বরাক তরঙ্গ, ১৭ মে : ১৯৬১ সালের ঐতিহাসিক বাংলা ভাষা আন্দোলনের সর্বাধিনায়ক এবং ‘গণসংগ্রাম পরিষদ’-এর অন্যতম প্রধান নেতা ছিলেন পরিতোষ পাল চৌধুরী। মাতৃভাষার অধিকার রক্ষায় এবং পরবর্তীকালে বরাক উপত্যকার উন্নয়নের জন্য তিনি আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন। বাংলা ভাষা আন্দোলনের সর্বাধিনায়ক পরিতোষ পাল চৌধুরীকে যেভাবে মূল্যায়ন করার কথা ছিল, সেভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। তাই ভাষা আন্দোলনের সর্বাধিনায়ক পরিতোষ পাল চৌধুরীকে মূল্যায়ন করা জরুরি। পরিতোষ পাল চৌধুরী ভাষা আন্দোলনের পাশাপাশি তিনি বরাক উপত্যকার সার্বিক বঞ্চনার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। একই সঙ্গে বরাক উপত্যকার মানুষ একাদশ ভাষা শহিদ দিবসকে ভাষা-অধিকারের জন্য ভাষা শহিদ দিবস হিসেবে পালন করে আসছেন। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, সুদীর্ঘ বছর পরেও একাদশ ভাষা শহিদকে সরকারি ভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। পাশাপাশি শিলচর রেলওয়ে স্টেশনকে ভাষা শহিদ স্টেশন নামাকরণের গণদাবি বাস্তবায়ন হয়নি।রবিবার শিলচর সুভাষ নগরে পরিতোষ পাল চৌধুরী স্মৃতি পর্ষদের উদ্যোগে ১৯ মে ভাষা শহিদ দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক স্মৃতি চারণ সভায় বিশিষ্টজনেরা একথাগুলো বলেন।
এদিন পরিতোষ পাল চৌধুরী স্মৃতি পর্ষদের সভাপতি হারান দে’র সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত স্মৃতিচারণ সভায় ভাষা সেনাধিনায়ক পরিতোষ পাল চৌধুরীর প্রতিমূর্তি স্থাপন ও পরিতোষ পাল চৌধুরীর জীবনাদর্শ নিয়ে একটি গ্রন্থ প্রকাশের প্রস্তাব নেওয়া হয়।
ভাষা সেনানি পরিতোষ পাল চৌধুরীর প্রতিমূর্তি আগামী ২০২৭ সালের ১৯ মে’র ভেতর স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পাশাপাশি গ্রন্থ সম্পাদনায় থাকবেন কবি, লেখিকা কস্তুরী হোম চৌধুরী।
এদিন সভার শুরুতে ভাষা আন্দোলনের সর্বাধিনায়ক পরিতোষ পাল চৌধুরী ও একাদশ শহিদের প্রতিচ্ছবিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করা হয়। স্বাগত বক্তব্যে পর্ষদের সাধারণ সম্পাদক বিপ্লব পাল চৌধুরী বলেন, ১৯৬১ সালে আসাম সরকার যখন অসমিয়া ভাষাকে রাজ্যের একমাত্র সরকারি ভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে, তখন এর বিরুদ্ধে বরাক উপত্যকায় তীব্র অসন্তোষ দেখা দে। এই সংকট মোকাবেলায় গঠিত ‘কাছাড় জেলা গণসংগ্রাম পরিষদ’-এর মহকুমা স্তরের সম্পাদক হিসেবে পরিতোষ পাল চৌধুরী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। আন্দোলনের চরম পর্যায়ে তিনি আত্মগোপনে থেকে ডিক্টেটরের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন এবং সমগ্র সংগ্রাম সুচারুভাবে পরিচালনা করেন। ভাষা শহিদদের আত্মত্যাগের পর তাঁর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ পরিচালনায় আন্দোলন এক নতুন মাত্রা লাভ করেছিল।

এছাড়া বরাক উপত্যকায় ভাষাগত ও সামাজিক বৈষম্য দূর করতে তিনি ‘ইউনিয়ন টেরিটরি ডিমান্ড কমিটি’ (ইউটিডিসি) গঠন করেন এবং বরাককে একটি পৃথক কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলার জন্য দীর্ঘদিন আন্দোলন পরিচালনা করেন। সভায় কবি ও লেখিকা কস্তুরী হোম চৌধুরী বক্তব্যে ভাষা সেনানি পরিতোষ পাল চৌধুরীর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে দুটি কবিতা পাঠ করেন। সেইসঙ্গে ভাষা সেনানি পরিতোষ পাল চৌধুরীর কর্মজীবনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন সাংবাদিক গৌতম তালুকদার, প্রণবকান্তি দাস, তন্ময় চক্রবর্তী, গোষ্ঠলাল দাস, প্রদীপ দাস।
হারান দে বলেন, শহিদের রক্তের বিনিময়ে প্রাপ্য অধিকার আজও বরাক উপত্যকার মানুষের করায়ত্ত নয়।অথচ ১১ জন ভাষা শহিদের বলিদানে আজ এই উপত্যকার মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলতে পারছেন। এসব বিষয় নবপ্রজন্মকে জানতে হবে। অন্যাথায় অদূর ভবিষ্যতে বাংলা ভাষার ওপর আগ্রাসন আরও বাড়বে। তিনি বলেন, মাতৃভাষা ও প্রতিটি ভাষার মর্যাদা রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ হওয়া জরুরি। তিনি বক্তব্যে ভাষা আন্দোলনের অগ্রণী সেনানি পরিতোষ পাল চৌধুরীকে যথাযথ ভাবে মূল্যায়নের আহ্বান জানান। এদিন অনুষ্ঠানে শিশু শিল্পী যশোজিৎ রায় ও শ্রাবণী সরকার সঙ্গীত পরিবেশন করেন। সভায় অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সাংবাদিক জয় রায়, বিশ্বজিৎ আচার্য, রানু দত্ত, রাজু চৌধুরী, পম্পা পাল চৌধুরী।



