।। বিধায়ক দাশ পুরকায়স্থ ।।
একষট্টির উনিশ
আজ ভরা যৌবনে পঁয়ষট্টি।
সময়ের কপালে জমেছে বহু ধুলো,
বহু ইতিহাস চাপা পড়েছে
রাজনীতি, ভয় আর আপসের স্তূপে।
তবু প্রতি নতুন চাঁদের রাতে
এক অস্থির আত্মঅন্বেষণ
আবার ফিরে আসে—
আমরা কারা?
কোথায় আমাদের শিকড়?
কোন রক্তস্মৃতি আজও
অন্তর্গত আগুন হয়ে জ্বলে?
বরাকের বাঙালির ঘরে-বাইরে
রক্তমাখা উনিশ আজও ঘুরে বেড়ায়—
নিস্তব্ধ দুপুরে,
বিষণ্ণ সন্ধ্যায়,
মিছিলভাঙা রাস্তায়,
শহিদের নামলেখা স্মৃতিফলকে,
মায়ের কান্নায়,
বৃদ্ধ পিতার নীরব দীর্ঘশ্বাসে,
অপমানিত ভাষার আর্তনাদে।
কিন্তু শুধুই বরাকে।
তার লেলিহান অগ্নিশিখা
আজও সম্পূর্ণ ছুঁতে পারেনি
ব্রহ্মপুত্রের বাঙালির দেহমন।
ছাইয়ের নীচে জ্বলতে থাকা
সেই অমর প্রতিজ্ঞার শিখা
জাগিয়ে তুলতে পারেনি
সমস্ত আসাম জুড়ে ছড়িয়ে থাকা
বঙ্গসন্তানের রুদ্ধ আত্মপরিচয়।
তাই আজও আসামের বাঙালি
হাজার কণ্ঠে, এক প্রাণে,
গেয়ে উঠতে পারেনি
তোমার জয়ের গান।
বাঙালি সেদিনও ছিল—
আজও আছে—
কিন্তু ইতিহাসের নির্মম চক্রান্তে
সে বিভক্ত, বিচ্ছিন্ন, পরস্পর থেকে দূরবর্তী।
একই ভাষা,
একই রক্তস্মৃতি,
একই সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার—
তবু কত অনাস্থা,
কত দ্বিধা,
কত কৃত্রিম বিভাজন!
কেন এমন হলো?
তোমার তো কোনো একক রঙ ছিল না।
তুমি ছিলে সহাবস্থানের প্রতীক,
বহুত্বের দীপ্ত সম্মিলন।
তোমার মিশ্রিত রঙের নাম ছিল—
“বাংলা”।
যেদিন আকাশ কেঁপে উঠেছিল
“জান দেব, জবান দেব না”—
এই বজ্রশপথে,
সেদিন পথে নেমেছিল
আবালবৃদ্ধবনিতা।
কারও হাতে অস্ত্র ছিল না,
ছিল শুধু মাতৃভাষার প্রতি
অসীম ভালোবাসা,
অস্তিত্ব রক্ষার দুর্জয় সাহস।
তোমাদের আত্মাহুতি ছিল
মায়ের জন্য,
মাতৃভাষার জন্য,
নিজস্ব সত্তার জন্য।
রক্তে লেখা হয়েছিল
আসামের বুকে বাঙালির অস্তিত্বের দলিল।
তবু কেন আজও
এক সুরে বাঁধা পড়ে না
বরাক ও ব্রহ্মপুত্রের বঙ্গসন্তান?
কেন ব্রহ্মপুত্রের বঙ্গসন্তানেরা
আজও সান্ধ্যপ্রদীপের পাশে
একাদশ প্রদীপ জ্বালিয়ে
একাদশ শহিদের স্মৃতিতে
নতশির শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করে উঠতে পারে না?
কেন এখনো তাদের ঘরের আলোয়
জেগে ওঠে না
উনিশের রক্তঋণের স্মৃতি?
কেন ইতিহাসের সেই অগ্নিদিবস
আজও তাদের চেতনায়
সম্পূর্ণ দীপশিখা হয়ে জ্বলে না?
কেন আজও কেউ কেউ
নির্লজ্জ উদাসীনতায় বলে—
“উনিশ? আমরা জানি না!”
কেন স্মৃতিহীনতার এই অন্ধকার?
কেন আত্মবিস্মৃতির এই লজ্জা?
হায়, আজ আমরা ব্যর্থ।
সুযোগসন্ধানীরা শক্তিশালী,
নীতিহীন আপস আজ মজ্জাগত,
প্রতিবাদের আগুনকে
বারবার নিভিয়ে দেওয়া হয়েছে
স্বার্থের স্যাঁতসেঁতে জলে।
তবু না—
সব শেষ হয়ে যায়নি।
আজও কিছু কণ্ঠ
অন্ধকার চিরে উচ্চারণ করে-
হারব আমরা,
কিন্তু হার মানব না।
কারণ ইতিহাস কখনও
চিরকাল পরাজিতদের কবরস্থানে ঘুমিয়ে থাকে না।
রক্তের ঋণ একদিন
অবশ্যই জেগে ওঠে।
বিভাবরীর অবসান হবে,
সূর্য উঠবেই—
আজ না হয় কাল,
কাল না হয় অন্য কোনো প্রজন্মের প্রভাতে।
সেদিন বরাক, ব্রহ্মপুত্র, গঙ্গার বুকে
ভেসে উঠবে লক্ষ প্রদীপের ভেলা।
দিগন্তজোড়া আলোর শিখায়
আবার উচ্চারিত হবে
একাদশ শহিদের নাম।
আর সেই দীপ্ত মুহূর্তে
আসামের বাঙালি
নিজের ভাঙা আয়নায়
আবার খুঁজে পাবে
নিজের মুখ,
নিজের ইতিহাস,
নিজের আত্মা।।



