-:আমার চোখে দুর্গাপূজা:-
।। ড. সন্দীপা দাস শীল ।।
(সহকারী অধ্যাপিকা, সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগ বিভাগ, গুরুচরণ বিশ্ববিদ্যালয়)
১৭ অক্টোবর : পুজোর বাজারে এমন এক দৃশ্য চোখে পড়ল, যা আমার কাছে দুর্গাপুজোর সমস্ত আড়ম্বর, আলোকসজ্জা আর জাঁকজমককে যেন এক মুহূর্তেই ছাপিয়ে গেল।
অত্যন্ত নিম্নবিত্ত এক বাবা তাঁর বছর পাঁচ-ছয়ের ছোট্ট সন্তানটির হাত ধরে বাড়ি ফিরছিলেন। বাবার হাতে ছিল পুজোর নতুন পোশাকের একটি ব্যাগ। ব্যাগটি দেখেই বোঝা যাচ্ছিল, পোশাকগুলি হয়তো কোনও সাধারণ দোকান কিংবা ফুটপাতের ছোট্ট দোকান থেকেই কেনা। সেখানে ছিল না কোনও নামী ব্র্যান্ডের লেবেল, ছিল না দামি বিপণিবিতানের ছাপ। কিন্তু সেই সামান্য ব্যাগটির মধ্যেই যেন জমা ছিল একজন বাবার সমস্ত সামর্থ্য দিয়ে সন্তানের মুখে হাসি ফোটানোর আন্তরিক চেষ্টা। আর শিশুটির হাতে ছিল এক টুকরো জিলিপি।
জানি না, জিলিপিটা বাবাই কিনে দিয়েছিলেন কি না। জানি না, সন্তানের ওইটুকু আবদার পূরণ করতে তাঁকে নিজের পকেটের হিসাব কতটা বদলাতে হয়েছিল। শুধু দেখলাম, শিশুটির চোখেমুখে কী অপার আনন্দ! সেই আনন্দের উজ্জ্বলতা কোনও দামি খেলনার মোহে তৈরি হয়নি, কোনও অভিজাত বিপণিবিতানের আকর্ষণেও নয়। সেটি ছিল একেবারে নিখাদ, নিষ্পাপ আনন্দ। নতুন পোশাকের ব্যাগ হাতে বাবার পাশে হাঁটতে হাঁটতে, হাতে জিলিপি নিয়ে শিশুটি যেন পৃথিবীর সমস্ত প্রাপ্তি একসঙ্গেই পেয়ে গিয়েছিল।
দৃশ্যটি দেখে মনে হলো, একজন বাবার কাছে সন্তানের মুখের হাসির চেয়ে বড় কোনও উৎসব নেই।
হয়তো সেই বাবা অনেক হিসাব কষে, নিজের বহু প্রয়োজনকে পিছনে সরিয়ে, ছোটখাটো অনেক ইচ্ছেকে বিসর্জন দিয়ে সন্তানের জন্য ওই পোশাকটুকু কিনেছেন। হয়তো নিজের জন্য নতুন কিছু কেনার কথা একবারও ভাবেননি। হয়তো পুজোর বাজারে সন্তানের পছন্দের পোশাকটির দাম শুনে অন্য দোকানের সন্ধান করেছেন। হয়তো নিজের সীমিত সামর্থ্য আর সন্তানের ছোট্ট ইচ্ছের মধ্যে সমঝোতা করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত এমন একটি পোশাক কিনেছেন, যা তাঁর সাধ্যের মধ্যে, অথচ শিশুটির কাছে অমূল্য।

আমরা অনেক সময় আনন্দের মূল্য নির্ধারণ করি পোশাকের দাম দিয়ে, রেস্তোরাঁর বিল দিয়ে, কতগুলি মণ্ডপ ঘোরা হলো কিংবা কতটা জাঁকজমকের মধ্যে পুজো কাটল, সেই হিসাব দিয়ে। অথচ ওই বাবা আর শিশুটিকে দেখে মনে হলো, আনন্দের কোনও নির্দিষ্ট দাম হয় না। যে বাবা হয়তো সন্তানের জন্য অনেক কিছু কিনে দিতে পারেন না, তাঁর হাত ধরে বাড়ি ফেরার সময় সেই শিশুটির চোখেও জ্বলে ওঠে হাজারো স্বপ্ন। সেই স্বপ্নের কোনও ব্র্যান্ড নেই, কোনও শ্রেণিবিভাগ নেই, কোনও আর্থিক মূল্যও নেই।
শিশুটি হয়তো জানেই না, তার বাবার পকেটে কত টাকা রয়েছে। সে বোঝে না সংসারের অভাব কী, মাসের শেষে হিসাব মেলানোর দুশ্চিন্তা কাকে বলে। নিজের ইচ্ছেকে পিছনে সরিয়ে সন্তানের ছোট্ট আবদার পূরণ করার মধ্যেই যে অনেক সময় পিতৃত্বের সবচেয়ে গভীর অর্থ লুকিয়ে থাকে, তা-ও তার জানা নেই।
সে শুধু জানে, পুজো এসেছে, তার নতুন জামা হয়েছে, হাতে জিলিপি রয়েছে আর তার পাশে রয়েছে তার বাবা। এইটুকুই তার পৃথিবী। এই সামান্য প্রাপ্তির মধ্যেই তার আকাশভরা আনন্দ। আমাদের চোখে যে আনন্দ খুব সাধারণ, কোনও কোনও মানুষের কাছে সেই আনন্দই সারা বছরের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। শিশুটির চোখের দিকে তাকিয়ে মনে হলো, দুর্গাপুজোর সবচেয়ে সুন্দর আলো হয়তো মণ্ডপের ঝলমলে আলোকসজ্জায় জ্বলে না। সেই আলো জ্বলে কোনও এক বাবার সন্তানের মুখে হাসি ফোটাতে পারার তৃপ্তিতে, কোনও এক মায়ের সন্তানের নতুন জামাটি বুকে জড়িয়ে দেখার আনন্দে কিংবা কোনও এক পরিবারের সামান্য আয়োজনের মধ্যেও একসঙ্গে ভালো থাকার স্বপ্নে। কারও কাছে পুজো মানে দামি পোশাক, রেস্তোরাঁয় খাওয়াদাওয়া কিংবা বিদেশ থেকে বাড়ি ফেরা। আবার কারও কাছে পুজো মানে সারা বছরের সঞ্চয় থেকে সন্তানের জন্য একটি নতুন জামা কেনা। কারও আনন্দ পাঁচতারা হোটেলের ঝলমলে আলোয়, আবার কারও আনন্দ রাস্তার ধারের দোকান থেকে কেনা জিলিপির মিষ্টিতে।
আয়োজন আলাদা হতে পারে, আনন্দের প্রকাশও ভিন্ন হতে পারে। কিন্তু সন্তানের চোখে আনন্দের ঝিলিক দেখে বাবা-মায়ের মনে যে তৃপ্তি জন্মায়, প্রিয়জনের মুখে হাসি দেখে যে শান্তি অনুভূত হয়, তার অনুভব সবার কাছেই এক।
আমার মনে হয়, দুর্গাপুজো আমাদের বারবার এই কথাটিই মনে করিয়ে দেয়—জীবন যতই কঠিন হোক, মানুষ তবু আনন্দের স্বপ্ন দেখে।
অভাবের মধ্যেও মানুষ উৎসবের জন্য একটু জায়গা রেখে দেয়। প্রতিদিনের লড়াই, দুশ্চিন্তা, অনিশ্চয়তা আর না-পাওয়ার দীর্ঘ তালিকার মধ্যেও মানুষ অপেক্ষা করে কয়েকটি দিনের জন্য। এমন কিছু দিনের জন্য, যখন নিজের মতো করে একটু হাসবে, প্রিয়জনের হাত ধরে ঘুরবে, সন্তানকে নতুন পোশাক পরাবে কিংবা নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী ছোট্ট কোনও ইচ্ছেকে পূরণ করবে। হয়তো এই কারণেই দুর্গাপুজো শুধু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি হয়ে ওঠে মানুষের বেঁচে থাকার সাহস, অভাবের মধ্যেও স্বপ্ন দেখার শক্তি এবং একে অপরের আনন্দে সামিল হওয়ার এক সুন্দর উপলক্ষ।

সেই বাবা হয়তো পরদিন থেকেই আবার জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হবেন। সংসারের খরচ, কাজের অনিশ্চয়তা আর নিত্যদিনের সংগ্রাম তাঁকে আবার ঘিরে ধরবে। কিন্তু তাঁর ছোট্ট সন্তানটির কাছে এই পুজো হয়তো থেকে যাবে নতুন জামা, হাতে জিলিপি আর বাবার সঙ্গে বাড়ি ফেরার এক মধুর স্মৃতি হয়ে।
কে জানে, বহু বছর পর বড় হয়ে শিশুটি হয়তো মনেও করতে পারবে না, জামাটি কোন দোকান থেকে কেনা হয়েছিল কিংবা তার দাম কত ছিল। কিন্তু বাবার হাত ধরে পুজোর দিন বাড়ি ফেরার সেই আনন্দ, নিজের ছোট্ট পৃথিবীটাকে পরিপূর্ণ মনে হওয়ার সেই অনুভূতি হয়তো তার স্মৃতির কোনও এক কোণে চিরকাল থেকে যাবে।
আমরা যখন দেবী দুর্গার কাছে সুখ, শান্তি আর সমৃদ্ধি প্রার্থনা করি, তখন সেই প্রার্থনায় এই মানুষগুলোর কথাও থাকুক। তাঁদের ঘরেও যেন আলো জ্বলে, তাঁদের সন্তানদের চোখেও যেন স্বপ্ন বেঁচে থাকে। তাঁদের জীবনেও যেন উৎসবের আনন্দ কোনও বিলাসিতা হয়ে না থেকে বেঁচে থাকার স্বাভাবিক অধিকার হয়ে ওঠে।
প্রত্যেক শিশুর যেন নতুন পোশাকের আনন্দ উপভোগ করার সুযোগ থাকে, প্রত্যেক বাবা-মা যেন নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সন্তানের মুখে হাসি ফোটাতে পারেন। অভাব যেন কারও স্বপ্ন দেখার অধিকার কেড়ে নিতে না পারে।
কারণ, আমার চোখে দুর্গাপুজোর সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ শুধু দেবীর মুখের অলৌকিক হাসিতে নয়, তার চেয়েও বেশি লুকিয়ে রয়েছে সেই বাবার মুখের নীরব তৃপ্তিতে আর জিলিপি হাতে শিশুটির চোখের উজ্জ্বলতায়। সেই চোখের আলোতেই আমি দেখি মায়ের আগমন। সেই ছোট্ট হাসিতেই খুঁজে পাই দুর্গাপুজোর প্রকৃত সার্থকতা।
আমার চোখে দুর্গাপুজো মানে—অভাবের মধ্যেও আনন্দ খুঁজে নেওয়া, সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও ভালোবাসাকে উজাড় করে দেওয়া এবং পৃথিবীর সমস্ত না-পাওয়ার মাঝেও একটি শিশুর চোখে স্বপ্ন বেঁচে থাকতে দেখা।



