বরাক তরঙ্গ, ১৭ মে : ভাষা শহিদদের স্মৃতিকে হৃদয়ে ধারণ করে, সাহিত্য ও সংস্কৃতির সৌরভে মুখর হয়ে উঠল শিলচরের আশ্রম রোড। কবিতা, গান, আবৃত্তি ও সাহিত্যচর্চার আবেগঘন পরিবেশে উন্মোচিত হলো সমাজ ও সাহিত্য বিষয়ক ছোট কাগজ ‘প্রতাপ’-এর ১৯তম মুদ্রিত সংখ্যা। নবীন ও প্রবীণ সাহিত্যিকদের মিলনমেলায় পরিণত হওয়া এই আয়োজন যেন বরাক উপত্যকার সাহিত্যচর্চার এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি হয়ে ধরা দিল। ভাষা শহিদ দিবসের আবেগঘন প্রেক্ষাপটে, সাহিত্য ও সংস্কৃতির এক অপূর্ব মিলনমেলায় উন্মোচিত হলো সমাজ ও সাহিত্য বিষয়ক ছোট কাগজ ‘প্রতাপ’-এর ১৯তম মুদ্রিত সংখ্যা। বরাক উপত্যকার সাহিত্যচর্চার ধারাকে দীর্ঘদিন ধরে সমৃদ্ধ করে চলা এই সাহিত্যপত্রিকার নতুন সংখ্যার প্রকাশ উপলক্ষে রবিবার এক বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানটি কার্যত এক প্রাণবন্ত সাহিত্য উৎসবে পরিণত হয়, যেখানে সাহিত্যপ্রেমী, কবি, লেখক, শিক্ষক, সমাজকর্মী ও সংস্কৃতিমনস্ক মানুষের মিলনে মুখর হয়ে ওঠে পুরো প্রাঙ্গণ। দীর্ঘ প্রায় দেড় দশক ধরে কবি-শিক্ষক শৈলেন দাসের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়ে আসছে ‘প্রতাপ’। নবীন ও প্রবীণ সাহিত্যিকদের সৃষ্টিশীল ভাবনাকে একত্রিত করে এই সাহিত্যপত্রিকা বরাক উপত্যকার সাহিত্যাঙ্গনে একটি স্বতন্ত্র পরিচিতি গড়ে তুলেছে। সমাজচেতনা, মানবিক মূল্যবোধ, ভাষা-সংস্কৃতির ঐতিহ্য এবং সৃজনশীল সাহিত্যচর্চাকে কেন্দ্র করে ‘প্রতাপ’ ধারাবাহিকভাবে সাহিত্যপ্রেমীদের হৃদয়ে বিশেষ স্থান অধিকার করে চলেছে।

এবারের বিশেষ সংখ্যায় স্থান পেয়েছে প্রকৃতির নবজাগরণ, বাংলা নববর্ষের আগমনী বার্তা, পঁচিশে বৈশাখের চেতনা এবং উনিশে মে ভাষা শহীদদের অমর আত্মত্যাগকে ঘিরে লেখা কবিতা, প্রবন্ধ ও বিভিন্ন সাহিত্যধর্মী রচনা। ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি ও বাঙালির আত্মপরিচয়ের চেতনাকে সামনে রেখে সাজানো এই সংখ্যাটি সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে বিশেষ তাৎপর্য বহন করবে বলে মত প্রকাশ করেন উপস্থিত অতিথিবৃন্দ। এই বিশেষ সংখ্যার আনুষ্ঠানিক উন্মোচন করেন শিক্ষক কালীপদ দাস, বিশিষ্ট আইনজীবী বীরুরঞ্জন নাথ, কবি পরিমল কর্মকার, মৌসুমী চক্রবর্তী এবং রঞ্জনকুমার বনিক। তাঁদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানের মর্যাদা আরও বৃদ্ধি পায়। অনুষ্ঠানের সূচনা হয় যুব কবি সুরজ কুমার নাথের সুমধুর উদ্বোধনী সংগীতের মাধ্যমে। তাঁর সংগীত পরিবেশনা উপস্থিত শ্রোতাদের মধ্যে এক আবেগঘন পরিবেশ সৃষ্টি করে। এরপর শুরু হয় সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চাকে ঘিরে আলোচনা, কবিতা পাঠ এবং সম্মাননা প্রদান পর্ব।
অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ‘বিশিষ্ট গুণীজন’ সম্মাননা প্রদান। নিজস্ব সাহিত্যসাধনা এবং দীর্ঘদিন ধরে ‘প্রতাপ’-এর অগ্রযাত্রায় বিশেষ সহযোগিতার স্বীকৃতিস্বরূপ বিশিষ্ট কবি চন্দ্রিমা দত্তকে এই সম্মাননায় ভূষিত করা হয়। সম্মাননা গ্রহণের পর তিনি সাহিত্যচর্চার গুরুত্ব ও বর্তমান সময়ে ছোট কাগজের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্য রাখেন। পাশাপাশি সাহিত্য ও সংস্কৃতির ধারাকে বাঁচিয়ে রাখতে নবীন প্রজন্মকে আরও বেশি করে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
এছাড়াও সাহিত্যচর্চায় সৃজনশীল অবদান এবং ‘প্রতাপ’-এর পথচলায় নিরন্তর সহযোগিতার স্বীকৃতিস্বরূপ মোট বত্রিশ জন কবি-লেখক, সাহিত্যপ্রেমী ও বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বকে সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হয়। সম্মাননা প্রাপ্তদের মুখে আনন্দ ও আবেগের বহিঃপ্রকাশ অনুষ্ঠানটিকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।
অনুষ্ঠানে বরাক উপত্যকার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত কবি-লেখকদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। তাঁদের আবেগময় কবিতা পাঠে মুগ্ধ হয়ে যান উপস্থিত সাহিত্যপ্রেমীরা। কবিতা পাঠ ও সাহিত্য পরিবেশনায় অংশগ্রহণ করেন রঞ্জনকুমার বনিক, রাখি দাস, সুরঞ্জিত নমঃশূদ্র, সদয় দাস, অপর্ণা কুমার, সুস্মিতা দাসচৌধুরী, কাত্যায়নী দত্ত চৌধুরী, রুপালি দাস, সুরজকুমার নাথ, মীনাক্ষী নাথ এবং প্রতীক চক্রবর্তী প্রমুখ। তাঁদের পরিবেশনায় ভাষা, প্রেম, প্রকৃতি, সমাজচেতনা ও মানবিক মূল্যবোধের নানা দিক জীবন্ত হয়ে ওঠে।
এছাড়াও অনুষ্ঠানে সাহিত্য বিষয়ক তাৎপর্যপূর্ণ আলোচনা করেন বিশিষ্ট কবি চন্দ্রিমা দত্ত, সুমঙ্গল দাস, পরিমল কর্মকার, শিক্ষক কালীপদ দাস, আইনজীবী বীরুরঞ্জন নাথ, সুবীর চন্দ্র দাস এবং সমাজকর্মী হেমেন্দ্র চন্দ্র দাস। বক্তারা বলেন, বর্তমান সময়ে সাহিত্য ও সংস্কৃতির চর্চা সমাজকে মানবিক মূল্যবোধের পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তাঁরা বরাক উপত্যকার সাহিত্য ও সংস্কৃতির ঐতিহ্যকে আরও সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে ‘প্রতাপ’-এর ভবিষ্যৎ পথচলায় সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানের পুরো পরিবেশ জুড়ে ছিল ভাষা শহিদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা, সাহিত্যসাধনার প্রতি ভালোবাসা এবং সংস্কৃতির প্রতি এক আন্তরিক টান। সৃজনশীলতার দীপ্তি ও সাহিত্যিক আবেগে ভরপুর এই আয়োজন শেষ পর্যন্ত এক প্রাণবন্ত সাহিত্য মিলনমেলায় রূপ নেয়, যা উপস্থিত সকলের মনে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
সজলকান্তি দাস, হেমেন্দ্রচন্দ্র দাস, সুবীর চৌধুরী ও শ্রেয়ান দাসের সার্বিক সহযোগিতায় পুরো অনুষ্ঠানটি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করেন ‘প্রতাপ’ পত্রিকার সম্পাদক শিক্ষক শৈলেন দাস। অনুষ্ঠানের সফল আয়োজনের জন্য উপস্থিত অতিথি ও সাহিত্যপ্রেমীরা আয়োজকদের আন্তরিক ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা জানান।



