রাজীব মজুমদার, ধলাই।
বরাক তরঙ্গ, ২৫ জুন : সন্তানের ভবিষ্যতের কাছে হার মানল মায়ের চোখের জল। একদিকে শরীরজুড়ে নির্যাতনের ক্ষতচিহ্ন, অন্যদিকে সন্তানের ভবিষ্যতের চিন্তা এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে এক মায়ের সিদ্ধান্ত যেন আবারও মনে করিয়ে দিল মাতৃত্ব অনেক সময় নিজের কষ্ট, অপমান আর যন্ত্রণা থেকেও বড় হয়ে ওঠে।
ধলাইয়ের কাবুগঞ্জ এলাকায় বৃহস্পতিবার ঘটে যাওয়া এক ঘটনা গোটা এলাকাকে নাড়া দিয়ে গেছে। অভিযোগ, ৩০৬ নম্বর শিলচর–আইজল জাতীয় সড়কের ওপর প্রকাশ্য দিবালোকে এক গৃহবধূকে মারধর করেন তাঁর স্বামী। অসহায় নারীর আর্তচিৎকার শুনে ছুটে আসেন স্থানীয় মানুষ। তাঁদের হস্তক্ষেপেই রক্ষা পান ওই মহিলা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, হাইলাকান্দির লালা চন্দ্রপুর এলাকার বাসিন্দা ফরজানা বেগম চৌধুরীর প্রায় চার বছর আগে ধলাইয়ের ভাগা বাজারের রাজঘাট এলাকার সইফ উদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে বিবাহ হয়। পরিবারের দাবি, বিয়ের পর থেকেই বিভিন্ন সময়ে তাঁকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মুখোমুখি হতে হয়েছে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে লালা থেকে বাড়ি ফেরার পথে টাকা হারিয়ে যাওয়াকে কেন্দ্র করে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বাগ্বিতণ্ডার সৃষ্টি হয়। অভিযোগ, একপর্যায়ে জাতীয় সড়কের ওপর গাড়ি থামিয়ে স্ত্রীকে মারধর করা হয়। ঘটনাটি দেখতে পেয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা এগিয়ে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আটক করে ধলাই পুলিশের হাতে তুলে দেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, মহিলার শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন ছিল। দীর্ঘদিনের মানসিক ও শারীরিক চাপের ছাপও স্পষ্ট ছিল তাঁর মধ্যে।
তবে ঘটনার সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী দিক ছিল অন্যত্র। এত কিছুর পরও ফরজানা বেগম স্বামীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে মত দেননি। সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে তিনি সংসার টিকিয়ে রাখার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন বলে জানা গেছে।
একজন মা হয়তো নিজের কষ্টকে লুকিয়ে রাখতে পারেন, নিজের চোখের জল মুছে ফেলতে পারেন; কিন্তু সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর উদ্বেগ কখনও থামে না। সেই অনুভূতির প্রতিফলনই যেন দেখা গেল এই ঘটনায়।
তবে সমাজের একাংশের প্রশ্ন, একটি শিশুর সুস্থ ও সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য কি শুধুই সংসার টিকিয়ে রাখা যথেষ্ট, নাকি প্রয়োজন একটি নিরাপদ, সম্মানজনক ও সহিংসতামুক্ত পারিবারিক পরিবেশ?
ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে ধলাই পুলিশ। কিন্তু এই ঘটনার মধ্য দিয়ে আবারও সামনে এসেছে পারিবারিক সহিংসতার কঠিন বাস্তবতা এবং একজন মায়ের সীমাহীন ত্যাগ, সহনশীলতা ও সন্তানের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসার এক নীরব গল্প।



