা জীবনের সূচনা হয় ১৯৬৮ সালে ভাগা বাজার ইলিয়াস আলী এমপি স্কুলে। দু’বছর পর তিনি কুলিছড়া এলপি স্কুলে বদলি হয়ে যান। ১৯৭৪ সালে তিনি ১৬৫ নম্বর নর্থহাওয়াইথাং এলপি স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনের পর ২০০৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর ওই বিদ্যালয় থেকেই অবসর নেন।

দীর্ঘ কর্মজীবনে শিক্ষার্থীদের কাছে তিনি শুধু একজন শিক্ষক ছিলেন না, ছিলেন অভিভাবকের মতো। পড়াশোনার পাশাপাশি শৃঙ্খলা, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। তাঁর বহু প্রাক্তন ছাত্রছাত্রী পরবর্তীতে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। তাঁদের অনেকের কাছেই তিনি স্নেহভরে স্মরণীয় ছিলেন ‘মেসাব’ নামে।

শিক্ষকতার পাশাপাশি এলাকার সামাজিক ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডেও তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি ছিল। বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা, ক্লাব ও সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন। স্থানীয় বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর পরামর্শ ও সহযোগিতাকে গুরুত্ব দিতেন এলাকার মানুষ। তরুণ প্রজন্মকে সঠিক পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।

আব্দুল শুক্কুর লস্করের আরেকটি বিশেষ পরিচয় ছিল তাঁর অসাধারণ স্মৃতিশক্তি ও বিস্তৃত জ্ঞান। এলাকার অতীত ইতিহাস, পুরনো ঘটনা কিংবা বিভিন্ন সামাজিক বিষয় নিয়ে তাঁর স্মৃতির পরিধি ছিল বিস্ময়কর। কোনও পুরনো ঘটনা বা তথ্যের প্রয়োজন হলে অনেকেই তাঁর কাছে ছুটে যেতেন। এ কারণে পরিচিত মহলে তিনি অনেকটা ‘জীবন্ত তথ্যভাণ্ডার’ হিসেবেই পরিচিত ছিলেন।

২০০৯ সালে প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হওয়ার পর তাঁর চলাফেরা সীমিত হয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে অধিকাংশ সময় বাড়িতেই কাটাতে হলেও প্রাক্তন ছাত্রছাত্রী, আত্মীয়স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ অটুট ছিল। অনেকে নিয়মিত তাঁর বাড়িতে গিয়ে দেখা করতেন।

করোনা পরিস্থিতিতে বাড়িতে সংবাদপত্র পৌঁছানোর ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরও পাঠাভ্যাসে ছেদ পড়েনি। নর্থহাওয়াইথাং থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরের ভাগা বাজারে গিয়ে তিনি নিয়মিত সংবাদপত্র সংগ্রহ করে পড়তেন।

মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, এক পুত্র, দুই কন্যা, জামাতা, নাতি-নাতনিসহ অসংখ্য আত্মীয়স্বজন, প্রাক্তন ছাত্রছাত্রী ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তাঁর দুই বিবাহিত কন্যাই বর্তমানে শিক্ষকতা পেশার সঙ্গে যুক্ত।

শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৪টায় তাঁর বাড়ির সংলগ্ন স্থানে জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। এতে সহস্রাধিক মানুষ অংশগ্রহণ করেন। জানাজা শেষে নর্থহাওয়াইথাংয়ে তাঁর বাড়ির পাশের কবরস্থানে তাঁকে সমাহিত করা হয়।

তাঁর মৃত্যুতে শিক্ষা ও সামাজিক পরিসরে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে অসংখ্য শিক্ষার্থীর জীবনে জ্ঞানের পাশাপাশি মানবিকতার যে বীজ তিনি বপন করেছিলেন, প্রাক্তন ছাত্রছাত্রী ও এলাকাবাসীর স্মৃতিতে সেই অবদানই তাঁকে দীর্ঘদিন বাঁচিয়ে রাখবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *