আল-আকসা দখলের পথে ইজরায়েল, জরুরি বৈঠকে জর্ডান

Spread the news

৫ আগস্ট : জেরুজালেমের পবিত্র আল-আকসা মসজিদ ও ডোম অব দ্য রক ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। ইজরায়েলের উগ্র ডানপন্থি সরকারের ধারাবাহিক পদক্ষেপে কয়েক দশক ধরে চলমান ‘স্থিতাবস্থা’ (স্ট্যাটাস কু) ভেঙে আল-আকসার ওপর কার্যত ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে জর্ডান। এ পরিস্থিতিকে পুরো মুসলিম বিশ্বের জন্য বিপজ্জনক আখ্যা দিয়ে আরব লিগভুক্ত দেশগুলোর পাশাপাশি তুরস্ক, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার বিদেশমন্ত্রীদের নিয়ে জরুরি বৈঠক আহ্বান করেছে আম্মান। মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান এ তথ্য জানিয়েছে।

আজ বুধবার অনুষ্ঠিতব্য এই বৈঠকের সভাপতিত্ব করবেন জর্ডানের বিদেশমন্ত্রী আয়মান সাফাদি। বৈঠকে আল-আকসা প্রাঙ্গণের বর্তমান পরিস্থিতি, ইসরায়েলের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ, আন্তর্জাতিক আইনের সম্ভাব্য লঙ্ঘন এবং পবিত্র স্থানটির ঐতিহাসিক মর্যাদা রক্ষায় যৌথ কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা হবে বলে কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে

জর্ডানের উদ্বেগের মূল কারণ, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আল-আকসা প্রাঙ্গণে ইহুদি উগ্রপন্থি বসতি স্থাপনকারী ও ডানপন্থি রাজনীতিকদের প্রবেশ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গত ২৩ জুলাই ইজরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির-এর নেতৃত্বে কয়েক হাজার ইজরায়েলি, যাদের বড় অংশই পশ্চিম তীরের অবৈধ বসতি স্থাপনকারী, কড়া পুলিশি নিরাপত্তার মধ্যে আল-আকসা প্রাঙ্গণে প্রবেশ করে। সেখানে তারা প্রার্থনা, ধর্মীয় আচার পালন এবং ইজরায়েলের পতাকা প্রদর্শন করে, যা দীর্ঘদিনের প্রচলিত ব্যবস্থার সরাসরি লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

১৯৬৭ সালের পর থেকে কার্যকর থাকা ঐতিহাসিক ‘স্থিতাবস্থা’ অনুযায়ী, আল-আকসা প্রাঙ্গণের প্রশাসনিক দায়িত্ব জর্ডানের ইসলামিক ওয়াক্‌ফের হাতে এবং সেখানে কেবল মুসলিমরাই ইবাদত করতে পারেন। অমুসলিমরা নির্দিষ্ট নিয়মে দর্শনার্থী হিসেবে প্রবেশ করতে পারলেও ধর্মীয় আচার পালনের অনুমতি নেই। তবে বেন-গভির ও তার সমর্থকরা দীর্ঘদিন ধরেই এই ব্যবস্থায় পরিবর্তন এনে ইহুদিদের নিয়মিত উপাসনার অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে আসছেন।

জর্ডানের কর্মকর্তারা বলছেন, বেন-গভিরের সাম্প্রতিক সফর ও প্রার্থনা আধুনিক ইতিহাসে আল-আকসার মর্যাদার ওপর সবচেয়ে গুরুতর হস্তক্ষেপগুলোর একটি। একই সঙ্গে ‘টেম্পল মাউন্ট’ এলাকায় বিশেষ পুলিশ ইউনিট গঠন এবং আসন্ন ইহুদি ধর্মীয় উৎসবকে সামনে রেখে নিরাপত্তা জোরদারের পরিকল্পনাও আম্মানের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তাদের আশঙ্কা, এসব পদক্ষেপ ভবিষ্যতে স্থায়ী নীতিগত পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করতে পারে।

দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জর্ডানের বিদেশমন্ত্রী আয়মান সাফাদি বলেন, “এটি একটি অব্যাহত ও অত্যন্ত বিপজ্জনক হুমকি। আমাদের হাতে থাকা সব কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক উপায় ব্যবহার করে আমরা এটি মোকাবিলা করছি। আল-আকসার বিদ্যমান অবস্থায় যেকোনও হস্তক্ষেপ কেবল ফিলিস্তিন বা জর্ডানেই নয়, পুরো মুসলিম বিশ্বে ধর্মীয় সংঘাতের আগুন ছড়িয়ে দিতে পারে।”

আল-আকসা মসজিদের তত্ত্বাবধানে জর্ডানের ভূমিকা শতাব্দীপ্রাচীন। অটোমান শাসনামল থেকে শুরু হওয়া এই দায়িত্ব ১৯৯৪ সালের ইজরায়েল-জর্ডান শান্তিচুক্তিতেও স্বীকৃতি পায়। ফলে পবিত্র স্থানটির প্রশাসনিক কাঠামোয় পরিবর্তনের যেকোনো উদ্যোগকে জর্ডান শুধু ধর্মীয় নয়, আন্তর্জাতিক চুক্তি লঙ্ঘনের বিষয় হিসেবেও দেখছে।

এদিকে, জর্ডানের উদ্বেগ শুধু আল-আকসা কেন্দ্রিক নয়। পশ্চিম তীরে ইজরায়েলের সামরিক অভিযান ও বসতি সম্প্রসারণের ফলে বিপুলসংখ্যক ফিলিস্তিনিকে জোরপূর্বক জর্ডানে ঠেলে দেওয়ার আশঙ্কাও করছে দেশটি। আম্মানের ভাষ্য, এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে জর্ডানের অর্থনীতি, জনসংখ্যাগত ভারসাম্য এবং জাতীয় নিরাপত্তার ওপর ভয়াবহ চাপ সৃষ্টি হবে। বর্তমানে প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ জনসংখ্যার দেশ জর্ডানে উল্লেখযোগ্য অংশই ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত।

অন্যদিকে, গাজা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে জর্ডানের কঠোর সমালোচনার জেরে দুই দেশের সম্পর্কও তলানিতে নেমেছে। জর্ডানের অভিযোগ, ইজরায়েল দেশটির জন্য নির্ধারিত পানির সরবরাহ অর্ধেকে নামিয়ে এনেছে, যা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, নিরাপত্তা, পানি, সীমান্ত এবং ফিলিস্তিন প্রশ্নে দুই দেশের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে।

জর্ডানের ইসলামপন্থি উম্মা পার্টির সংসদ সদস্য ও মুখপাত্র দিমা তাহবুব বলেন, পশ্চিম তীর দখল সম্প্রসারণ, পানি চুক্তি নিয়ে বিরোধ এবং আল-আকসায় ধারাবাহিক হস্তক্ষেপের কারণে জর্ডানে ইজরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখার বিরোধিতা আগের যেকোনও সময়ের তুলনায় বেড়েছে। তার অভিযোগ, প্রতিদিনই ইহুদি বসতি স্থাপনকারীরা আল-আকসা প্রাঙ্গণে প্রবেশ করছে, অথচ একই সময়ে বহু ফিলিস্তিনি মুসল্লিকে সেখানে প্রবেশে বাধা দেওয়া হচ্ছে।
খবর : দৈনিক ইনকিলাব পত্রিকা ডিজিটাল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *