।। প্রদীপ দত্ত রায় ।।
(লেখক প্রাক্তন ছাত্রনেতা ও গৌহাটি হাইকোর্টের আইনজীবী)
২ জুন : এককালে ভারতের শিল্প প্রধান অঞ্চল ছিল বাংলা। এখানকার কলকারখানায় উৎপাদিত সামগ্রী সারা ভারতে বাজারজাত হত। ব্রিটিশ শাসন আমলে দেশের রাজধানী ছিল কলকাতা। তাই এর আশপাশ অঞ্চলে শিল্প গড়ে তুলেছিল ব্রিটিশরা। কলকারখানায় কাজ করার জন্য দেশের নানা প্রান্ত থেকে মানুষ এসে জুটে ছিল কলকাতা সংলগ্ন এলাকায়। কলকাতা রুপ লাভ করেছিল মহানগরীর। স্বাধীনতার পর একদশক এই অবস্থা থাকলেও তারপর বাংলার প্রতি কেন্দ্রের অনীহা বাড়তে থাকে। কেন্দ্রের নেতৃত্বের সঙ্গে বাংলার নেতৃত্বের বিরোধ ঘটায় বাংলায় মানুষের মধ্যেও এর প্রভাব পড়ে। ফলে কংগ্রেস সরকারের পতন ঘটিয়ে যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠিত হয় বাংলায়। কেন্দ্রের অমনোযোগী মনোভাবের কারণে শিল্পের উপর অশুভ ছায়া পড়তে শুরু করে। কেন্দ্রের উদ্যোগে অন্যান্য রাজ্যে শিল্প পরিকাঠামো গড়ে তোলা হয় এবং বাংলার শিল্প পরিকাঠামোকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়। শিল্প সমৃদ্ধ একটি রাজ্য ক্রমেই উৎপাদনশীলতায় পিছিয়ে পড়ে এবং বেকার সমস্যা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে শুরু করে। কেন্দ্রের বঞ্চনার এই পরিস্থিতিকে হাতিয়ার করেই কংগ্রেস জমানার অবসান ঘটিয়ে বামফ্রন্ট ক্ষমতায় আসে। আর ৩৪ বছরের বামফ্রন্টের শাসনকালে শিল্প আরও বেশি ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যায়। বিভিন্ন ধরনের আন্দোলন, ধর্মঘট, কলকারখানা মালিকদের কারখানা সচল রাখার ক্ষেত্রে সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। শিল্প সহায়ক নীতিতে বামপন্থার বিশ্বাসের অভাব কলকারখানা মালিকদের সামনে বিকল্প ভাবনার পথ খুলে দেয়। সরকারি অধীনস্থ কারখানাগুলো ধুঁকতে থাকে। শুধুমাত্র শ্রমিক স্বার্থের দিকে নজর দিয়ে গোটা শিল্প পরিবেশকেই নষ্ট করে দেওয়া হয়। এর ফলে বন্ধ হয়ে যায় চট শিল্প। বাংলা থেকে গুজরাটে পাড়ি দেয় গহনা এবং বস্ত্রশিল্প। একের পর এক কাপড় মিল বন্ধ হয় এবং গুজরাটে গড়ে ওঠে কাপড়ের মিল। ওষুধ শিল্প অন্যান্য রাজ্যে শ্রমিক সমস্যা নেই বলেই গড়ে ওঠে এবং বাংলার ওষুধ শিল্প ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে। বাম জমানায় সিঙ্গুরে টাটার ন্যানো কারখানা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তুমুল আন্দোলন করে এই শিল্প সম্ভাবনাকে অংকুরেই বিনাশ করে দেওয়া হয়। কৃষি জমি রক্ষার নামে এই আন্দোলন যে আসলে শিল্প বিমুখ ছিল এবং ভুল ছিল এটা এখন প্রমাণ হচ্ছে।
সিঙ্গুর ইসুকে কেন্দ্র করে ৩৪ বছরের বাম জমানার অবসান ঘটে বাংলায়। সিঙ্গুর আন্দোলনকে হাতিয়ার করে মমতার নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস বাংলার ক্ষমতায় আসে। ক্ষমতায় আসার পর তৃণমূল কংগ্রেস বামেদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে শিল্প কারখানাগুলোর বারোটা বাজানোর কাজ চালিয়ে যেতে থাকে। তৃণমূলের আমলে বাংলায় প্রচুর কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে এমনকি বাটা এবং ব্রিটানিয়ার মতো কারখানা রাজ্য ছেড়ে অন্য রাজ্যে তাদের কারখানা সরিয়ে নিয়ে গেছে। কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হাজার হাজার, লক্ষ লক্ষ বেকার বিপন্ন হয়ে পড়ে। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য মমতা কিছু সস্তা অনুদানমূলক প্রকল্প চালু করেন। কন্যাশ্রী, যুবশ্রী ইত্যাদি নানা নামে কিছু ভাতা প্রকল্প চালু করে মানুষকে প্রলুব্ধ করে ক্ষমতায় টিকে থাকে তৃণমূল কংগ্রেস। বাংলা জুড়ে ভয়াবহ বেকার সমস্যা মাথাচাড়া দিয়ে উঠলেও কলকারখানা সচল করার প্রতি তৃণমূলের কোনো আগ্রহ ছিল না। এই দলের নেতাকর্মীরা কাট মানি সংগ্রহ করা সহ নানা ধরনের দুর্নীতিতে যুক্ত হয়ে নিজেরা কাড়ি কাড়ি টাকার মালিক হয়ে যান। রাজ্যের মানুষ তৃণমূলের আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছিল এটা কিন্তু তৃণমূল নেতৃত্ব উপলব্ধি করতে পারেনি। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পর এখন তারা বুঝতে পারছে রাজ্যের মানুষের মধ্যে তাদের প্রতি আস্থার সংকট দেখা দিয়েছিল। যদিও তারা নির্বাচনে পরাজয়ের জন্য এস আই আর প্রক্রিয়ায় ভোটারের নাম কর্তন এবং ইভিএমকে দোষারোপ করছে। নিজেদের কর্মপদ্ধতির ভুল তারা এখনো দেখতে পাচ্ছে না।
কেন্দ্রের শাসকদের সঙ্গে বাংলার নেতৃত্বের মানসিক দূরত্ব কংগ্রেস আমল থেকেই শুরু হয়েছিল। এর ফলে আঞ্চলিক পর্যায়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠা বামফ্রন্ট কেন্দ্র বিরোধীতাকে হাতিয়ার করেই দীর্ঘ ৩৪ বছর রাজত্ব করেছে। ১৯৮৯ সালে কংগ্রেস সরকারের পতনের পর যখন জোট সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয় তখন বিশ্বনাথ প্রতাপ সিংহ প্রধানমন্ত্রী পদের জন্য বাংলার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর নাম প্রস্তাব করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সিপিএমের পলিটব্যুরো যার মধ্যে বাংলা বিরোধী শক্তি প্রবল ছিল তারা এই প্রস্তাবকে নাকচ করে দেয়। এর ফলে বাংলা বঞ্চনার শিকার হয়। এরপর রাজীব গান্ধীর মৃত্যুর পর কংগ্রেসের চাণক্য বলে পরিচিত প্রণব মুখোপাধ্যায়কে প্রধানমন্ত্রী করার সুযোগ এলেও কংগ্রেস নেতৃত্ব তাকে সে সুযোগ না দিয়ে দক্ষিণের নেতা পি ভি নরসিংহ রাওকে প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত করে। পরবর্তীকালে প্রণব মুখার্জিকে ফের প্রধানমন্ত্রী করার সুযোগ থাকলেও কংগ্রেস মনমোহন সিংহকে প্রধানমন্ত্রী করে প্রণব মুখার্জিকে বঞ্চিত করে। কেবল তাই নয় এরপর তাকে সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করে প্রণব মুখার্জির সক্রিয় রাজনীতির পথ চিরতরে বন্ধ করে দেয়। তবে এটা যে বুমেরাং হয়েছে কংগ্রেস দল পরবর্তীকালে বুঝতে পারে এবং প্রণবের মতো রাজনীতিতে বিচক্ষণ ব্যক্তিকে সরিয়ে দেওয়ার ফলেই কংগ্রেসের আজ বেহাল দশা। কেন্দ্রীয় দলের সঙ্গে বাংলার যে বিরোধ এটা দীর্ঘকাল যাবতই চলে আসছে। কিন্তু এবার প্রায় পঞ্চাশ বছর পর কেন্দ্রের শাসকদলের ছত্রছায়ায় বাংলায় সরকার গঠিত হয়েছে। বিজেপি বহু চেষ্টা করে এবার বাংলার মসনদ দখল করেছে। বাংলার প্রতি কেন্দ্রের বিজেপি নেতৃত্বের মনোভাব কেমন তা বুঝতে হলে কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে। এর আগে এ নিয়ে কোনও মন্তব্য করা ঠিক হবে না। বাংলায় সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে কেন্দ্রের সঙ্গে বাংলার যে নীতিগত বিরোধের জায়গা তৈরি হয়েছিল এর অবস্থান ঘটতে চলেছে বলা যেতে পারে। হয়তো এর সুফল ভালই হতে পারে। অন্তত বাংলার মানুষ বর্তমানে এটাই মনে করছে।
বাংলায় নতুন সরকার গঠনের পর একের পর এক অনেকগুলি পদক্ষেপ করতে শুরু করেছে। অভয়ার মৃত্যুর তদন্ত করার জন্য নতুন করে সিট গঠন করা হয়েছে। ২০২১ সালে বিধানসভা নির্বাচনের পর যেসব রাজনৈতিক হিংসার ঘটনা ঘটেছিল সেগুলির তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নতুন করে ওইসব ঘটনায় তদন্তের জন্য মামলা রুজু করা হয়েছে। হিংসাত্মক ঘটনায় যেসব বিজেপি কর্মীর প্রাণহানি ঘটেছে সেইসব পরিবারে কাউকে চাকরি দেওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়েছে। এটা একটা বিরাট বড় ঘোষণা। অবৈধ নির্মাণ গুঁড়িয়ে দেওয়া ছাড়াও অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের বিতরণ করার কথা খোলাখুলি ঘোষনা করা হয়েছে। প্রদেশ বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য স্পষ্ট করেই বলেছেন বাংলায় কোনও ডিটেনশন ক্যাম্প স্থাপন করা হবে না। চিহ্নিত বাংলাদেশীদের ধরে বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়া হবে এবং বিএসএফ তাদের সীমান্তে নিয়ে গিয়ে বিজিবির হাতে হস্তান্তর করবে। রাষ্ট্রের পয়সায় ভিন রাষ্ট্রের মানুষদের প্রতিপালন করার কোনও সদিচ্ছা বাংলা সরকারের নেই এটা স্পষ্ট করে বলেছেন শমীক ভট্টাচার্য। অবৈধ উচ্ছেদের প্রতিবাদে পার্ক স্ট্রিট এলাকায় রাস্তা অবরোধ করে যে বিক্ষোভ দেখানো হয়েছিল তাকে কড়া হাতে দমন করেছে পুলিশ। পুলিশের রনংদেহি মূর্তি দেখে প্রতিবাদকারীরা স্থান ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। প্রতিবাদকারীদের একাংশ পুলিশের উপর ইটপাটকে ছুড়লে আত্মরক্ষার্থে পুলিশ লাঠিচার্জ করে এলাকা খালি করে দেয়। এ ঘটনা প্রতিমান করায় কেবল যে সরকার বদল ঘটেছে তা নয় এবার যে পরিস্থিতিরও বদল ঘটেছে । রাজ্যে ভেঙে পড়া আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে পুনরায় স্থাপন করতে হলে এমন কঠোর পদক্ষেপ করতেই হবে। যারা এতদিন অরাজকতা চালিয়ে এসেছে তারা এখন ক্রমে কোণঠাসা হয়ে পড়ছে। হয়তো তারা উপলব্ধি করতে পারবে তাদের কর্মকান্ড রাজ্যের জনগণের হিতে ছিল না। অবশ্য তাদের বোধোদয় না ঘটলে তাদের আইনের শাসন মেনে নেওয়া ছাড়া অন্য উপায় নেই।
বাংলায় বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের পর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছিলেন তৃণমূলের আমলে বন্ধ হয়ে যাওয়া কলকারখানাগুলি ফের চালু করা হবে। রাজ্যের অর্থনীতিকে পুনরায় চাঙ্গা করে তুলতে হলে কেবলমাত্র ভাতা প্রকল্প দিয়ে চলবে না। তৃণমূল আমলে বাংলায় যে ভয়াবহ বেকার সমস্যা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে তা দূর করতে হলে বন্ধ কর কারখানা চালু করার পাশাপাশি নতুন নতুন শিল্প স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। বাটা এবং ব্রিটানিয়ার মত যেসব কোম্পানি বাংলা ছেড়ে অন্য রাজ্যে কারখানা সরিয়ে নিয়ে গেছে তাদের অভয় দিতে হবে যাতে তারা ফের কারখানা ফিরিয়ে আনে। শিল্প স্থাপনের মত পরিবেশ গড়ে তুলতে নতুন সরকারকে পরিকল্পনা নিয়ে হাঁটতে হবে। কারণ, রাজ্যের মানুষের অনেক আশা নতুন সরকারের ওপর। কেবল রাজনীতিতে পরিবর্তন নয় বাংলার আর্থসামাজিক জীবনে পরিবর্তন নিয়ে আসবে। বাংলার আর্থিক মেরুদণ্ড যদি শক্ত হয়ে ওঠে তাহলে অন্যান্য ক্ষেত্রেও রাজ্য প্রগতির পথে এগিয়ে চলতে সক্ষম হবে। এসব করতে হলে নতুন সরকারের উপর অনেক চাপ থাকবে ঠিকই তবে রাজ্যবাসির হিতে এক এক করে পরিকল্পনামাফিক সরকারকে এগিয়ে যেতে হবে। বাংলা যেহেতু সম্ভাবনাময় রাজ্য এ রাজ্যে আইটি সেক্টর সহ নানা ক্ষেত্রে নতুন নতুন লগ্নিকারীদের সমাবেশ ঘটিয়ে পরিকাঠামগত পরিবর্তন আনা সম্ভব। এসব মাথায় রেখেই নতুন সরকারকে এগিয়ে যেতে হবে। কারণ মানুষ যে স্বপ্ন দেখেছে বিজেপিকে নিয়ে সেই স্বপ্ন সাকার করতে হলে সরকারকে ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে কাজ করতেই হবে। এক্ষেত্রে কেন্দ্র মনে হয় সহযোগিতা করতে পিছপা হবে না। নিরাপত্তার জন্য চিকেন নেকের উপর কেন্দ্রের যেমন নজরদারি থাকবে তেমনি বাংলার সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে কেন্দ্রের বরাদ্দ অর্থের পরিমাণও এই সরকারের আমলে বৃদ্ধি পাবে এটা আশা করা অন্যায় নয়। বাংলার আর্থিক বুনিয়াদ দৃঢ় হয়ে উঠলে এটা দেশের জিডিপি বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও সহায়ক হয়ে উঠবে। বাংলায় নিজেদের দলের ক্ষমতা বিস্তারের পর বিজেপি নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার বাংলার প্রতি সুবিচার করবে এই আশা করছেন। বাংলার জনগণ। যারা এবার নীরবে ভোটের বাক্সে বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়েছেন।
(মতামত লেখকের ব্যক্তিগত)



