জ্বলছে হোটেল, জতুগৃহে প্রাণ রক্ষায় এগিয়ে এসেছিলেন ওঁরা, চিনে নিন দিল্লির ‘দেবদূত’-দের

Spread the news

৫ জুন : চোখের সামনে দাউ দাউ করে জ্বলছে দিল্লির মালব্য নগরের অভিজাত হোটেল। জানলার পাশে দাঁড়িয়ে আর্তচিৎকার করছেন আটকে পড়া মানুষগুলো। তাঁদের বাঁচাতে দ্বিতীয় কোনও চিন্তা না করেই ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন ওঁরা। কেউ নিজের লাখ লাখ টাকার ম্যাট্রেস নির্দ্বিধায় রাস্তায় বিছিয়ে দিয়েছেন তো কেউ আবার নিজের জীবনের পরোয়া না করে একের পর এক আহতদের রক্ষা করতে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাঁরা জানালা ভেঙেছেন, গ্রিল কেটেছেন এবং কেউ আবার আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসাও করেছেন।

ওঁরাই বাস্তবের হিরো—রিয়াজউদ্দিন মনসুরি, আরমান, মহম্মদ আফজল, আমির খান ও ওয়াসিম রাজা। বুধবার ৩ জুন দক্ষিণ দিল্লির মালব্য নগরের হাউজ রানি এলাকায় অবস্থিত ‘ফ্লারিশ স্টে’ নামের একটি বেড অ্যান্ড ব্রেকফাস্ট (B&B) হোটেলে ভয়াবহ আগুন লাগে। বাড়িটির নীচের তলায় একটি রেস্তোরাঁ এবং উপরের তলাগুলিতে অতিথিদের থাকার ব্যবস্থা ছিল। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় বহু মানুষ ধোঁয়া ও আগুনের মধ্যে আটকে পড়েন। তখনই দেবদূতের মতো হাজির হয়েছিলেন এই চার অসাধারণ মানুষ।

প্রথমেই আসে রিয়াজউদ্দিন মনসুরি ও তার ছেলে আরমানের কথা। জ্বলন্ত বিল্ডিংয়ের সামনের রাস্তায় প্রায় ২০-২২টি তোশক বিছিয়ে একটি ‘সেফ জাম্পিং প্যাড’ তৈরি করেন, যাতে আগুন থেকে বাঁচতে বিল্ডিং থেকে ঝাঁপ দেওয়া মানুষগুলো প্রাণে রক্ষা পেতে পারেন। প্রায় চার দশক ধরে হোটেলের বিপরীতে ম্যাট্রেস, বিছানার গদির ব্যবসা আরমানদের। আগুন লাগার পরে নিজেদের প্রায় লক্ষাধিক টাকার গদি তাঁরা অবলীলায় দিয়ে দেন। সংবাদ মাধ্যমকে রিয়াজউদ্দিন বলেন, ‘আমার প্রায় ২ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু তাতে কোনও আফশোস নেই। শুধু ম্যাট্রেস নয়, মৃতদেহ ও আহতদের বের করে আনতে দোকান থেকে নতুন বিছানার চাদর, লেপের কভারও দিয়ে দিয়েছি। এটা আমাদের কর্তব্য ছিল।’

একই সুর শোনা গেল অন্য সাহায্যকারী মহম্মদ আফজলের গলাতেও। তিনি জানান, বুধবার সকালে হঠাৎ খবর পাই ওই হোটেলে বীভৎস আগুন লেগে গিয়েছে। তার পরেও মহম্মদ আফজল ও তাঁর ভাই সেখানে সঙ্গে সঙ্গে পৌঁছয়। আফজল বলেন, ‘সেখানে পৌঁছে আগে আরমানদের সঙ্গে হাত লাগিয়ে তোশকগুলো রাস্তায় বিছিয়ে দিই। ভিতরে আটকে পড়া মানুষ যাতে বেরোতে পারেন তার জন্য কাচ ভেঙে দিয়েছিলাম।’

এখানেই শেষ নয়, প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আফজল ও তাঁর ভাই উপরের তলা থেকে জানলা বেয়ে অনেককে নামিয়ে আনেন। কাউকে CPR দিয়ে সুস্থ করতেও দেখা যায় এই সাহায্যকারীদের। ম্যাক্স হাসপাতালে কর্মরত ওয়াসিম রাজা বলেন, জরুরি অবস্থার সময়ে তাঁর পেশাগত প্রশিক্ষণ কাজে লাগিয়ে অনেককেই প্রাথমিক ভাবে সুস্থ করে তোলেন।

কোনও প্রয়োজনীয় সামগ্রী ছাড়া যে ভাবে এই পাঁচ জন বুধবার ওই অগ্নিকাণ্ডের সময়ে সাধারণকে বাঁচাতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, সেই প্রচেষ্টা সত্যিই প্রশংসনীয়। অনেকে তাঁদের সম্মানিত করার ও বিশেষ ভাবে পুরস্কার দেওয়ারও দাবি তুলেছেন। কারও পরামর্শ চাঁদা তুলে আরমান ভাইদের ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়া উচিত। তবে এক বাক্যে পুলিশ প্রশাসন থেকে প্রত্যক্ষদর্শী সবাই স্বীকার করেছেন, ওঁরা না থাকলে ফ্লারিস স্টে-এর ওই অগ্নিকাণ্ডে হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়ত।

উল্লেখ্য, দিল্লির মালব্য নগরের এই হোটেলে মর্মান্তিক ভাবে অগ্নিদগ্ধ ও শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মৃত্যু হয়েছে ২১ জনের। যাঁদের মধ্যে ১২ জনই বিদেশি। আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন প্রায় ৪০ জন। তাঁদের মধ্যে অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক। গ্রেপ্তার করা হয়েছে ওই হোটেল মালিককে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *