মেঘালয়ে জাতিগত সংঘাত- সমাধান কোন পথে ?

Spread the news

।। প্রদীপ দত্তরায় ।।
( লেখক ছাত্র সংগঠন আকসার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও গৌহাটি হাইকোর্টের আইনজীবী)
৩০ আগস্ট : গত উনিশে আগস্ট শিলঙে একটি প্রতিবাদী মিছিল বের করেছিল খাসি স্টুডেন্টস ইউনিয়ন। অভিযোগ – রাজ্য সরকার তাদের পূর্ব ঘোষিত দাবিগুলোকে অবহেলা করছেন। দাবির মধ্যে ছিল একটি সিমেন্ট কারখানা স্থাপনের আগে গণশুনানির ব্যাবস্থা করা। এছাড়া মেঘালয়ের বাসিন্দাদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষাজনিত আইন এবং অভিবাসী শ্রমিক সংক্রান্ত আইনের সংশোধন। কিন্তু সরকারের বিরুদ্ধে আয়োজিত সেই মিছিল অকারণেই হিংসার রূপ নেয়। মিছিলে অংশগ্রহণকারীরা স্থানীয় পথচারী এবং আসামের ৩১টি ট্যুরিস্ট গাড়ির উপর হামলা চালায়। পরবর্তী ঘটনাক্রম আমরা জানি। অসম-মেঘালয় সীমান্তে অবরোধ,পাল্টা অবরোধ, সরকারি হস্তক্ষেপ, কেএসইউ নেতাদের গ্রেফতার, ইত্যাদির পর পরিস্থিতি আপাতত নিয়ন্ত্রণে রয়েছে,যদিও এখনো চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে।

তবে এই ডামাডোলে একটি ব্যাপার নিয়ে মেঘালয় ও অসম দুই রাজ্যের সরকারের কোন প্রতিক্রিয়া চোখে পড়েনি।  সেদিনের এই মিছিলে অংশগ্রহণকারীরা শিলং আর আর কলোনির নেতাজি ও স্বামী বিবেকানন্দের মূর্তিতেও একইসাথে ভাংচুর চালিয়েছিল। স্বামীজির মূর্তির সামনের কাঁচের আস্তরণ ঢিল মেরে ভেঙে দেওয়া হলেও মূর্তির প্রত্যক্ষ ক্ষতি হয়নি। কিন্তু নেতাজির আবক্ষ প্রতিকৃতিকে রীতিমতো ভেঙে মাটিতে ফেলা দেওয়া হয়। এবং শুধু তাই নয় এনিয়ে পায়ে পায়ে ফুটবল খেলাও হয়। যদিও মেঘালয় সরকারের এ ব্যাপারে কোন প্রতিক্রিয়া নেই,তবে সরকারি শিল্প ও সংস্কৃতি দফতরের তরফে মূর্তি দুটির সৌন্দর্যায়ন ও আবার প্রতিস্থাপনের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

আমাদের মনে হতেই পারে মিছিলের দাবিদাওয়ার সাথে আপাত সম্পর্কহীন এই কান্ড ঘটানোর উদ্দেশ্য কি এবং কেনই বা এনিয়ে সরকার নীরব! আসলে এসব বরেণ্য ব্যক্তিদের অপমানের পেছনে রয়েছে তথাকথিত বহিরাগত এবং স্থানীয় বাঙালিদের প্রতি বিদ্বেষজনিত মনোভাব ও রাজনীতি।
কেএসইউ দ্বারা এই ধরনের ঘটনা বারবার ঘটানো হয় এবং এর পেছনে মেঘালয়ের ইতিহাস ও জনপ্রিয় রাজনীতির বিশাল ভূমিকা রয়েছে।

ব্যাপারটি বুঝতে একটু ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকানো যাক।
২০১১ এর জনগননা অনুযায়ী মেঘালয়ের মোট জনসংখ্যা প্রায় ৩০ লক্ষ, যারমধ্যে উপজাতিদের সংখ্যা ২৬ লক্ষ এবং অনুপজাতিদের সংখ্যা ৪ লক্ষ। অর্থাৎ শতাংশের নিরিখে অনুপজাতিদের সংখ্যা ১৩.৮ শতাংশ। অনুপজাতিদের মধ্যে  রয়েছেন বাঙালি, নেপালি, হাজং, বিয়েটস, কোচ, রাজবংশী, বড়ো, ডিমাসা ইত্যাদি। অল্পসংখ্যক হলেও রয়েছেন পাঞ্জাবি, শিখ, বিহারী ও মাড়োয়ারি সম্প্রদায়ের লোকেরা। ২০১১ সেন্সাস অনুযায়ী শিলংএ বাঙালিদের সংখ্যা দুই লক্ষ বত্রিশ হাজার যা মোট জনসংখ্যার ৬.৪ শতাংশ।  শিলঙে অনুপজাতি, বিশেষতঃ বাঙালিদের অভিবাসন ঘটেছে মূলতঃ বেশ কয়েকটি পর্বে।
১. বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসন আমলে: ১৮৭৪ সালে শিলং শহরকে আসামের চিফ কমিশনারের শাসিত প্রদেশের রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং এটি ব্রিটিশ প্রশাসনের অসামরিক ও সামরিক কার্যব্যাস্থার অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠে। প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কারণে শিক্ষিত, দক্ষ এবং পরিশ্রমী মানবসম্পদের প্রয়োজন অপরিহার্য হয়ে পড়ায় ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লোকজনকে শিলংএ নিয়ে আসা হয়। এরমধ্যে কেরানী, শিক্ষক, হিসাবরক্ষক, ব্যাবসা ইত্যাদির জন্য বাঙালিকে, সেনা বাহিনী, পশুপালন, জিনিষপত্র বহন ও পরিবহনের জন্য নেপালিদের, বানিজ্যের জন্য মাড়োয়ারি, সিন্ধি, গুজরাটিদের  এবং আরও বিভিন্ন প্রয়োজনে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের লোকদের অভিবাসন হয়। ফলে স্বাধীনতার আগেই শিলং শহর তথা পার্শ্ববর্তী এলাকা বহুজাতিক এবং আধুনিক রূপ পরিগ্রহ করে।
২. ১৯৪৭ এর দেশভাগ ও পরবর্তী পর্যায়: রেডক্লিফের কলমের আঁচড়ে ভারতের মূল ভূখণ্ড যেভাবে বিভাজিত হল তাতে নিজভূমে পরবাসী হলেন অসংখ্য মানুষ যার এক বড় অংশ বিশেষতঃ হিন্দু বাঙালিরা ভারতে পালিয়ে আসতে বাধ্য হন।পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও অসমের সঙ্গে মেঘালয়েও এঁদের একাংশ আশ্রয় নেন। এই পরিব্রাজন ৫০ এর দশক অবধি স্থায়ী হয়। যে আর আর কলোনিতে উল্লেখিত নেতাজি মূর্তিটি প্রতিস্থাপিত হয়েছিল সেই রিলিফ অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন কলোনির পত্তন হয়েছিল ১৯৫৬ সালে , তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে আগত শরণার্থীদের পুনর্বাসনের উদ্দেশ্যে এবং সরকারি উদ্যোগে।
৩. ১৯৬০ এর দশক : পূর্ব পাকিস্তানে চলমান হিংসার পরিপ্রেক্ষিতে এইসময়ও মাঝে মধ্যে শরণার্থীরা মেঘালয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। তবে এই সময়কালে আগতদের মধ্যে অধিকাংশই গারো, হাজং বা স্থানীয় উপজাতি সম্প্রদায় ভুক্ত ছিলেন।
৪. ১৯৭১ এবং পরবর্তীতে প্রব্রজন ঘটেছে কিনা এবং হলেও তা কতটা তার কোন প্রমাণ নেই। কিন্তু এই বিষয়টিকে ভিত্তি করেই ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ বা ‘বাংলাদেশী’ তত্বের আওতায় মেঘালয়ের সমগ্র বাঙালি সম্প্রদায়কে দাগিয়ে রাজনীতি করে চলেছে কেএসইউ এর মতো সংগঠন।

১৯৭২ সালে নতুন রাজ্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে মেঘালয়। পরবর্তীতে এটি ষষ্ট তফশিলী রাজ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এবং তখন থেকেই আদিবাসী এবং অ-আদিবাসীদের মধ্যে সংঘাতের ক্ষেত্র তৈরি হতে শুরু করে। ষষ্ঠ তফসিলের অধীনে উপজাতিদের জন্য বিশেষ অধিকার প্রাপ্তির ফলে অনুপ জাতিদের নতুন প্রব্রজন কিভাবে আটকানো হবে তার চেয়েও সরকার তথা নেতৃস্থানীয় দের মধ্যে বড় প্রশ্ন দাঁড়িয়ে যায় যেসব অনুপজাতি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই ভুখণ্ডে বসবাস করছেন তাঁদের কিভাবে রাজ্যগঠন প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে ! এই উদ্বেগের নেপথ্যে প্রধান কারণসমূহ হিসেবে ছিল জনসংখ্যাগত আশঙ্কা। ছিল জমির অধিকার সুনিশ্চিত করা, যেহেতু ষষ্ট তফসিলের অধীনে এই ব্যাপারে বিশেষ ক্ষমতা প্রাপ্তি হয়েছিল। একই সঙ্গে নতুন রাজ্য গঠনের পর আদিবাসীদের রাজনৈতিক ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, তাঁরা প্রভাবশালী হয়ে উঠেন। এছাড়া স্থানীয় কর্মসংস্থানের বিভিন্ন উপায় যথা সরকারি চাকরি,ব্যাবসা বাণিজ্য, পরিবহন, বিভিন্ন পেশাগত ক্ষেত্র ইত্যাদিতে অনুপজাতিদের প্রাধান্যও সংঘাতের ক্ষেত্র তৈরি করে। দ্রুত গতিতে নগরায়ন এবং রাজধানী শিলংএর অর্থনৈতিক উত্থানও প্রত্যক্ষ প্রতিযোগিতা ও সংঘাতকে তরান্বিত করে। তবে আরো দু’টি কারণ অবশ্যই উল্লেখ্য। প্রথমত আসাম, পশ্চিমবঙ্গ, বিহার,নেপাল ইত্যাদি প্রদেশ থেকে অব্যাহত প্রব্রজন এবং ১৯৭০ থেকে আশির দশকে আসামে চলমান ‘বিদেশি বিতাড়ন’ বা ‘বঙ্গাল খেদা’ আন্দোলনের প্রভাব।

উপজাতি এবং অনুপ জাতিদের মধ্যে চলমান উদ্বেগ প্রথম জাতিগত সংঘর্ষের রূপ নেয় ১৯৭৯ সালে। এর অন্যতম লক্ষ্য হন মেঘালয়ের বাঙালি সম্প্রদায়। স্থানীয় লামাভিলা এলাকার একটি কালী প্রতিমা বিসর্জন নিয়ে এই সংঘর্ষের সূত্রপাত হলেও তা ধীরে ধীরে সমগ্র রাজ্যে ছড়িয়ে পড়ে। সবকিছুর নেতৃত্বে ছিল সেই খাসি স্টুডেন্টস ইউনিয়ন।এই দাঙ্গায় নিহত হন ৩০ জনের অধিক বাঙালি। বাড়িঘর, ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটতরাজের ঘটনা ঘটে। আশ্রয় শিবিরে ঠাঁই নেন প্রচুর মানুষ। দাঙ্গা পরবর্তী পর্যায়ে ২৫০০০ থেকে ৪০০০০ মানুষ রাজ্য ছেড়ে চিরতরে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হন। এরপর থেকে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়েছে শুধু লক্ষ্য বদল হয়েছে। ১৯৮৭ সালে উপজাতি দুষ্কৃতীদের আক্রমনের লক্ষ্য হন স্থানীয় নেপালি সম্প্রদায়। এতেও প্রায় কুড়ি জনকে হত্যা করা হয়,কয়েক হাজার বাস্তুহারা হন, বাড়িঘর, দোকান ও ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠানে ব্যাপকভাবে হামলা চালানো হয়। ১৯৯২ তে হামলার লক্ষ্য হন স্থানীয় বিহারীরা। এতেও নিহত হন‌ কুড়িজনের অধিক নিরীহ নাগরিক, বাস্তহারা হয় হাজার খানেক মানুষ। এছাড়া ২০১০ লাংফি,আসাম মেঘালয় সীমান্তে, ২০১৮তে শিলং, পাঞ্জাবি লেনে ( হামলার শিকার দলিত শিখরা),  ২০২০ সালে ইছামতি,ভারত বাংলাদেশ সীমান্তে ( নিহত তিন, বাস্তুচ্যুত শ’খানেক বাঙালি) ঘটনা ঘটেছে।

এখানে একটি বিষয় উল্লেখ্য সামগ্রিক জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও ১৯৮০ থেকে ২০১১ এই সময় সীমায় মোট জনসংখ্যার শতাংশের হিসেবে অনুপজাতিদের সংখ্যা কমেছে। শতাংশের হিসেবে বাঙালি জনসংখ্যা ৮.৯৫ থেকে নেমে ৭.৮৪ হয়েছে, নেপালিদের ক্ষেত্রে ৪.৫৯ থেকে নেমে ১.৮৪ হয়েছে।

অথচ আধুনিক শিলং শহর তথা রাজ্যের উত্থানে বাঙালি সহ সমস্ত অনুপজাতিদের উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। বাঙালিদের উদ্যোগে ১৯২৩ সালে শিলংএ প্রতিষ্ঠা হয়েছিল লাবান বয়েজ স্কুলের, ১৯৬৪ তে নিউকলোনি স্কুলের। এছাড়া ৬০ এর দশকে শিলং আইন কলেজ, প্রথম মেডিক্যাল স্টোর ও ক্লিনিক, বিভিন্ন পেশাগত পরিষেবা ইত্যাদিতে বাঙালিদের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে। বিভিন্ন বানিজ্য, পরিবহন, প্রশাসনিক কাজকর্ম ইত্যাদির গোড়াপত্তন অনুপজাতিদের হাত দিয়েই। কিন্তু সর্বক্ষেত্রেই কখনোই অনুপজাতিরা স্থানীয় উপজাতিদের উপর কর্তৃত্ব ফলাননি, এমন কোন উদাহরণ নেই।বরঞ্চ উপজাতিদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাজ্যের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে সামিল হয়েছেন। উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে একটা সময়ে অত্যন্ত অন্তরঙ্গ ও পারস্পরিক সহযোগিতার সম্পর্ক ছিল যা আজও সাধারণ স্তরে বিদ্যমান রয়েছে।

সামগ্রিক ঘটনাক্রম পর্যালোচনা করলে এটা বোঝা যায় যে অনুপজাতিদের সম্পর্কে উপজাতিদের উদ্বেগ সম্পুর্ন ভিত্তিহীন ছিল না, কিন্তু সরকার এবং  বৌদ্ধিক মহলের সদিচ্ছা এবং নিরপেক্ষ ভূমিকা থাকলে আলোচনার মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান অবশ্যই সম্ভব ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই ১৯৭৯ সালের দাঙ্গা থেকে এখন অব্দি যেসব দুর্বৃত্তরা অনুপজাতিদের হত্যা, হামলা, তাঁদের সম্পত্তিতে অগ্নিসংযোগ ইত্যাদিতে ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটিয়েছে তাঁদের কারুর উল্লেখযোগ্য কোন শাস্তি হয়নি। উল্টে অনুপজাতিদের ‘ডখার’ (বহিরাগত), বাংলাদেশী সংজ্ঞা জুটেছে, তাঁরা ধীরে ধীরে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পর্যবসিত হয়েছেন। এটা পরিস্কার যে তখন থেকে যারাই মেঘালয়ে ক্ষমতায় এসেছেন তাঁরা হয় রাজনৈতিক কারনে অথবা ভয়ে, অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে এইসব অপকর্মকারীদের বিচারের আওতায় আনতে ব্যর্থ হয়েছেন,ব্যর্থ হয়েছেন কেএসইউর মতো সংগঠনের অনৈতিক কার্যকলাপে লাগাম টানতে।একমাত্র এবারের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কেএসইউর শীর্ষ নেতাদের কয়েকজনকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে,যা নেহাৎই ব্যাতিক্রম। অনেকে বলেছেন অসম সীমান্তে অবরোধ দীর্ঘস্থায়ী হলে রাজ্য পন্য ও অর্থনৈতিক সঙ্কট দেখা দিত। ফলে বাধ্য হয়ে মুখ্যমন্ত্রী এই ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছেন।

এসবের ফলে মেঘালয়ে বসবাসকারী অনুপজাতিরা বহু দশক ধরেই এক অদৃশ্য আতঙ্কের মধ্যে বসবাস করে আসছেন। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তাঁদের জীবন যেন অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তাহীনতা এবং আত্মরক্ষার এক দীর্ঘ অধ্যায়। অনেকেই হয়তো নীরব থাকাকেই নিরাপদ পথ বলে বেছে নিয়েছেন—নিজেদের চারপাশে তৈরি করেছেন নীরবতার এক অদৃশ্য আবরণ। তাঁদের আশ্বস্ত হবার মতো কোন পরিস্থিতি কখনই তৈরি হয়নি। 

অথচ সরকারি চাকরিতে বর্তমানে উপজাতিদের ৮০ শতাংশ সংরক্ষণ রয়েছে। বাকি কুঁড়ি শতাংশ পদে আবেদন করতে হলে স্থানীয় উপজাতিয় ভাষায় দক্ষতা দরকার যেক্ষেত্রে প্রতিযোগিতায় অনুপজাতিদের পিছিয়ে পড়া স্বাভাবিক। ফলে বর্তমানে সরকারি চাকরিতে অনুপ জাতিদের সংখ্যা খুবই নগণ্য। অনুপজাতি, যাদের ছোটখাটো ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠান রয়েছে সেসবের ট্রেড লাইসেন্স নবীকরণ করতে ডিস্ট্রিক কাউন্সিল কতৃপক্ষের দ্বারস্থ হতে হয় এবং তা বিভিন্ন অছিলায় ও অজুহাতে ঝুলিয়ে রাখা হচ্ছে। তাই প্রতিযোগিতার তেমন কোন ক্ষেত্র নেই।

শিলংএর বিশিষ্টজনেরা কয়েক বছর আগে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী কনরাড সাংমার কাছে মেঘালয়ের অনুপজাতিদের সুরক্ষা ও উন্নয়নে একটি পৃথক সংখ্যালঘু উন্নয়ন দপ্তর তৈরির সনির্বন্ধ অনুরোধ জানিয়ে স্মারকলিপি পেশ করেছিলেন। কিন্তু এ ব্যাপারে আজ অবধি কোন অগ্রগতি হয়েছে বলে জানা নেই।

আমাদের সংবিধান প্রত্যেক নাগরিকের জীবন ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয়, মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকার দেয়। এটা স্বীকার করতেই হবে যে বহুদশক ধরে মেঘালয়ের অনুপজাতিদের এই অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে এবং এসব চলতে থাকলে ধীরে ধীরে বাকিরাও হয়তো আগামীতে এই রাজ্য ছাড়তে বাধ্য হবেন। যেহেতু এক্ষেত্রে রাজ্য সরকারের ব্যর্থতা প্রকট তাই কেন্দ্রীয় সরকারের হস্তক্ষেপ অবশ্যই জরুরী। এছাড়া অন্য কোন বিকল্প নেই।

ভাঙা মূর্তি গড়ে তোলার উদ্যোগ হয়তো নেওয়া হবে কিন্তু এই দেশের একজন নাগরিক হিসেবে নিজের অস্তিত্ব ও  আপনভূমিতে নিজের অধিকার সম্পর্কে যে আস্থা, মেঘালয়ের অনুপজাতিদের ক্ষেত্রে তা প্রতিস্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হবে কি ?
( মতামত লেখকের ব্যক্তিগত)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *