বরাক তরঙ্গ, ৩০ জুলাই : উজান অসমের চরাইদেও, শিবসাগর, যোরহাট ও গোলাঘাট জেলার বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। সরকারি হিসেব অনুযায়ী এখন অব্দি মৃত্যু হয়েছে ৭৮ জনের, ক্ষতিগ্রস্ত ৭ লক্ষাধিক, ত্রাণ শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন ৪০ হাজার মানুষ,যা বরাক উপত্যকার বিগত ২০২২ সালের প্রলয়ঙ্করী বন্যার স্মৃতিকে উস্কে দিচ্ছে। এর থেকে শিক্ষা নিয়ে অবিলম্বে বন্যা প্রতিরোধে রাজ্য তথা এই উপত্যকায় স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ বাস্তবায়নের দাবি জানাল বিডিএফ।
এক প্রেস বার্তায় বিডিএফ মুখ্য আহ্বায়ক প্রদীপ দত্তরায় বলেন, বিগত কয়েক দশক ধরে আসাম বন্যার ভয়াবহতা ক্রমবর্ধমান। অথচ এনিয়ে কোন সুসংহত পরিকল্পনা বা পদক্ষেপ নিতে চূড়ান্ত ব্যর্থ হয়েছে নির্বাচিত সব সরকার। তিনি বলেন, যখনই নির্বাচন আসে প্রতিবারই বন্যামুক্ত আসামের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়,অথচ কার্যক্ষেত্রে দেখা যায় যে বন্যাতে স্থানীয় জনগন চূড়ান্তভাবে বিপর্যস্ত হবার পর সরকারি তরফে নামমাত্র সাহায্য এবং ত্রানের ব্যাবস্থা করা হয় এবং সমস্যা সাময়িক মিটে গেলে আবার সবাই ভাতঘুমে চলে যান। তিনি বলেন যে প্রধানমন্ত্রী সহ কেন্দ্রীয় সরকারের যেসব নেতা মন্ত্রীরা নির্বাচনী সফরে এই রাজ্যে একাধিক বার এসেছেন এরকম এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের সময় তাঁদের কারুর আসামে আসার সময় হচ্ছে না- এটি বিস্ময়কর।
প্রদীপ দত্তরায় এদিন বলেন, উজান বা দক্ষিণ আসামের ক্রমবর্ধমান বন্যা সমস্যার বহুবিধ কারণ রয়েছে। মূলতঃ যে কারণগুলো বিশেষজ্ঞরা শনাক্ত করেছেন তারমধ্যে রয়েছে ক্যাচমেন্ট এরিয়া বা অববাহিকা অঞ্চল , এক্ষেত্রে পাহাড়ি এলাকায়, ক্রমাগত বন ধ্বংসকরণ যার ফলে গাছের শিকড় সমূহের অতিরিক্ত জল শোষন প্রক্রিয়া ব্যাপক ভাবে বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। এরসাথে নদীতে অতিরিক্ত পলি জমা হওয়ায় নদীবক্ষ বহুগুণ উত্তোলিত হয়ে পড়েছে নদীর ধারণক্ষমতা ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। সমতল অঞ্চলে বড় ও ছোট বিল সমূহের সংকোচন বা অবলুপ্তি ক্রমবর্ধমান, যেগুলো অতিবৃষ্টির সময় অতিরিক্ত জলধারন করে নদীর জলস্তর স্বাভাবিক রাখত। এছাড়া কারণ হিসেবে রয়েছে নদীবাধ গুলোর অপর্যাপ্ত সংস্কার ও রক্ষনাবেক্ষণ দায়ী। রয়েছে নদীভাঙন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও।
প্রদীপ দত্তরায় বলেন, এই সমস্ত সমস্যার তাৎক্ষনিক সমাধান সম্ভব নয় কারণ এসবের সঙ্গে বৃহত্তর আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতির যোগাযোগ রয়েছে। পাহাড়ি এলাকায় বন উজাড় হবার পেছনে জনসংখ্যা বৃদ্ধি তথা নগরায়নের ভূমিকা রয়েছে। গুয়াহাটির দীপর বিল বা শিলচরের মালিনী বিলের মতো বড় বিল ছাড়াও অসংখ্য ছোট বিলের জমি নগরায়নের জন্য সঙ্কুচিত বা অবলুপ্ত হয়েছে। তিনি বলেন, আসামের সাম্প্রতিক বন্যার পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন যে রাজ্যের বিশেষ ভৌগলিক ও জলপ্রবাহগত বৈশিষ্ট্যের কারণে বন্যাকে সম্পুর্ণভাবে নির্মুল করা সম্ভব নয়,এটি অবাস্তব। তাঁদের মতে আরও উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কার্যকর প্রশমন মূলক ব্যাবস্থার মাধ্যমে বন্যার ক্ষয়ক্ষতিকে কমিয়ে আনাই অন্যতম লক্ষ্য হওয়া উচিত।
বিডিএফ মুখ্য আহ্বায়ক বলেন যে ঠিক এই জায়গাই সরকারি ব্যবস্থাপনায় খামতি রয়েছে। প্রথমতঃ যে সমস্যা নির্মুল সম্ভব নয় তেমন একটি সমস্যাকে অবিলম্বে জাতীয় দুর্যোগ হিসাবে ঘোষণা করা উচিত। দ্বিতীয়ত নদীর ধারণক্ষমতা বাড়ানোর জন্য অবিলম্বে নদী খনন জরুরী। তিনি বলেন নমামি ব্রহ্মপুত্র এবং নমামি বরাক অনুষ্ঠানের সময় নদী খনন সহ জলসম্পদের যথাযথ ব্যাবহারের জন্য যেসব কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছিল তাঁর কোনটাই বাস্তবায়িত হয়নি। বদরপুরে এই উদ্দেশ্যে আনা যন্ত্র, প্রয়োগের অভাবে নষ্ট হচ্ছে।এছাড়া বন্যারোধে বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা এবং উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার – এসব পদক্ষেপও নেবার জন্য কোন সুসংহত উদ্যোগ দেখা যায়না। এমনকি নদীবাধ গুলোর সংস্কারও এখনো জোড়াতালি দিয়ে সারা হচ্ছে।
বিডিএফ মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক জয়দীপ ভট্টাচার্য এদিন বলেন, ২০২২ সালের ভয়াবহ বন্যার পর বরাকে বন্যা প্রতিরোধে যে সমস্ত পদক্ষেপ ঘোষিত হয়েছিল তার বাস্তবায়ন এখনো অধরা। রাঙির খাল সহ অন্যান্য খালের সংস্কার নিয়ে কিছুদিন পরপর সরকারি তরফে বিবৃতি দেওয়া হয়, জনসমক্ষে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, কিন্তু কাজের গতি খুবই মন্থর। একই ভাবে জিও ব্যাগ দিয়ে নদীবাধ গুলোর সাময়িক সংস্কার সারা হয়েছে, কিন্তু নদীর জলস্তর বাড়লে এসব কতটা কার্যক্ষম থাকবে তা নিয়ে স্থানীয় জনগনের মধ্যে ব্যাপক সন্দেহ ও অসন্তোষ রয়েছে।



