আগমনী : উমার ঘরে ফেরা, বাঙালির আত্মপরিচয়ের মহোৎসব

Spread the news

।। বিধায়ক দাশ পুরকায়স্থ।।
(কলামিস্ট, শিলচর)
১৬ অক্টোবর : “কি শুনালে গিরিবর, উমা কি ভবনে এলো?
ভবেরি ভবানী আমার ভবন করিল আলো!
উমা-শশী না হেরিয়ে ছিল নয়ন অন্ধ হোয়ে,
এবে নয়ন-তারা নিরখিয়ে আঁখি মম জুড়াইল॥”

আজ দুর্গাষষ্ঠী। শরতের নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, বাতাসে শিউলির গন্ধ, কাশবনের শুভ্র দোল আর দূর থেকে ভেসে আসা ঢাকের আওয়াজে বাংলার প্রকৃতি যেন এক অনির্বচনীয় আনন্দবার্তা ঘোষণা করছে—মা আসছেন। ঘরে ঘরে জেগে উঠেছে প্রতীক্ষা, মনে মনে বেজে উঠছে আগমনী। কিন্তু বাঙালির কাছে এই আগমন কেবল কোনও দেবীর মর্ত্যে অবতরণ নয়; এ যেন দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান, বিচ্ছেদের বুকে মিলনের স্পর্শ, দুঃখের অন্ধকারে আশার প্রদীপ জ্বলে ওঠা।

তিনি দুর্গা, মহিষাসুরমর্দিনী, জগজ্জননী; অথচ বাঙালির হৃদয়ে তিনি উমা—বাপের বাড়িতে ফিরে আসা আদরের মেয়ে। এই একটি সম্পর্কের মধ্যে বাঙালি যে অসীমকে আপন করে নিয়েছে, মহাশক্তিকে মাতৃস্নেহের কোমল বন্ধনে বেঁধেছে, তার তুলনা সহজে মেলে না। যে দেবী বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের শক্তির প্রতীক, তিনিই আবার মেনকার বুকের ধন, হিমালয়ের নয়নের মণি। তাঁর আগমনে শুধু পূজামণ্ডপ আলোয় ভরে ওঠে না, বাঙালির অন্তরও জেগে ওঠে বহু প্রজন্মের স্মৃতি, আবেগ, ভালোবাসা ও আত্মপরিচয়ের আলোয়।

এইখানেই দুর্গোৎসবের অন্তর্নিহিত বাঙালিয়ানা। এখানে দেবী শুধু পূজিতা নন, তিনি পরিবারের সদস্য; শুধু আরাধ্যা নন, তিনি আবেগের আপনজন। তাঁর আগমনে আনন্দ, তাঁর বিদায়ে অশ্রু। তাঁর জন্য অপেক্ষা করতে করতে মায়ের মন কাঁদে, বাবার বুক হাহাকার করে, আর তাঁর ফিরে যাওয়ার মুহূর্তে গোটা পরিবার অনুভব করে বিচ্ছেদের যন্ত্রণা। দেবীকে ঘিরে এই মানবিক অনুভূতির যে বিপুল জগৎ বাঙালি নির্মাণ করেছে, তা ধর্মীয় বিশ্বাসের সীমানা অতিক্রম করে সাহিত্যে, সংগীতে, শিল্পে ও সামষ্টিক স্মৃতিতে স্থায়ী আসন পেয়েছে।

উমার আগমন তাই শুধু দেবীর আবাহন নয়; বাঙালির হৃদয়ে তার নিজের সংস্কৃতি, আবেগ ও আত্মপরিচয়ের পুনরাবিষ্কার।

উমা: দেবীত্বের অন্তরালে এক চিরন্তন মানবিক সম্পর্ক

আগমনী গানের আবেদন বুঝতে হলে প্রথমেই বুঝতে হবে উমার এই ঘরে ফেরার তাৎপর্য। পৌরাণিক কাহিনিতে তিনি হিমালয় ও মেনকার কন্যা পার্বতী, শিবের পত্নী। কিন্তু বাংলার কাব্যিক কল্পনায় তিনি কৈলাসের দেবী থেকে হয়ে উঠেছেন বাপের বাড়ির মেয়ে। তাঁর শ্বশুরবাড়ি কৈলাস, তাঁর স্বামী সংসারবিমুখ মহাদেব; আর বাংলার মাটিতে তাঁর আগমন মানে মায়ের কোলে ফিরে আসা, বাবার স্নেহ ফিরে পাওয়া, শৈশবের স্মৃতিতে ডুবে যাওয়া।

এই কল্পনা নিছক পৌরাণিক আখ্যানের পুনর্কথন নয়। এর মধ্যে প্রতিফলিত হয়েছে বাংলার পারিবারিক জীবন, কন্যার প্রতি মায়ের আকুলতা, বিবাহিত নারীর বিচ্ছেদের বেদনা এবং আপনজনকে কাছে পাওয়ার চিরন্তন বাসনা। উমার মধ্যে বাঙালি খুঁজে পেয়েছে নিজের ঘরের মেয়েকে; আর নিজের ঘরের মেয়ের মধ্যেই অনুভব করেছে জগজ্জননীর মহিমা।

এই মানবিকীকরণেই বাঙালির কল্পনার এক অসামান্য সৃজনশীলতা প্রকাশিত। দেবীকে দূর আকাশের অলৌকিক সত্তা করে রাখেনি বাঙালি; তাঁকে নামিয়ে এনেছে ঘরের উঠোনে, মায়ের আঁচলে, বাবার অপেক্ষায়, পরিবারের আনন্দ-বেদনায়। দেবীর সঙ্গে সম্পর্ক এখানে নিছক ভক্ত ও আরাধ্যার নয়; এটি মা ও মেয়ের, বাবা ও সন্তানের, বিচ্ছেদ ও পুনর্মিলনের সম্পর্ক।

আগমনী ও বিজয়ার গান এই অনুভূতিকেই সংগীতের ভাষায় চিরস্থায়ী করেছে। আগমনীতে উমাকে ফিরে পাওয়ার আনন্দ, বিজয়ায় তাঁকে বিদায় দেওয়ার বেদনা। একদিকে আগমনের উচ্ছ্বাস, অন্যদিকে বিচ্ছেদের আশঙ্কা—দুইয়ের মধ্যে প্রবাহিত হয় মানুষের জীবনেরই চিরন্তন সুর।

এই গানগুলির বিশেষত্ব এখানেই যে, দেবীকে নিয়ে কথা বলতে গিয়ে কবিরা মানুষেরই কথা বলেছেন। সংসারের অভাব, দাম্পত্যের টানাপোড়েন, মেয়ের প্রতি মায়ের উদ্বেগ, পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতা, সামাজিক মর্যাদার প্রশ্ন—সবই কোনও না কোনওভাবে প্রবেশ করেছে এই কাব্যিক জগতে। দেবলোক ও মর্ত্যলোকের ব্যবধান সেখানে ঘুচে গেছে।

রামপ্রসাদ সেন ও কমলাকান্ত ভট্টাচার্যের মতো শাক্ত কবিদের সাধনসংগীতে মাতৃভাবের যে গভীরতা প্রকাশিত হয়েছে, তা বাঙালির ধর্মীয় কল্পনাকে এক বিশেষ মানবিক মাত্রা দিয়েছে। তাঁদের কাব্যধারা এবং পরবর্তী শাক্ত পদাবলির ঐতিহ্য দেখায়, ঈশ্বরের কাছে বাঙালি শুধু প্রার্থনা করেনি; কখনও অভিমান করেছে, কখনও অভিযোগ জানিয়েছে, কখনও দুঃখ উজাড় করে দিয়েছে, কখনও আবার সন্তানের মতো মায়ের কাছে আশ্রয় চেয়েছে।

এই যে দেবতার কাছে নিজের সুখ-দুঃখ অকপটে প্রকাশ করার অধিকার, এই যে ভক্তির মধ্যেও অন্তরঙ্গতা, অভিমান ও প্রশ্নের অবকাশ—এটি বাঙালির সাংস্কৃতিক মননের এক মূল্যবান বৈশিষ্ট্য।

আগমনী: লোকস্মৃতি থেকে সাহিত্যের অমর উত্তরাধিকার

বাঙালির সাংস্কৃতিক ইতিহাসে আগমনী-বিজয়ার গানের স্থান বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এগুলি কেবল দুর্গাপূজার মরশুমি গান নয়; এগুলি এমন এক সাহিত্যিক ও সংগীতধারা, যেখানে পৌরাণিক আখ্যান লোকজ জীবনের অভিজ্ঞতায় নতুন অর্থ লাভ করেছে।

মেনকার আকুলতা, হিমালয়ের প্রতীক্ষা, উমার ফিরে আসার আনন্দ কিংবা বিদায়ের বেদনা—এসবের মধ্যে বাংলার সাধারণ মানুষের পারিবারিক জীবন প্রতিফলিত হয়েছে। দেবীর কাহিনি যেন হয়ে উঠেছে ঘরে ঘরে পরিচিত সুখ-দুঃখের কাহিনি। সেই কারণেই আগমনী গান কোনও একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের আচারসংগীতের পরিচয়েই সীমাবদ্ধ থাকেনি; তা বাংলার আবেগ, কাব্যিক কল্পনা ও সংগীত-ঐতিহ্যের একটি স্বতন্ত্র অধ্যায় হয়ে উঠেছে।

বাংলার শাক্ত পদাবলি, লোকসংগীত এবং মৌখিক সাংস্কৃতিক পরম্পরার বিস্তৃত ভুবনে এই গানগুলি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বহমান। তাদের ভাষায় কখনও গ্রামবাংলার সরলতা, কখনও মায়ের আর্তি, কখনও কন্যার প্রতি অভিমান, কখনও সংসারের দুঃখের ছায়া। দেবী এখানে মানুষের কাছের মানুষ; তাই তাঁর সঙ্গে মানুষের সম্পর্কও নিছক আচারসর্বস্ব নয়।

এই ঐতিহ্যের দিকে তাকালে বোঝা যায়, বাঙালির সংস্কৃতি শুধু রাজসভা, জমিদারবাড়ি কিংবা শিক্ষিত অভিজাত সমাজের হাতে নির্মিত হয়নি। তার গভীরে রয়েছে সাধারণ মানুষের কণ্ঠ, গ্রামীণ নারীর অনুভূতি, লোককবির কল্পনা, শিল্পীর শ্রম এবং মৌখিক ঐতিহ্যের দীর্ঘ যাত্রা। লিখিত ইতিহাসে যাঁদের নাম নেই, তাঁদের আবেগও এই সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার নির্মাণে সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলার দুর্গোৎসবের ইতিহাসও কোনও একটি সময়ে, কোনও এক ব্যক্তির হাতে কিংবা একটি মাত্র সামাজিক শ্রেণির উদ্যোগে সম্পূর্ণ হয়ে ওঠেনি। দেবী-উপাসনার নানা প্রাচীন ধারা, পুরাণ ও শাস্ত্রের প্রভাব, আঞ্চলিক লোকবিশ্বাস, সামাজিক পরিবর্তন এবং সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া জনজীবন—সব মিলিয়ে দুর্গাপূজা তার বর্তমান সাংস্কৃতিক রূপ লাভ করেছে।

পরবর্তী সময়ে জমিদারবাড়ির জাঁকজমকপূর্ণ পূজা থেকে পাড়ার সম্মিলিত উদ্যোগ, বারোয়ারি আয়োজন থেকে সর্বজনীন উৎসব—দুর্গোৎসবের সামাজিক পরিসরও ক্রমশ প্রসারিত হয়েছে। ঔপনিবেশিক বাংলার সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তন, নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থান, জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশ এবং আধুনিক নগরজীবনের প্রসার এই উৎসবের রূপান্তরে বিভিন্নভাবে প্রভাব ফেলেছে।

অতএব, দুর্গোৎসবকে শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান হিসেবে দেখলে তার সম্পূর্ণ তাৎপর্য ধরা পড়ে না। এটি বাংলার ইতিহাস, সামাজিক সম্পর্ক, শিল্পচর্চা, অর্থনীতি এবং সমষ্টিগত পরিচয় নির্মাণেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।

মাটির প্রতিমায় বাঙালির সৃজনশীল আত্মপ্রকাশ

দুর্গোৎসবের আর একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য তার শিল্পসত্তা। বাংলার কুমোরের হাতে মাটি প্রাণ পায়, খড়ের কাঠামোয় গড়ে ওঠে দেবীর অবয়ব, রং ও অলংকারে প্রকাশিত হয় শিল্পীর কল্পনা। এই নির্মাণপ্রক্রিয়ায় ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত হয় কারুশিল্প, নন্দনতত্ত্ব, প্রযুক্তি ও প্রজন্মান্তরে প্রবাহিত দক্ষতা।

কুমোরটুলির শিল্পী থেকে প্রত্যন্ত গ্রামের মৃৎশিল্পী—অসংখ্য মানুষের শ্রম ও সৃজনশীলতা এই উৎসবের সৌন্দর্য নির্মাণ করে। তাঁদের হাতে কখনও ফুটে ওঠে ঐতিহ্যবাহী প্রতিমাশৈলী, কখনও আধুনিক শিল্পভাবনা, কখনও লোকজ উপাদানের পুনর্নির্মাণ, কখনও সমকালীন সমাজের সংকট ও প্রতিবাদের প্রতীকী ভাষা।

মণ্ডপশিল্প, আলোকসজ্জা, স্থাপত্যকল্পনা, লোকশিল্পের ব্যবহার এবং প্রতিমা নির্মাণের বৈচিত্র্য দুর্গোৎসবকে এক বৃহৎ শিল্প-উৎসবে পরিণত করেছে। শিল্প এখানে শুধু সৌন্দর্যের প্রদর্শন নয়; এটি সময়কে ব্যাখ্যা করার, সমাজকে প্রশ্ন করার এবং মানুষের অভিজ্ঞতাকে প্রকাশ করার মাধ্যম।

কিন্তু এই জাঁকজমকের অন্তরালে যাঁদের শ্রম রয়েছে, তাঁদের জীবন ও মর্যাদার প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। শিল্পীর ন্যায্য পারিশ্রমিক, কারুশিল্পের সুরক্ষা, শ্রমজীবী মানুষের সম্মান এবং ঐতিহ্যবাহী পেশার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত না হলে উৎসবের বাহ্যিক ঐশ্বর্য তার অন্তর্গত মানবিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়।

সংস্কৃতি কেবল মঞ্চে প্রদর্শিত হয় না; তা নির্মিত হয় মানুষের হাতে, বেঁচে থাকে মানুষের জীবনে এবং সমৃদ্ধ হয় মানুষের সৃজনশীল স্বাধীনতায়।

দুর্গোৎসব: বাঙালির সামষ্টিক আত্মপরিচয়ের প্রকাশ

দুর্গাপূজা বাঙালির কাছে ধর্মীয় আরাধনার পাশাপাশি পুনর্মিলনের উৎসব, স্মৃতির উৎসব, শিল্পের উৎসব এবং আত্মপরিচয় পুনরাবিষ্কারের উপলক্ষ। জীবিকার তাগিদে দূরে থাকা মানুষ বাড়ি ফেরেন, বহুদিনের বিচ্ছিন্ন বন্ধুদের দেখা হয়, আত্মীয়তার বন্ধন নতুন করে দৃঢ় হয়। পাড়ার মণ্ডপে পরিচিত-অপরিচিত মানুষ একত্র হন; ব্যক্তিগত আনন্দ ধীরে ধীরে পরিণত হয় সমষ্টিগত উদ্‌যাপনে।

এই উৎসবের সামাজিক তাৎপর্য বুঝতে গেলে বাঙালির পরিচয়ের বিস্তৃত পরিসরটিকেও বুঝতে হবে। বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সংগীত, লোককথা, নাটক, চলচ্চিত্র, আঞ্চলিক উপভাষা, নদীমাতৃক জীবন, খাদ্যসংস্কৃতি, সামাজিক সংস্কার এবং মুক্তচিন্তার দীর্ঘ ইতিহাস—সব মিলিয়ে বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয় গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে যেমন শাক্ত ও বৈষ্ণব ঐতিহ্য রয়েছে, তেমনই রয়েছে বাউল-ফকিরের সাধনা, সুফি ভাবধারা, লোকায়ত বিশ্বাস এবং বহুবিধ সামাজিক অভিজ্ঞতার সংমিশ্রণ।

এই পরিচয় কোনও একক ধর্মীয় আচারে সীমাবদ্ধ নয়। এর শক্তি তার বৈচিত্র্যে, তার আত্মসমালোচনার ক্ষমতায়, তার সৃজনশীলতায় এবং অন্যের সঙ্গে সহাবস্থানের ঐতিহ্যে।

দুর্গোৎসব সেই বৃহত্তর পরিচয়ের একটি উজ্জ্বল প্রকাশ। কিন্তু এই সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করার অর্থ অন্যের সংস্কৃতিকে ছোট করা নয়। নিজের ভাষা ও ঐতিহ্যের প্রতি গভীর ভালোবাসা এবং অন্যের ভাষা ও পরিচয়ের প্রতি সম্মান—দুটিই পাশাপাশি থাকতে পারে। প্রকৃত আত্মবিশ্বাস কখনও বিদ্বেষের উপর নির্ভরশীল নয়।

বাঙালির দুর্গোৎসব তার নিজস্ব ঐতিহাসিক শিকড়ে দৃঢ় থাকবে, আবার মানবিকতার বৃহত্তর পরিসরেও নিজেকে প্রসারিত করবে—এই ভারসাম্যই তার শক্তি।

উৎসবের আলোয় বর্তমানের অন্ধকার

তবু আজ দুর্গাষষ্ঠীর এই আনন্দময় মুহূর্তে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে আসে—যে বাঙালি উমার আগমনে ঘরে ঘরে আলো জ্বালায়, তার নিজের জীবনের অন্ধকার কতটা দূর হয়েছে?

একদিকে আলোকোজ্জ্বল মণ্ডপ, অন্যদিকে কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা। একদিকে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গৌরব, অন্যদিকে ভাষা ও আত্মপরিচয় নিয়ে উদ্বেগ। একদিকে উৎসবের বিপুল আয়োজন, অন্যদিকে বহু পরিবারের আর্থিক অনিশ্চয়তা। এই বৈপরীত্যকে উপেক্ষা করে কেবল আনন্দের ছবি আঁকলে বাস্তবতার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

বাংলার শিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের ভবিষ্যৎ, শিল্প ও কর্মসংস্থানের সুযোগ, শিক্ষাব্যবস্থার মান, সামাজিক বৈষম্য এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার নিরাপত্তা—এসব প্রশ্ন বাঙালির বর্তমান ও ভবিষ্যতের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। সাংস্কৃতিক গৌরব তখনই অর্থবহ হয়, যখন সেই সংস্কৃতির উত্তরাধিকার বহনকারী মানুষ মর্যাদা ও নিরাপত্তার সঙ্গে বাঁচার সুযোগ পান।

বাংলাভাষী মানুষের কাছে ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি স্মৃতি, জ্ঞান, সাহিত্য, আবেগ ও আত্মপরিচয়ের বাহন। তাই মাতৃভাষার মর্যাদা, ভাষায় শিক্ষার সুযোগ, সরকারি ও সামাজিক পরিসরে ভাষার যথাযথ ব্যবহার এবং সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার প্রশ্নকে নিছক আবেগের বিষয় হিসেবে দেখা যায় না। এগুলি সমান নাগরিকত্ব, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক মর্যাদার প্রশ্ন।

পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি, অসমের বরাক উপত্যকা ও ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার বাংলাভাষী মানুষ, ত্রিপুরা কিংবা দেশের অন্যান্য অঞ্চলে বসবাসকারী বাঙালির অভিজ্ঞতা এক নয়। তাঁদের ইতিহাস, সামাজিক অবস্থান ও ভাষাগত বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। কিন্তু যেখানে মাতৃভাষার ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়, ভাষাগত পরিচয়ের কারণে কোনও মানুষ অপমানিত হন, কিংবা সাংস্কৃতিক অধিকার সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়, সেখানে ন্যায্য প্রশ্ন তোলা জরুরি।

এই প্রশ্নের উত্তর বিদ্বেষে নয়, ইতিহাসবোধে; সংঘাতে নয়, সাংবিধানিক অধিকার সম্পর্কে সচেতনতায়; অন্ধ আবেগে নয়, যুক্তি ও গণতান্ত্রিক প্রতিবাদে খুঁজতে হবে।

একই সঙ্গে আত্মসমালোচনাও অপরিহার্য। বাঙালির বর্তমান সংকটের সমস্ত দায় বাইরের শক্তির উপর চাপিয়ে দিলে নিজেদের ব্যর্থতা আড়াল করা হয়। রাজনৈতিক সুবিধাবাদ, সামাজিক বিভাজন, শিক্ষার দুর্বলতা, কর্মসংস্থানের অভাব, সাংস্কৃতিক আত্মবিস্মৃতি এবং নাগরিক উদাসীনতার প্রশ্নেও নিজেদের জবাবদিহি করতে হবে।

যে জাতি নিজের ভবিষ্যৎ রক্ষা করতে চায়, তাকে অতীতের গৌরব স্মরণ করার পাশাপাশি বর্তমানের দুর্বলতাগুলিকেও নির্ভয়ে স্বীকার করতে হয়।

উৎসবের আলো তখনই সত্যিকার অর্থে উজ্জ্বল হয়, যখন তা সমাজের অন্ধকারকে আড়াল না করে প্রকাশ্যে নিয়ে আসে।

মায়ের কাছে প্রার্থনা: ন্যায়বিচার ও আত্মজাগরণের আহ্বান

আজ মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে বাঙালি তার সমস্ত দুঃখের কথা বলতে চায়। যে তরুণ চাকরির আশায় বছরের পর বছর অপেক্ষা করছে, যে শ্রমিক জীবিকার তাগিদে পরিবার থেকে দূরে দিন কাটাচ্ছে, যে পরিবার অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি, যে মানুষ মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য উদ্বিগ্ন, যে নাগরিক অন্যায়ের প্রতিবাদ করে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছে—তাদের প্রত্যেকের যন্ত্রণা যেন মায়ের চরণে পৌঁছয়।

কিন্তু এই প্রার্থনা যেন কেবল অলৌকিক মুক্তির প্রত্যাশায় সীমাবদ্ধ না থাকে। দেবীর কাছে ন্যায়বিচার চাওয়ার অর্থ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস অর্জন করা। শক্তি প্রার্থনার অর্থ দুর্বলের পাশে দাঁড়ানো। আশীর্বাদ চাওয়ার অর্থ নিজের দায়িত্বকে চিনতে শেখা। আর মুক্তির আকাঙ্ক্ষা মানে এমন এক সমাজ নির্মাণের সংকল্প, যেখানে কোনও মানুষের মর্যাদা, অধিকার কিংবা স্বাধীনতা অন্যের ক্ষমতা বা খেয়ালের উপর নির্ভরশীল হবে না।

মহিষাসুরের বিরুদ্ধে দুর্গার যুদ্ধকে ন্যায় ও অন্যায়ের চিরন্তন দ্বন্দ্বের প্রতীক হিসেবেও উপলব্ধি করা যায়। এই প্রতীক আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শক্তি তখনই মহৎ, যখন তা দুর্বলকে রক্ষা করে; ক্ষমতা তখনই ন্যায়সংগত, যখন তা মানুষের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখে।

মা উমার কাছে আমাদের প্রার্থনা—বাঙালির ঘরে ঘরে শান্তি ফিরুক, তরুণদের হাতে কাজ আসুক, শিক্ষার আলো সর্বত্র পৌঁছাক, শিল্পী ও শ্রমজীবী মানুষ তাঁদের শ্রমের যথাযথ মর্যাদা পান। নারী যেন সমান অধিকার ও স্বাধীনতা নিয়ে বাঁচতে পারেন, শিশু যেন নিরাপদ ভবিষ্যৎ পায়, প্রবীণ মানুষ যেন অবহেলার অন্ধকারে হারিয়ে না যান।

যাঁরা ক্ষমতায় আছেন, তাঁরা যেন মানুষের দুর্দশাকে নির্বাচনী ভাষণের উপাদান না বানিয়ে বাস্তব সমস্যার সমাধানে দায়িত্বশীল হন। গণতন্ত্রে প্রশ্ন তোলা অপরাধ নয়, ভিন্নমতকে শত্রুতা হিসেবে দেখা যায় না, আর নাগরিকের অধিকার কোনও শাসকের দয়া নয়। ন্যায়বিচার কোনও বিশেষ সম্প্রদায়ের অনুগ্রহ নয়; তা প্রত্যেক মানুষের প্রাপ্য।

মায়ের কাছে আমাদের এই প্রার্থনা হোক ব্যক্তিগত কল্যাণের পাশাপাশি সামাজিক দায়িত্ববোধেরও অঙ্গীকার।

ঐতিহ্য বাঁচুক, জাগুক বাঙালির আত্মমর্যাদা

একটি জাতির পরিচয় শুধু তার অতীতের গৌরবে নির্ধারিত হয় না; নির্ধারিত হয় সে তার উত্তরাধিকারকে ভবিষ্যতের হাতে কীভাবে তুলে দেয়, তার উপরেও।

বাঙালি যদি সত্যিই নিজের ভাষা, সাহিত্য, সংগীত, শিল্প, মানবিকতা ও মুক্তচিন্তার ঐতিহ্য নিয়ে গর্বিত হয়, তবে সেই ঐতিহ্যকে আগামী প্রজন্মের জীবনে কার্যকর করে তুলতে হবে। শিশুদের হাতে মাতৃভাষার বই তুলে দিতে হবে, তরুণদের জন্য জ্ঞান ও গবেষণার সুযোগ বাড়াতে হবে, কর্মসংস্থান ও সৃজনশীলতার পরিসর প্রসারিত করতে হবে। বাংলার ইতিহাসকে দলীয় সংকীর্ণতার বাইরে রেখে জানতে হবে, লোকসংস্কৃতি ও আঞ্চলিক ভাষার বৈচিত্র্যকে মর্যাদা দিতে হবে, প্রবাসী বাঙালির সঙ্গে সাংস্কৃতিক সংযোগ দৃঢ় করতে হবে।

একই সঙ্গে কুসংস্কার, অসহিষ্ণুতা, জাতপাতের বৈষম্য, নারী-বিদ্বেষ ও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। কারণ, সংস্কৃতির গৌরব তখনই সত্য হয়, যখন তা মানুষের স্বাধীনতা ও মর্যাদাকে সমুন্নত রাখে।

রামমোহন রায়ের যুক্তিবাদ, বিদ্যাসাগরের সমাজসংস্কার, রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদ, নজরুলের সাম্যচেতনা এবং বাংলার অসংখ্য পরিচিত-অপরিচিত মানুষের সংগ্রাম আমাদের মনে করিয়ে দেয়—বাঙালির ঐতিহ্য শুধু আবেগের নয়, প্রশ্ন করারও; শুধু স্মৃতির নয়, পরিবর্তনেরও; শুধু উৎসবের নয়, মানুষের মুক্তিরও।

তাই দুর্গোৎসবের শ্রেষ্ঠ উদ্‌যাপন হবে তখনই, যখন পুজোর আনন্দ মণ্ডপের সীমানা পেরিয়ে মানুষের জীবনে পৌঁছবে। যখন প্রতিবেশীর বিপদে মানুষ এগিয়ে আসবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে নাগরিক কণ্ঠস্বর জেগে থাকবে, মাতৃভাষার অধিকার রক্ষায় মানুষ সচেতন হবে এবং সংস্কৃতির নামে কাউকে ছোট করা হবে না।

বাঙালির আত্মপরিচয় কোনও সরকারি স্বীকৃতির অপেক্ষায় তৈরি হয়নি। নদী, মাটি, ভাষা, সাহিত্য, সংগীত, সংগ্রাম, প্রেম, প্রতিবাদ ও মানবিকতার দীর্ঘ সহাবস্থানে তা গড়ে উঠেছে। কেউ স্বীকৃতি দিক বা না দিক, এই উত্তরাধিকার বাস্তব। তবে তার মর্যাদা রক্ষা করতে হলে গর্বের পাশাপাশি জ্ঞান, আবেগের পাশাপাশি যুক্তি, প্রতিবাদের পাশাপাশি দায়িত্ব এবং ঐতিহ্যের পাশাপাশি সৃজনশীলতা অপরিহার্য।

আত্মমর্যাদা মানে অতীতের গৌরব নিয়ে আত্মতুষ্ট থাকা নয়; আত্মমর্যাদা মানে নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হওয়া, নিজের দুর্বলতা স্বীকার করা এবং নিজের ভবিষ্যৎ নির্মাণের দায়িত্ব গ্রহণ করা।

উমার বিদায়ের আগেই জেগে উঠুক নতুন প্রত্যয়

চার দিন পর উমা আবার কৈলাসে ফিরে যাবেন। ঢাকের বাদ্য স্তিমিত হবে, মণ্ডপের আলো নিভবে, প্রতিমা বিসর্জনের জলে মিশে যাবে মাটির শরীর। বিজয়ার অশ্রুতে ভিজবে বাঙালির চোখ। কিন্তু উমার বিদায় কি সত্যিই শেষ বিদায়?

না। বাঙালির কাছে বিসর্জন মানে বিস্মরণ নয়। দেবীর মৃন্ময়ী রূপ জলে বিলীন হয়, কিন্তু তাঁর স্মৃতি থেকে যায় মানুষের অন্তরে। পরের বছরের আগমনী সুরে আবার ফিরে আসে সেই প্রতীক্ষা। এই প্রত্যাবর্তনের চক্র বাঙালিকে শেখায়—বিচ্ছেদই শেষ সত্য নয়, অন্ধকার চিরস্থায়ী নয়, আর প্রতিকূলতার মধ্যেও আশাকে বাঁচিয়ে রাখা মানুষের গভীর শক্তি।

আজ দুর্গাষষ্ঠীর সকালে তাই উমাকে স্বাগত জানাই শুধু ফুল, ধূপ, প্রদীপ আর অর্ঘ্য দিয়ে নয়; নিজেদের বিবেক, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তুলে।

মা, তুমি এসো আমাদের ঘরে—কিন্তু সেই ঘরে যেন কোনও মানুষের জন্য দরজা বন্ধ না থাকে। তুমি আলো দাও আমাদের জীবনে—কিন্তু সেই আলো যেন অন্যের অন্ধকারকে উপহাস না করে। তুমি শক্তি দাও আমাদের—কিন্তু সেই শক্তি যেন দুর্বলের উপর অত্যাচারের হাতিয়ার না হয়। তুমি ন্যায়ের পথ দেখাও—কিন্তু সেই ন্যায় যেন কেবল নিজের মানুষের জন্য সীমাবদ্ধ না থাকে।

যে বাঙালি তোমাকে উমা বলে ডাকে, সে যেন নিজের মেয়েদেরও সমান মর্যাদা দেয়। যে বাঙালি তোমার সামনে মাথা নত করে, সে যেন মানুষের অপমানের সামনে নীরব না থাকে। যে বাঙালি তোমার কাছে মুক্তি প্রার্থনা করে, সে যেন অন্যের স্বাধীনতা হরণ না করে।

মা, আজ তোমার আগমনে বাঙালির ঘরে ঘরে আনন্দ জাগুক, কিন্তু সেই আনন্দের গভীরে জেগে থাকুক আত্মসমালোচনার সাহস, ন্যায়ের আকাঙ্ক্ষা এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার।

জর্জরিত মানুষের ক্ষত নিরাময় হোক, অবহেলিতের কণ্ঠস্বর মর্যাদা পাক, প্রতারিতের ন্যায়বিচারের পথ প্রশস্ত হোক। বাঙালির ভাষা বাঁচুক, সংস্কৃতি বিকশিত হোক, যুক্তিবাদী মনন প্রসারিত হোক, আর তার আত্মমর্যাদা দৃঢ় হোক মানবিকতার ভিত্তির উপর।

আগমনী গানের সেই চিরন্তন আকুলতা আজ আবার আমাদের হৃদয়ে ধ্বনিত হোক—

“কি শুনালে গিরিবর, উমা কি ভবনে এলো?”

হ্যাঁ, উমা এসেছেন। তিনি এসেছেন বাঙালির ঘরে, স্মৃতিতে, সংগীতে, সাহিত্যে, শিল্পে এবং অশ্রুসজল ভালোবাসায়। তিনি এসেছেন আমাদের দুর্বলতার সামনে শক্তির প্রতীক হয়ে, হতাশার সামনে আশার আলো হয়ে, অন্যায়ের সামনে ন্যায়ের প্রত্যাশা হয়ে।

তাঁর আগমন শুধু উৎসবের সূচনা না হোক; হোক বাঙালির আত্মজাগরণেরও সূচনা।

শুভ দুর্গাষষ্ঠী। শুভ আগমনী। জয় হোক মানবিকতার, জয় হোক ন্যায়ের, জয় হোক বাঙালির ভাষা, সংস্কৃতি ও আত্মমর্যাদার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *