বরাক তরঙ্গ, ১৭ জুন : পরিকাঠামো এবং পরিষেবা ক্ষেত্রে শিলচর দূরদর্শন কেন্দ্রের অতীত ঐহিত্যকে ফেরাতে সোচ্চার হয়েছেন রাজ্যসভার সদস্য কণাদ পুরকায়স্থ। বুধবার, নয়াদিল্লিতে কেন্দ্রীয় যোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ক স্ট্যান্ডিং কমিটির বৈঠকে অংশ নিয়ে এবিষয়ে গুচ্ছ প্রস্তাব পেশ করেন তিনি। স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান নিশিকান্ত দুবের পৌরোহিত্যে এই বৈঠকে শিলচর দূরদর্শন কেন্দ্রের সঙ্গে উত্তর পূর্ব ভারতে প্রসার ভারতীর পরিকাঠামো এবং পরিষেবা উন্নয়নেও আলোকপাত করেন কণাদ পুরকায়স্থ। পরে বিষয়টি নিয়ে প্রসার ভারতীর ডিরেক্টর জেনারেল রাজীব কুমার জৈনের সঙ্গেও কথা বলেন তিনি। শিলচর দূরদর্শন কেন্দ্রের পরিকাঠামো ও পরিষেবা আগের অবস্থানে ফিরিয়ে আনা হবে বলে তাঁকে আশ্বস্ত করেছেন প্রসার ভারতীর এই শীর্ষ আধিকারিক। বরাক উপত্যকা সহ দক্ষিণ অসমের ভাষা, কৃষ্টি-সংস্কৃতির বিকাশে ১৯৯০ সালে শিলচর তারাপুরে গড়ে উঠে দূরদর্শন কেন্দ্রটি। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এটি বরাক উপত্যকার বিভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি এবং স্থানীয় সংবাদ সম্প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছিল। একসময়ে কেন্দ্রটি নিয়মিত বাংলা, মণিপুরি, চা-জনজাতি সহ বিভিন্ন স্থানীয় ভাষায় নিজস্ব অনুষ্ঠান এবং সংবাদ সম্প্রচার করতো। কিন্তু কালক্রমে সেই ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলে কেন্দ্রীয় এই প্রতিষ্ঠান।
এ দিন নয়াদিল্লিতে স্ট্যান্ডিং কমিটির বৈঠকে প্রসার ভারতী সংস্থার অধীনে থাকা দূরদর্শন ও আকাশ বাণীর বর্তমান পরিকাঠামো, পরিকল্পনা ও উন্নয়নের বিষয় উত্থাপন করেন রাজ্যসভার সাংসদ। বিশেষ করে শিলচর দূরদর্শন কেন্দ্রের পরিকাঠামো উন্নয়ন, সম্প্রচার ও আনুসঙ্গিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করে শীঘ্রই সমাধানে গুরুত্ব আরোপ তিনি। প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী প্রয়াত কবীন্দ্র পুরকায়স্থের প্রচেষ্টায় চালু বাংলা সংবাদ শিলচর দূরদর্শন কেন্দ্র থেকে পুনরায় চালু করা ও অন্যান্য অনুষ্ঠান সম্প্রচারের দাবি জানিয়ে সাংসদ কণাদ পুরকায়স্থ উল্লেখ করেন শিলচর দূরদর্শন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার পর বরাক উপত্যকায় নিজস্ব পরিকাঠামো তৈরি হয়ছিল এবং নিরবচ্ছিন্ন ভাবে বিভিন্ন অনুষ্ঠান প্রযোজনা করে আসছিল। ফলে এতদঞ্চলের প্রায় পঞ্চাশ লক্ষ লোকের কাছে পৌঁছে যায় শিলচর দূরদর্শনের পরিষেবা। কিন্তু গত কয়েক বছরে দূরদর্শন কেন্দ্রটি মৃত প্রায় অবস্থা। এর থেকে উত্তরণে প্রয়োজন বলিষ্ঠ পদক্ষেপ, এদিন সেই দাবিই তুলে ধরেন কণাদ পুরকায়স্থ। বর্তমানে শিলচর দূরদর্শন কেন্দ্রের অনুষ্ঠান গুয়াহাটি কেন্দ্রের মাধ্যমে সম্প্রচারিত হচ্ছে। এতে স্থানীয় দর্শক, শিল্পী, সংস্কৃতি প্রেমী মানুষ বঞ্চিত হচ্ছেন। যা অত্যন্ত অপ্রত্যাশিত এবং অনভিপ্রেত বলেই মনে করেন তিনি।
এছাড়াও এই বৈঠকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে প্রসার ভারতীর পরিকাঠামো ও পরিষেবা উন্নয়নে বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য প্রস্তাব পেশ করেন বরাক উপত্যকার এই সাংসদ। এরমধ্যে রয়েছে, সম্প্রচার পরিকাঠামোকে শক্তিশালীকরণ। দূরবর্তী ও সীমান্তবর্তী অঞ্চলে দূরদর্শন এবং আকাশবাণীর সম্প্রচার পরিকাঠামোর আধুনিকীকরণ, যাতে নিরবচ্ছিন্ন ও উন্নতমানের সম্প্রচার নিশ্চিত করা যায়। আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন আরও এফএম কেন্দ্র স্থাপন করাও প্রয়োজন। আঞ্চলিক ও স্থানীয় ভাষার অনুষ্ঠান সম্প্রচারে গুরুত্ব আরোপ করে সাংসদের প্রস্তাব —উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন আদিবাসী ও আঞ্চলিক ভাষায় আরও অধিক পরিমাণে অনুষ্ঠান নির্মাণ ও সম্প্রচার, এর মাধ্যমে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কৃষ্টি সংস্কৃতির বিকাশের সঙ্গে সম্পর্ক সুদৃঢ় হতে পারে।
উত্তর-পূর্বাঞ্চলভিত্তিক সংবাদ ও সমসাময়িক বিষয়বস্তু অঞ্চলের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড, স্থানীয় সাফল্য, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং জনকল্যাণমূলক উদ্যোগসমূহের ব্যাপক প্রচার জাতীয় পরিসরে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিষয়গুলোকে অধিক গুরুত্ব দিতে সহায়ক হবে।ডিজিটাল রূপান্তর ও অনলাইন সম্প্রসারণের মাধ্যমে প্রসার ভারতীর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম গুলোক আরও শক্তিশালীকরণ আবশ্যক, এর মাধ্যমে মোবাইল অ্যাপ, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, পডকাস্ট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে আঞ্চলিক বিষয়বস্তু অধিক সংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারবে।দক্ষতা উন্নয়ন ও স্থানীয় প্রতিভা বিকাশে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাংবাদিক, কারিগরি কর্মী এবং বিষয়বস্তু নির্মাতাদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি গ্রহণ করা যেতে পারে। পাশাপাশি স্থানীয় যুবসমাজকে অনুষ্ঠান নির্মাণে অংশগ্রহণে উৎসাহিত করতে হবে। সংবেদনশীল সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে অতিরিক্ত সম্প্রচার সুবিধা স্থাপন করা প্রয়োজন, যাতে নির্ভরযোগ্য তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত হয় এবং জাতীয় যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও সুদৃঢ় হয়। সংস্কৃতি ও পর্যটনের প্রসারে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, লোকশিল্প, পর্যটন সম্ভাবনা এবং সাফল্যের কাহিনি নিয়ে বিশেষ অনুষ্ঠান তৈরি করে জাতীয় পর্যায়ে সম্প্রচার করা যেতে পারে। কমিউনিটি রেডিও ও স্থানীয় জনসংযোগ শক্তিশালীকরণে কমিউনিটি রেডিও কেন্দ্র, দূরদর্শন ও আকাশবাণী কেন্দ্র এবং স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সমন্বয় বৃদ্ধি করলে গ্রামীণ ও দুর্গম অঞ্চলে জনসম্পৃক্ততা এবং তথ্যপ্রবাহ আরও কার্যকর হবে। এ ধরনের উদ্যোগ অধিক শ্রোতা ও দর্শক আকৃষ্ট করতেও সহায়ক হবে। নিয়মিত মূল্যায়ন ব্যবস্থায় উত্তর-পূর্বাঞ্চলে প্রসার ভারতীর অনুষ্ঠানের নিয়মিত মূল্যায়ন করা উচিত, এতে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করা যায় এবং নীতিগত লক্ষ্য সমূহের কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা যায়। উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সম্প্রচার ও যোগাযোগ পরিষেবার উন্নয়ন সংক্রান্ত বিষয় গুলো পর্যালোচনাক্রমে সংশ্লিষ্ট স্ট্যান্ডিং কমিটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন সাংসদ কণাদ পুরকায়স্থ ।



