মহরমের দিনে মানবতার বার্তা : দক্ষিণ ধলাইয়ে ৯৬ জনের রক্তদান

Spread the news

রাজীব মজুমদার, ধলাই।
বরাক তরঙ্গ, ২৬ জুন :
ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও পবিত্র দিন দশ মহরম। ত্যাগ, আত্মদান, ন্যায় ও মানবতার চিরন্তন শিক্ষা বহনকারী এই দিনটি যুগে যুগে মানুষকে সত্য ও কল্যাণের পথে চলার অনুপ্রেরণা জুগিয়ে এসেছে। সেই পবিত্র দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে এবং মানবসেবার মহান আদর্শকে সামনে রেখে এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ গ্রহণ করল দক্ষিণ ধলাই মসজিদ সমন্বয় সমিতি।

শুক্রবার দক্ষিণ ধলাই মসজিদ সমন্বয় সমিতির উদ্যোগে এবং ভাগাবাজার জামা মসজিদ কমিটির ব্যবস্থাপনায় ভাগাবাজার জামা মসজিদ প্রাঙ্গণে আয়োজন করা হয় এক স্বেচ্ছায় রক্তদান শিবিরের। সকাল ১০টা থেকে শুরু হওয়া এই মানবিক কর্মসূচিতে এলাকার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। দিনশেষে মোট ৯৬ জন মুসলিম ধর্মাবলম্বী ব্যক্তি স্বেচ্ছায় রক্তদান করেন, যা উপস্থিত সকলের মধ্যে উৎসাহ, অনুপ্রেরণা ও মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।

জুমার নামাজের খুতবায় ভাগাবাজার জামা মসজিদের ইমাম মওলানা আফজাল হোসেন রক্তদানের গুরুত্ব, মানবজীবনে রক্তের অপরিহার্যতা এবং অসুস্থ ও সংকটাপন্ন রোগীদের জীবন বাঁচাতে রক্তদানের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। তিনি বলেন, একজন সুস্থ মানুষের দেওয়া এক ব্যাগ রক্ত অনেক সময় একজন মৃত্যুপথযাত্রী মানুষের জীবনে নতুন আশার আলো জ্বালিয়ে দিতে পারে।
তিনি আরও বলেন, ধর্ম, বর্ণ, ভাষা কিংবা পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে মানবতার সেবায় এগিয়ে আসাই প্রকৃত মানবিকতা। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে দেশের সামাজিক সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধের প্রসঙ্গও। তিনি উল্লেখ করেন, অতীতে এই দেশে হিন্দু-মুসলিমসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহাবস্থানের যে ঐতিহ্য ছিল, তা দেশের উন্নয়ন ও স্বাধীনতার সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বর্তমান সময়েও সেই সম্প্রীতি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বজায় রাখার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন। তাঁর বক্তব্যের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশ ছিল মানবতার সেই চিরন্তন বার্তা “রক্তের রং এক, রক্তের কোনো ধর্ম নেই, কোনো জাত নেই। একজন মানুষের জীবন বাঁচানোই সবচেয়ে বড় মানবিক কাজ।”

মসজিদ সমন্বয় সমিতির সম্পাদক সাবির আহমেদ চৌধুরী জানান, গত এক বছরে এটি তাদের তৃতীয় রক্তদান শিবির। এর আগের দুটি শিবিরেও সাধারণ মানুষের ব্যাপক সাড়া পাওয়া গিয়েছিল। তিনি বলেন, পূর্ববর্তী দুই শিবিরে ২৫০ জনেরও বেশি মানুষ স্বেচ্ছায় রক্তদান করেছেন, যা কাছাড় ক্যান্সার হাসপাতালসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসাধীন অসংখ্য রোগীর জীবন রক্ষায় সহায়ক হয়েছে। তিনি আরও বলেন, “ধর্মীয় দিক থেকে আশুরার দিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এমন একটি পবিত্র দিনে মানবসেবার এই কর্মসূচিতে এলাকার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ আমাদের অনুপ্রাণিত করেছে। যারা রক্তদান করেছেন এবং যারা এই উদ্যোগ সফল করতে সহযোগিতা করেছেন, তাদের সকলের প্রতি আমরা আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ।”

এদিকে, কাছাড় ক্যান্সার হাসপাতালের চিকিৎসক ডাঃ দিলোয়ার হোসেন রক্তদানের বৈজ্ঞানিক দিক তুলে ধরে বলেন, একজন সুস্থ মানুষ নিয়মিত বিরতিতে রক্তদান করলে শরীরের কোনো ক্ষতি হয় না। বরং এটি শরীরে নতুন রক্তকণিকা তৈরিতে সহায়তা করে এবং বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তাই সমাজে রক্তদান সম্পর্কে ভয় ও ভুল ধারণা দূর করে আরও বেশি মানুষকে এই মানবিক কাজে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

বর্তমান সময়ে যখন সমাজের বিভিন্ন স্তরে বিভাজন, বিদ্বেষ ও ভেদাভেদের আলোচনা সামনে আসে, তখন দক্ষিণ ধলাইয় মসজিদ সমন্বয় সমিতি এই উদ্যোগ যেন নতুন করে মনে করিয়ে দিল মানবতাই মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয়। রক্তদানের মাধ্যমে একে অপরের জীবন রক্ষা করার এই সংস্কৃতি সমাজে সম্প্রীতি, সহমর্মিতা এবং পারস্পরিক বিশ্বাসকে আরও সুদৃঢ় করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *