তিনখালে অষ্টরথে জনসমুদ্র, সম্প্রীতির অনন্য নজির

Spread the news

মোহাম্মদ জনি, পাথারকান্দি।
বরাক তরঙ্গ, ১৭ জুলাই :
শ্রীভূমি জেলার তিনখালে শুক্রবার বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী সম্প্রদায়ের অন্যতম বৃহত্তম ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসব অষ্টরথ মহোৎসব উপলক্ষে ভক্ত ও দর্শনার্থীদের ঢলে গোটা এলাকা জনসমুদ্রে পরিণত হয়। ধর্মীয় আবেগ, শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্য, লোকসংস্কৃতির বর্ণিল উপস্থাপনা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তায় মুখর হয়ে ওঠে তিনখাল। একদিনের জন্য এলাকা যেন রূপ নেয় এক ‘মিনি তীর্থক্ষেত্রে’।
ভোর থেকেই তিনখাল উত্তর, তিনখাল দক্ষিণ, কঁচুবাড়ি, পারুগাঁও, গোকিলা-সহ বিভিন্ন এলাকা থেকে ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সজ্জিত হাজার হাজার নারী-পুরুষ, শিশু ও প্রবীণ রথযাত্রায় অংশ নেন। শ্রীভূমির বিভিন্ন প্রান্তের পাশাপাশি কাছাড়, হাইলাকান্দি এবং পার্শ্ববর্তী ত্রিপুরা থেকেও অসংখ্য ভক্ত ও দর্শনার্থী উৎসবে যোগ দেন।
এদিন মোট আটটি সুসজ্জিত রথ নির্ধারিত পথ ধরে শোভাযাত্রা বের করে। প্রতিটি রথে বিশেষ পূজা-অর্চনা, বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণ এবং ধর্মীয় আচার পালনের পাশাপাশি বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। ফুল, পতাকা ও ঐতিহ্যবাহী অলংকরণে সজ্জিত রথগুলো দর্শনার্থীদের বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।

ঢাক, ঢোল, খোল, করতাল, শঙ্খধ্বনি ও অবিরাম হরিনাম সংকীর্তনে মুখরিত হয়ে ওঠে সমগ্র এলাকা। ‘হরিবোল’ ও ‘জয় জগন্নাথ’ ধ্বনিতে ভক্তদের উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো। বহু ভক্ত রথের দড়ি টেনে নিজেদের ধন্য মনে করেন এবং পরিবারের সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করেন।

রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে বিশাল মেলাও বসে। খেলনা, হস্তশিল্প, ধর্মীয় সামগ্রী, পোশাক, মিষ্টি ও স্থানীয় খাদ্যসামগ্রীর দোকানে ছিল উপচে পড়া ভিড়। শিশু থেকে প্রবীণ—সব বয়সের মানুষের উপস্থিতিতে উৎসব প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী সমাজের কাছে অষ্টরথ মহোৎসব কেবল ধর্মীয় আচার নয়, বরং তাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি, সামাজিক ঐক্য ও আত্মপরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই উৎসবের মাধ্যমে তারা নিজেদের ঐতিহ্য ও কৃষ্টিকে সংরক্ষণ করে আসছেন।

উৎসবের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল সর্বধর্মের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান-সহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের উপস্থিতি সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।

উৎসবকে ঘিরে আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুলিশ, ট্রাফিক পুলিশ, সিভিল ডিফেন্স এবং স্বেচ্ছাসেবকদের মোতায়েন করা হয়। যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের তৎপরতাও ছিল উল্লেখযোগ্য।

দিনভর রথপরিক্রমা, ধর্মীয় অনুষ্ঠান, সংকীর্তন ও মেলার মধ্য দিয়ে উৎসবের আবহ বজায় থাকার পর গভীর রাতে শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয় এবারের অষ্টরথ মহোৎসব। ধর্মীয় বিশ্বাস, ঐতিহ্য, লোকসংস্কৃতি এবং সম্প্রীতির অনন্য সমন্বয়ে তিনখালের এই উৎসব আবারও মানুষের মিলনমেলার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *