রক্ষা বন্ধন : ভালোবাসা, সুরক্ষা ও সম্প্রীতির বন্ধন

Spread the news

।। নীলকণ্ঠ চৌধুরী।।
(লেখক, সংবাদকর্মী)
২৮ আগস্ট : রক্ষা বন্ধন বা রাখি ভারতীয় সংস্কৃতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎসব। শ্রাবণ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে পালিত এই উৎসব মূলত ভাই-বোনের ভালোবাসা, পারস্পরিক দায়িত্ববোধ ও সুরক্ষার অঙ্গীকারের প্রতীক। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রক্ষা বন্ধনের তাৎপর্য কেবল পারিবারিক সম্পর্কের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি সামাজিক সম্প্রীতি, ভ্রাতৃত্ববোধ এবং মানবিক বন্ধনেরও প্রতীক হয়ে উঠেছে।

রক্ষা বন্ধনের মূল ভাবনা ‘রক্ষা’—অর্থাৎ একে অপরের পাশে থাকার অঙ্গীকার। এই দিনে বোনেরা ভাইয়ের কপালে তিলক পরিয়ে, হাতে রাখি বেঁধে তাঁর সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করেন। ভাইও বোনের নিরাপত্তা, সম্মান ও সুখের জন্য পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দেন। রাখির সুতো তাই নিছক একটি সুতো নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ভালোবাসা, বিশ্বাস, দায়িত্ব ও আত্মিক সম্পর্কের অনুভূতি।
ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে এই উৎসব বিভিন্ন নামে ও রীতিতে পালিত হয়। কোথাও এটি রাখি পূর্ণিমা, কোথাও নারিয়াল পূর্ণিমা বা কাজরি পূর্ণিমা নামে পরিচিত। বিশেষ করে উপকূলবর্তী অঞ্চলে সমুদ্রদেবতা বরুণের উদ্দেশ্যে নারকেল নিবেদনের রীতি রয়েছে। আবার প্রকৃতির সুরক্ষার বার্তা দিতে অনেক জায়গায় তুলসী ও অশ্বত্থ গাছেও রাখি বাঁধা হয়। এই ‘বৃক্ষ রক্ষা বন্ধন’ উৎসবের ভাবনাকে আরও বিস্তৃত করে—প্রকৃতি রক্ষা ছাড়া মানুষের নিরাপত্তাও যে অসম্পূর্ণ, সেই বার্তাই এতে প্রতিফলিত হয়।

হিন্দু ধর্মীয় আচারেও পবিত্র সুতো বাঁধার প্রচলন বহু প্রাচীন। বিভিন্ন পূজা, যজ্ঞ কিংবা ধর্মীয় অনুষ্ঠানের শুরুতে পুরোহিত ভক্তের কব্জিতে পবিত্র সুতো বেঁধে দেন। এর অন্তর্নিহিত ভাবনাও সুরক্ষা ও মঙ্গলকামনা। বিবাহের মঙ্গলসূত্র বা কঙ্কন বন্ধনের মধ্যেও একইভাবে সম্পর্কের সুরক্ষা ও দায়িত্বের প্রতীকী প্রকাশ দেখা যায়।

রক্ষা বন্ধনের সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো—এই বন্ধন রক্তের সম্পর্কের মধ্যে আবদ্ধ নয়। স্ত্রী স্বামীকে, শিষ্য গুরুকে, কিংবা একজন মেয়ে কোনও ছেলেকে ভাই হিসেবে গ্রহণ করে রাখি পরাতে পারেন। ঘনিষ্ঠ বন্ধু, প্রতিবেশী কিংবা সমাজের অন্য মানুষের হাতেও রাখি বাঁধার মধ্য দিয়ে সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। অর্থাৎ রক্ষা বন্ধন ব্যক্তিগত সম্পর্ক থেকে বৃহত্তর সামাজিক সম্পর্কের দিকে এগিয়ে যাওয়ার একটি সুযোগ তৈরি করে। ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’—সমগ্র পৃথিবীই এক পরিবার—এই চেতনাকে আরও শক্তিশালী করার ক্ষেত্রেও উৎসবটির তাৎপর্য রয়েছে।

রক্ষা বন্ধনকে ঘিরে রয়েছে নানা পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক কাহিনি। ভবিষ্য পুরাণে দেবরাজ ইন্দ্র ও সচী দেবীর কাহিনিতে রাখির উল্লেখ পাওয়া যায়। আবার কৃষ্ণের আঙুলে আঘাত লাগলে দ্রৌপদীর কাপড়ের টুকরো দিয়ে তাঁর আঙুল বেঁধে দেওয়ার মহাভারত-সম্পর্কিত কাহিনিও রাখির সঙ্গে জনপ্রিয়ভাবে যুক্ত। রাজা বালি ও দেবী লক্ষ্মীর কাহিনিতেও শ্রাবণ পূর্ণিমায় রাখি বাঁধার প্রসঙ্গ উঠে আসে।
ইতিহাসের পাতাতেও রাখিকে ঘিরে কিছু বহুল প্রচলিত কাহিনি রয়েছে। আলেকজান্ডারের স্ত্রী ও রাজা পুরুষোত্তমের কাহিনি কিংবা চিতোরের রানি কর্ণবতীর সম্রাট হুমায়ুনের কাছে রাখি পাঠানোর ঘটনা সেই স্মৃতিকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। যদিও এসব কাহিনির ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে, তবুও এগুলো ভারতীয় লোকস্মৃতি ও সাংস্কৃতিক চেতনায় রক্ষা বন্ধনের প্রতীকী গুরুত্বকে তুলে ধরে।
আজকের দিনে রক্ষা বন্ধনের তাৎপর্য আরও গভীর। সমাজে যখন বিভাজন, হিংসা, অবিশ্বাস ও স্বার্থপরতা ক্রমশ বেড়ে চলেছে, তখন রাখির একটি ছোট্ট সুতো আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্যই। নিরাপত্তা কেবল ভাইয়ের দায়িত্ব নয়; পারস্পরিক সম্মান, সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধই প্রকৃত সুরক্ষার ভিত্তি।
তাই রক্ষা বন্ধনকে শুধু ভাই-বোনের উৎসব হিসেবে দেখলে এর বৃহত্তর তাৎপর্য কিছুটা সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। এটি হোক নারী-পুরুষের পারস্পরিক সম্মান, পরিবারে ভালোবাসা, সমাজে সম্প্রীতি এবং প্রকৃতির প্রতি দায়িত্ববোধের উৎসব। হাতে বাঁধা রাখির সুতো আমাদের প্রতিদিন মনে করিয়ে দিক—রক্ষা একতরফা নয়, ভালোবাসা ও দায়িত্বের বন্ধনই প্রকৃত রক্ষাকবচ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *