।। ধর্মানন্দ দেব ।।
(লেখক, আইনজীবী)
-: আমার চোখে দুর্গাপূজা :-
১৮ অক্টোবর : এখনও বাতাসে হিমের ছোঁয়া সেভাবে লাগেনি। তবে কাশফুলের দোলা আর গাছ থেকে টুপটুপ করে ঝরে পড়া শিউলির দল জানান দিচ্ছিল, মা আসছেন। অপেক্ষার অবসান। আজ মহাসপ্তমী। আলোর জোয়ারে ভাসছে চরাচর। অশুভ শক্তির বিনাশে মাতৃশক্তির আরাধনায় মেতেছে আপামর বাঙালি। শিলচর শহরও সেজে উঠেছে উৎসবের রঙে। নতুন পোশাকের উচ্ছ্বাস, ঢাকের বাদ্যি, ধূপের ধোঁয়া, মণ্ডপে মণ্ডপে মানুষের ঢল আর প্রিয়জনের হাত ধরে ঠাকুর দেখার আনন্দে মুখর চারপাশ। কিন্তু এই উৎসবের আলোর আড়ালেই রয়ে গিয়েছেন এমন কিছু মানুষ, যাঁদের নিজেদের পুজোর আনন্দটুকুও অনেক সময় অন্যের জন্য তুলে রাখতে হয়। তাঁরা খাবার ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া ডেলিভারি কর্মী। অন্যের ঘরে পুজোর আনন্দ পৌঁছে দিতে যাঁরা ছুটে চলেন, অথচ নিজের ঘরের আনন্দে সামিল হওয়ার সময়টুকু খুঁজে পান না।
শহরের কোনও মণ্ডপে যখন ঢাকের তালে ধুনুচি নাচ শুরু হয়, কোনও পরিবারের ছোট্ট শিশুটি যখন নতুন জামা পরে বাবার হাত ধরে ঠাকুর দেখতে বেরোয়, তখন হয়তো শিলচরেরই কোনও ব্যস্ত রাস্তায় বাইকের হ্যান্ডেল শক্ত করে ধরে ছুটছেন এক ডেলিভারি কর্মী। তাঁর মোবাইলে ভেসে উঠছে পরবর্তী অর্ডারের সংকেত। এক জায়গা থেকে খাবার সংগ্রহ করে অন্য জায়গায় পৌঁছে দিতে হবে। যানজট, রাস্তার ভিড়, ড্রপ গেট, গ্রাহকের ফোন- সবকিছুর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটতে হচ্ছে তাঁকে। কারণ, একটি ডেলিভারি শেষ হলেই পরবর্তী উপার্জনের সম্ভাবনা। আর একটু বেশি কাজ করলে হয়তো মিলবে ইনসেনটিভ। সেই বাড়তি টাকাটুকুই সংসারের বাজার, সন্তানের পড়াশোনা কিংবা পরিবারের কোনও প্রয়োজন মেটাতে কাজে লাগবে।

আমরা যখন প্যান্ডেল ঘুরে ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরি, তখন রাতের খাবার রান্না করার ঝক্কি এড়াতে মোবাইলের পর্দায় কয়েকটি ক্লিকেই রেস্তোরাঁর খাবার অর্ডার করি। কিছুক্ষণের মধ্যেই দরজায় কড়া নাড়েন একজন ডেলিভারি কর্মী। খাবারের প্যাকেটটি হাতে নিয়ে আমরা হয়তো ধন্যবাদ জানাই, কখনও হয়তো তাড়াতাড়ি চলে যেতে বলি। কিন্তু একবারও কি জানতে ইচ্ছে করে, মানুষটি সারাদিন কোথায় কোথায় ছুটেছেন? তাঁরও কি নতুন পোশাক কেনা হয়েছে? তাঁর বাড়িতেও কি কেউ অপেক্ষা করছেন? তাঁর সন্তান কি বাবার হাত ধরে প্যান্ডেলে যাওয়ার বায়না ধরেছে? তাঁর স্ত্রী কি সারাদিনের কাজ শেষে স্বামীর সঙ্গে একটু সময় কাটানোর অপেক্ষায় রয়েছেন?
হয়তো সেই মানুষটিরও নতুন জামা কেনা হয়েছে। পরিবারের সঙ্গে ঠাকুর দেখার পরিকল্পনাও ছিল। স্ত্রী হয়তো ভেবেছিলেন, সন্ধ্যার পর কাজ শেষ করে স্বামী বাড়ি ফিরবেন, তারপর দুজনে বেরিয়ে পড়বেন আলোর সাজে সজ্জিত শহরের পথে। কিন্তু অর্ডারের পর অর্ডার জমতে থাকে। বাড়তি আয়ের হাতছানি তাঁকে ফিরতে দেয় না। এদিকে সময় যত গড়ায়, পরিবারের অপেক্ষাও তত দীর্ঘ হয়। নতুন জামা পরে সন্তানের চোখের আনন্দ হয়তো ধীরে ধীরে অভিমানে বদলে যায়। স্ত্রীর মুখেও জমে ওঠে নীরব মনখারাপ। আর যিনি রাস্তায় ছুটে চলেছেন, তিনিও জানেন, বাড়িতে কেউ তাঁর জন্য অপেক্ষা করছেন। তবু বাইক থামাতে পারেন না। কারণ, ভালোবাসা দিয়ে সংসার চলে, কিন্তু সংসারের খরচ মেটাতে অর্থও প্রয়োজন।
সবচেয়ে কষ্টের জায়গাটি বোধহয় এখানেই। পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর জন্যই মানুষটি নিজের আনন্দকে পিছনে সরিয়ে রাখেন। সন্তানের মুখে ভালো খাবার তুলে দেওয়ার জন্যই অন্যের বাড়িতে খাবার পৌঁছে দেন। পরিবারের প্রয়োজন মেটানোর জন্যই উৎসবের দিনে নিজের বিশ্রামটুকু বিসর্জন দেন। অথচ সেই ত্যাগের কোনও ঢাক বাজে না, কোনও মণ্ডপে তাঁর নামে আলোর মালা জ্বলে না। তাঁর পরিশ্রমের হিসাব থাকে অ্যাপে, তাঁর উপার্জনের হিসাব থাকে প্রতিটি ডেলিভারিতে; কিন্তু পরিবারের সঙ্গে হারিয়ে যাওয়া মুহূর্তগুলির হিসাব কোথাও লেখা থাকে না।
পুজো তো শুধু দেবীর আরাধনা নয়, পুজো ভালোবাসার, একসঙ্গে থাকার, প্রিয়জনের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার উৎসব। সেই উৎসবেই যদি কোনও বাবা সন্তানের হাত ধরে ঠাকুর দেখতে না পারেন, কোনও স্বামী স্ত্রীর সঙ্গে একটু নির্ভার সময় কাটাতে না পারেন, কোনও শ্রমজীবী মানুষ সারাদিনের ক্লান্তি ভুলে একবেলা বিশ্রাম নিতে না পারেন, তবে আমাদের উৎসবের আনন্দের ছবিটা কি কোথাও অসম্পূর্ণ থেকে যায় না?

এই মানুষগুলির প্রতি আমাদের করুণা নয়, প্রয়োজন সম্মান ও সংবেদনশীলতা। তাঁরা দয়ার পাত্র নন; তাঁরা পরিশ্রমী মানুষ, যাঁদের শ্রমের উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে আমাদের দ্রুত পরিষেবা পাওয়ার অভ্যাস। অর্ডার দিতে গিয়ে অযথা তাড়াহুড়ো না করা, যানজটের মধ্যে সামান্য দেরি হলে রূঢ় আচরণ না করা, তাঁদের নিরাপত্তার কথা ভাবা এবং তাঁদের কাজের মর্যাদা দেওয়া- এগুলি কোনও অসাধারণ মানবিকতার পরিচয় নয়, বরং ন্যূনতম সামাজিক দায়িত্ব। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলিরও ভাবা উচিত, উৎসবের বাড়তি চাহিদা মেটাতে গিয়ে কর্মীদের উপর যেন অসহনীয় চাপ না পড়ে এবং তাঁদের বিশ্রাম ও নিরাপত্তা যেন অবহেলিত না হয়।
শিলচর শহরকে আমরা ভালোবাসি। এই শহরের উৎসব, ঐতিহ্য, সম্প্রীতি এবং মানুষের আন্তরিকতা নিয়ে আমাদের গর্ব। কিন্তু শহরের সৌন্দর্য কেবল আলোর মালা, বিশাল মণ্ডপ কিংবা প্রতিমার অলংকারে সীমাবদ্ধ নয়। শহরের প্রকৃত সৌন্দর্য প্রকাশ পায় তার মানুষের প্রতি মানুষের আচরণে। যে শহর নিজের শ্রমজীবী মানুষদের কষ্ট বুঝতে শেখে, যে সমাজ অন্যের আনন্দের পিছনে থাকা অদৃশ্য পরিশ্রমকে সম্মান করে, সেই শহরই সত্যিকারের উৎসবের অর্থ উপলব্ধি করতে পারে।
এবার পুজোয় যখন আমরা নতুন পোশাক পরে পরিবারের সঙ্গে ঠাকুর দেখতে বেরোব, তখন একবার মনে করি সেই মানুষটির কথা, যিনি হয়তো আমাদের বাড়িতে খাবার পৌঁছে দিয়ে আবার ছুটে যাবেন পরবর্তী অর্ডার নিয়ে। তাঁরও বাড়িতে হয়তো নতুন পোশাক পরে বসে আছে ছোট্ট সন্তান। বারবার দরজার দিকে তাকিয়ে সে ভাবছে, বাবা কখন ফিরবে? হয়তো স্ত্রী ফোন করে জানতে চাইবেন, আর কতক্ষণ লাগবে? আর ওপাশ থেকে ক্লান্ত কণ্ঠে উত্তর আসবে, ‘আর একটু দেরি হবে।’
এই ‘আর একটু দেরি’র মধ্যেই হয়তো কেটে যাবে তাঁর মহাসপ্তমী, মহাষ্টমী কিংবা নবমীর সন্ধ্যা। মণ্ডপের আলো নিভে যাবে, ঢাকের আওয়াজ থেমে আসবে, মানুষের ভিড় কমে যাবে। তারপর কোনও এক গভীর রাতে তিনি বাড়ি ফিরবেন। শরীর ক্লান্ত, চোখে অবসাদ, অথচ মনে হয়তো একটাই সান্ত্বনা- আজ একটু বেশি আয় হয়েছে, সংসারের কাজে লাগবে।
কিন্তু সেই উপার্জনের হিসাবের পাশে যে কয়েকটি হারিয়ে যাওয়া মুহূর্ত জমা হয়, তার মূল্য কি কোনও ইনসেনটিভ দিয়ে মেটানো সম্ভব?
মা দুর্গা অশুভ শক্তির বিনাশের প্রতীক। তাঁর আরাধনার এই দিনে আমাদের নিজেদের ভিতরের উদাসীনতা, অসংবেদনশীলতা আর অন্যের কষ্ট না বোঝার প্রবণতার বিরুদ্ধেও লড়াই করা প্রয়োজন। কারণ, মানুষের প্রতি মমতা ছাড়া কোনও উৎসবই পূর্ণতা পায় না।
এই পুজোয় আমাদের প্রার্থনা হোক, অন্যের ঘরে আনন্দ পৌঁছে দেওয়া মানুষগুলির ঘরেও যেন আনন্দ পৌঁছয়। তাঁদের সন্তানদের অপেক্ষা যেন দীর্ঘশ্বাসে পরিণত না হয়, তাঁদের পরিবারের হাসি যেন উপার্জনের তাগিদে বারবার পিছিয়ে না যায়। তাঁরা যেন অন্তত কিছুটা সময় পান নিজেদের প্রিয়জনদের পাশে বসার, নতুন পোশাক পরে একসঙ্গে ঠাকুর দেখার, কিংবা নিশ্চিন্তে একবেলা খাবার খাওয়ার।
নাগরিক হিসেবে আমাদেরও কিছু দায়িত্ব রয়েছে। এই পুজোয় ডেলিভারি কর্মীদের অর্ডার দেওয়ার সময় বাস্তবসম্মত সময়সীমা মেনে চলুন, সামান্য দেরি হলে অযথা চাপ সৃষ্টি করবেন না, ফোনে দুর্ব্যবহার করবেন না এবং যানজটের মধ্যে দ্রুত পৌঁছনোর জন্য তাঁদের ঝুঁকি নিতে বাধ্য করবেন না। সম্ভব হলে অর্ডার এমন সময়ে দিন, যাতে কর্মীদের উপর অপ্রয়োজনীয় তাড়াহুড়োর চাপ না পড়ে। রাস্তায় তাঁদের দেখলে মনে রাখুন, তাঁরাও আমাদের মতোই কোনও পরিবারের সদস্য, কারও সন্তান, কারও স্বামী, কারও বাবা। একই সঙ্গে ডেলিভারি সংস্থাগুলির কাছে দাবি উঠুক, উৎসবের সময়ে কর্মীদের নিরাপত্তা, ন্যায্য পারিশ্রমিক, বিশ্রাম এবং স্বচ্ছ ইনসেনটিভ নীতি নিশ্চিত করা হোক।
শিলচরের নাগরিক হিসেবে আমরা অন্তত এটুকু করতে পারি, যাতে আমাদের আনন্দের জন্য অন্য কাউকে নিজের নিরাপত্তা বিসর্জন দিতে না হয়। কারণ, পুজো শুধু নিজের পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর নাম নয়; অন্যের জীবনেও একটু স্বস্তি, সম্মান ও আনন্দের জায়গা তৈরি করার নাম।
অন্যের পুজো আনন্দময় করতে গিয়ে যাঁদের নিজেদের পুজোই পরবাসে কাটে, তাঁদের চোখের জল না বুঝলে আমাদের উৎসবের আলোও কোথাও যেন ম্লান থেকে যায়। এই পুজোয় আসুন, শুধু খাবার নয়, ডেলিভারি কর্মীদের প্রতিও পৌঁছে দিই সম্মান, সহমর্মিতা ও মানবিকতা।



