বরাক তরঙ্গ, ২১ জুলাই : গুরুচরণ বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের উদ্যোগে মঙ্গলবার যথাযোগ্য মর্যাদায় ৪০তম শহিদ জগন-যীশু (দিব্যেন্দু দাস ও জগন্ময় দেব) আত্মবলিদান দিবস পালিত হয়। অনুষ্ঠানের প্রথম পর্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহিদ বেদির সামনে জগন-যীশুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক নিরঞ্জন রায়, নিবন্ধক ড. বিদ্যুৎকান্তি পাল, শৈক্ষিক নিবন্ধক ড. অভিজিৎ নাথ, আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক বিশ্বতোষ চৌধুরী, কাছাড় কলেজের ইংরেজি বিভাগের প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান সন্তোষ চক্রবর্তী, বিত্ত আধিকারিক রণবিজয় দাস সহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের অধ্যাপক অধ্যাপিকা ও ছাত্রছাত্রীরা।
পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত স্মরণসভায় উপস্থিত বিশিষ্ট অতিথিদের উত্তরীয় পরিয়ে বরণ করে নেওয়া হয়। সভায় স্বাগত বক্তব্য রাখতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শৈক্ষিক নিবন্ধক ডঃ অভিজিৎ নাথ বলেন, ১৯ কে ৫ জ্যৈষ্ঠ হিসেবেও স্মরণ করা উচিত। একইভাবে ১৯৮৬ সালের ভাষা আন্দোলনের দিনটিও বাংলা তারিখ অনুসারে পালনের উপর তিনি গুরুত্ব আরোপ করে বলেন, এদিন কেবল বরাক উপত্যকার ভাষা শহিদদের নয়, সমগ্র ভারতের যাঁরা মাতৃভাষার জন্য প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন, তাঁদের সকলকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা উচিত। একই সঙ্গে তিনি পৃথিবীর সকল মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তিনি উল্লেখ করেন, এ বছর জগন-যীশুর ৪০তম আত্মবলিদান দিবস পালিত হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ডঃ বিদ্যুৎ কান্তি পাল দিবসটির ঐতিহাসিক তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে বলেন, প্রত্যেক মানুষের মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া উচিত এবং ভাষার মর্যাদা রক্ষায় সকলের সচেতন থাকা প্রয়োজন।
আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক বিশ্বতোষ চৌধুরী বলেন আমাদের কৃষ্টি, সভ্যতা ও অস্তিত্ব সবকিছুর ভিত্তি আমাদের মাতৃভাষা। জাতীয় চেতনাও মাতৃভাষার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তিনি স্মরণ করেন, কীভাবে দীর্ঘদিন চাপা পড়ে থাকা ১৯৬১ সালের ভাষা-সার্কুলারের বিষয়টি পুনরায় সামনে আসে। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, অসমীয়া ভাষা বা অন্য কোনো ভাষা এবং সেই ভাষাভাষী মানুষের সঙ্গে বরাক উপত্যকার মানুষের কোনো বিরোধ নেই। তিনি পৃথিবীর প্রথম মহিলা মাতৃভাষা সেনানী শহিদ কমলা ভট্টাচার্যকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, এই দিনটি আত্মসমীক্ষারও দিন। ইংরেজি ভাষার সঙ্গে কোনো বিরোধ নেই; বিরোধ হওয়া উচিত ইংরেজিয়ানা মানসিকতার বিরুদ্ধে, ইংরেজি ভাষার বিরুদ্ধে নয়।
প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কাছাড় কলেজের ইংরেজি বিভাগের প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান সন্তোষ চক্রবর্তী। তিনি বলেন, ভাষা ও সংস্কৃতিকে কীভাবে রক্ষা করতে হয়, সে বিষয়ে আমাদের সচেতন হতে হবে। পৃথিবীর প্রতিটি ভাষার প্রতি সমান শ্রদ্ধাবোধ থাকা প্রয়োজন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে যেন ভাষা শহিদদের তালিকা আর দীর্ঘায়িত না হয়।
সভায় সভাপতির বক্তব্যে উপাচার্য অধ্যাপক নিরঞ্জন রায় ভাষা শহিদদের আত্মার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এবং ১৯৮৬ সালের ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিচারণ করেন। তিনি বলেন, কীভাবে তৎকালীন সময়ে বরাক উপত্যকায় তৃতীয় ভাষা হিসেবে অসমীয়া চাপিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল এবং সেই প্রেক্ষাপটে ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে। তিনি জানান, সে সময় তিনি শিক্ষা সংরক্ষণ সমিতির একজন স্বেচ্ছাসেবক ছিলেন। সমিতির সিদ্ধান্ত ছিল সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণভাবে কালো পতাকা প্রদর্শনের মাধ্যমে প্রতিবাদ জানানো হবে। কিন্তু সেই শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের ওপরই গুলিবর্ষণ করা হয়। তিনি সেদিনের ঘটনাবলির বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেন। সেই সঙ্গে জাতীয় শিক্ষা নীতিতে মাতৃভাষার উপর যে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে তা উল্লেখ করেন।
সম্পূর্ণ অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন ডঃ উত্তম পালুয়া



