।। প্রদীপ দত্তরায় ।।
(লেখক ছাত্র সংগঠন আকসার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও গৌহাটি হাইকোর্টের আইনজীবী)
১৪ সেপ্টেম্বর : বিগত শিক্ষক দিবসের অনুষ্ঠানে আসামের শিক্ষামন্ত্রী ডাঃ রণোজ পেগু একটি তথ্য তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন যে ১৫ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে যারা এই বছরে সরকারি স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেনীতে ভর্তি হয়েছিল তাঁদের মধ্যে সাড়ে পাঁচ লাখ ছাত্র দু’তিন মাস ক্লাস করার পর আর স্কুলে আসছে না। তিনি বলেছেন এই ব্যাপারে একটি এন জি ওর সাথে চুক্তি হয়েছে, যাঁরা আগামী এক মাস মাঠ পর্যায়ে কাজ করে এর প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান তথা এদের, বিশেষতঃ ছাত্রীদের পাঠকক্ষে ফিরিয়ে আনার জন্য কি করনীয় তার একটি রুপরেখা সরকারকে অবগত করবে।
এই খবর অবশ্যই সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সরকারি শিক্ষা ব্যাবস্থা নিয়ে ইদানিং কোকরোচ জনতা পার্টি ( সিজেপি) বিভিন্ন প্রশ্ন তুলেছে এবং এরফলে এই নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে এক বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে। তাঁদের ‘স্কুল ঠিক করো’ কর্মসূচি তথা এই সম্পর্কিত দাবিদাওয়া নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে,যা অবশ্যই শুভলক্ষণ। আসুন, অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক এবং প্রয়োজনীয় এই বিষয় নিয়ে একটু বিস্তারে বোঝার চেষ্টা করা যাক।
সিজেপির ‘সরকারি স্কুল বাঁচাও’ আন্দোলনের দাবিসমূহের মূলত তিনটি প্রধান দিক রয়েছে:
১. সরকারি স্কুলের পরিকাঠামো ও বুনিয়াদি গুণমান ফিরিয়ে আনা: নিরাপদ স্কুল ভবন, সচল শ্রেণিকক্ষ, শৌচাগার ও পরিচ্ছন্নতা, মিড-ডে মিলের পর্যাপ্ত খাবার/মৌলিক সুযোগ-সুবিধা এবং সঠিক পরিকাঠামো নিশ্চিত করা। সিজেপি সরকারি স্কুলগুলোর নাগরিক অডিট (civil audit) পরিচালনা করারও চেষ্টা করছে।
২. পর্যাপ্ত শিক্ষক এবং পঠনপাঠনের সময় নিশ্চিত করা: উদাহরণস্বরূপ, তাদের সাম্প্রতিক বেঙ্গালুরু পরিদর্শনে শিক্ষক ঘাটতি এবং শিক্ষকদের পঠনপাঠন ছাড়া অন্যান্য প্রশাসনিক কাজে (যেমন SIR সংক্রান্ত কাজ) নিয়োজিত করার বিষয়টি সামনে এসেছে। বিপজ্জনক ছাদের কারণে শ্রেণীকক্ষ বন্ধ থাকার কথাও তারা রিপোর্টে জানিয়েছে।
৩. সরকারি স্কুলগুলোকে এতটাই নির্ভরযোগ্য করে তোলা যাতে মন্ত্রী, আমলা, প্রধান শিক্ষক এবং শিক্ষকরা নিজেরাই তাদের ছেলেমেয়েদের সেখানে পড়াতে দ্বিধাবোধ না করেন: সিজেপি প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে এই প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলোকে খোলা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন যেন তারা নিজেদের ছেলেমেয়েদের সরকারি স্কুলে ভর্তি করিয়ে এই ব্যবস্থার প্রতি আস্থা প্রমাণ করেন।
এবারে আসুন, তথ্যের আধারে এই দাবিগুলির যৌক্তিকতা বুঝে নেওয়া যাক। মজার ব্যাপার হচ্ছে , সিজেপির দাবিতে যে বিষয়গুলো তোলা হয়েছে,সেই সমস্ত বিষয়কেই নতুন জাতীয় শিক্ষানীতি,২০২০ এ প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
নতুন শিক্ষানীতির মূল লক্ষ্য ধরা হয়েছে সকল শিশুর জন্য সমতাভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করা। এর জন্য প্রাথমিক স্তরে পড়া, লেখা ও মৌলিক গণিতের দক্ষতা অর্জন, নিরাপদ ও পর্যাপ্ত স্কুলের পরিকাঠামো—যেমন শ্রেণিকক্ষ, পানীয় জল, শৌচাগার, বিদ্যুৎ ও প্রতিবন্ধীবান্ধব সুবিধা—নিশ্চিত করা এবং পর্যাপ্ত ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক নিয়োগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
মুখস্থনির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে বিষয় বোঝা, যুক্তিবোধ, সমস্যা সমাধান ও বাস্তব দক্ষতা অর্জনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি শিক্ষকদের অশিক্ষামূলক কাজে অতিরিক্ত ব্যবহার কমানো, পিছিয়ে পড়া শিশুদের জন্য বিশেষ সহায়তা, পরীক্ষাব্যবস্থার সংস্কার এবং শিক্ষা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে। সামগ্রিকভাবে, শুধু শিশুদের স্কুলে ভর্তি করানো নয়, বরং নিরাপদ পরিবেশে পর্যাপ্ত শিক্ষক ও প্রয়োজনীয় সম্পদের মাধ্যমে প্রতিটি শিশুর প্রকৃত শিক্ষা নিশ্চিত করাই জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০-এর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এর মধ্যে সিজেপির তোলা অধিকাংশ দাবিই অন্তর্ভুক্ত।
ভারতের স্কুলগুলির সামগ্রিক পরিকাঠামো সম্বন্ধে জনমনে যতটা ঋনাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে, বাস্তবে তা ততটা খারাপ নয়। নিচের পরিসংখ্যান তার প্রমাণ দিচ্ছে। শিক্ষা বিষয়ক সংযুক্ত জেলা তথ্য ব্যাবস্থা ( UDISE )র দেওয়া
ভারতে মোট সরকারি স্কুলের সংখ্যা: প্রায় ১০ লাখ এবং শিক্ষক শিক্ষিকার মোট সংখ্যা প্রায় ১ কোটি। এতে বিভিন্ন সুবিধা সম্বলিত স্কুলের সংখ্যা-
কার্যকরী বিদ্যুৎ সংযোগ: ৯২.৩%
কার্যকরী পানীয় জলের সুবিধা: ৯৯%
কার্যকরী শৌচাগার: ৯৫.৮%
গ্রন্থাগার: ৯৩.৪%
কম্পিউটার: ৬০.২%
ইন্টারনেট: ৫৮.৬%
স্মার্ট ক্লাসরুম: ২৮.৬%
স্কুলপ্রতি গড় শিক্ষকের সংখ্যা: ৬.৯
গড় শিক্ষার্থী- শিক্ষক অনুপাত: ২৪.১
তবে একক শিক্ষক/ শিক্ষিকা যুক্ত স্কুলের সংখ্যা প্রায় এক লক্ষ।
এবং অবশ্যই এইসব ক্ষেত্রে রাজ্য ভিত্তিক সংখ্যায় তারতম্য রয়েছে।
এখানে উল্লেখ্য যে উপরোক্ত পরিসংখ্যান থেকে বিভিন্ন সুবিধার সংখ্যাতত্ত্ব পাওয়া গেলেও এসবের গুনগত মান নিয়ে অবশ্যই প্রশ্নচিহ্ন রয়েছে। স্কুল ভবনের দুরবস্থা নিয়ে জেন আলফাদের সাম্প্রতিক বিভিন্ন আন্দোলন বা সিজেপির নাগরিক অডিটের ফলাফল তারই ইঙ্গিতবাহী। তবে সবকিছুর পরও এটা স্বীকার্য যে শিক্ষার সার্বিক পরিকাঠামো উন্নয়নে ভারত অনেকটা পথ অগ্রসর হয়েছে।
২০২৪–২৫ সালে দেশে ৩.৪০ লক্ষ অনুদান বিহীন স্বীকৃত বেসরকারি স্কুলে-এ প্রায় ৯.৫৯ কোটি শিক্ষার্থী ছিল—অর্থাৎ বেসরকারি শিক্ষা আর প্রান্তিক ব্যবস্থা নয়, ভারতের স্কুলশিক্ষার একটি বিশাল অংশ।
বেসরকারি স্কুল গুলিকে মোটামুটি তিনটি স্তরে ভাগ করা যায়—স্বল্প-ফির স্থানীয় স্কুল, মধ্যম-ফির ইংরেজি-মাধ্যম স্কুল এবং উচ্চ-ফির উন্নতমানের স্কুল। প্রথম ধরনের স্কুলে সাধারণত নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানরা পড়ে। দ্বিতীয় ধরনের স্কুলে তুলনামূলক উন্নত শিক্ষা, ইংরেজি ভাষা, শৃঙ্খলা ও নিয়মিত পাঠদানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। তৃতীয় ধরনের স্কুলে উন্নত ভবন, প্রযুক্তি, খেলাধুলা ও অন্যান্য সহশিক্ষামূলক সুবিধার পাশাপাশি অত্যন্ত বেশি ফি নেওয়া হয়।
ফি-এর ক্ষেত্রেও ব্যাপক বৈষম্য রয়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, প্রাথমিক স্তরে একজন শিক্ষার্থীর গড় বার্ষিক শিক্ষাব্যয় সরকারি প্রতিষ্ঠানে যেখানে প্রায় ১,২৫৩ টাকা, বেসরকারি অনুদানবিহীন প্রতিষ্ঠানে তা প্রায় ১৪,৪৮৫ টাকা। তবে এটি ২০১৭–১৮ সালের জাতীয় সমীক্ষার তথ্য; বর্তমানে প্রকৃত ফি অনেক বেশি হওয়াই বাস্তব। স্বল্প-ফির স্কুল থেকে অত্যন্ত ব্যয়বহুল স্কুল পর্যন্ত এই বিশাল ব্যবধান বেসরকারি শিক্ষার অভ্যন্তরেও যথেষ্ট বৈষম্য সৃষ্টি করেছে।
শিক্ষার্থীর পারিবারিক আর্থিক অবস্থা, বাবা-মায়ের শিক্ষাগত যোগ্যতা, বসবাসের স্থান এবং বাড়িতে পড়াশোনার পরিবেশ শিক্ষার ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। আর্থিকভাবে সচ্ছল পরিবার শুধু বেশি ফি দিতে পারে না; তারা সন্তানকে বাড়তি শিক্ষক, বই, ইন্টারনেট, প্রযুক্তি ও অন্যান্য শিক্ষার সুযোগও দিতে পারে। তাই বেসরকারি স্কুলের শিক্ষার্থীদের ভালো ফল কতটা স্কুলের শিক্ষার অংশ এবং কতটা পারিবারিক সুবিধার ফল তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
এই কারণেই বেসরকারি শিক্ষার প্রসার একদিকে শিক্ষার মান ও অভিভাবকের পছন্দের সুযোগ বাড়ালেও, অন্যদিকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্যকে শিক্ষার মাধ্যমে আরও গভীর করছে । সরকারি স্কুলের প্রধান শক্তি হল কম খরচে সব শ্রেণির শিশুর জন্য শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা। তাই প্রকৃত সমতা মানে বেসরকারি শিক্ষা বন্ধ করা নয়; বরং এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য সন্তানের শিক্ষার মান ও ভবিষ্যৎ নির্ধারণের প্রধান কারণ না হয়। বেসরকারি স্কুলের ভালো দিকগুলি গ্রহণ করে সরকারি স্কুলের শিক্ষকতা, পরিকাঠামো, শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি উন্নত করাই হতে পারে অধিকতর ন্যায়সঙ্গত পথ।
কেজরিওয়াল নেতৃত্বাধীন দিল্লি সরকার সরকারি স্কুলশিক্ষাকে বিশেষ অগ্রাধিকার দিয়ে পরিকাঠামো, শ্রেণিকক্ষ, স্কুলের পরিবেশ এবং শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার ফলাফলে উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটায়। শিক্ষাখাতে বরাদ্দ ২০১৪–১৫ সালের ৬,৫৫৪ কোটি থেকে বেড়ে ২০২৪–২৫ সালে ১৬,৩৯৬ কোটিতে পৌঁছায়। সরকারের হিসাবে, ২০১৫–২০২৪ সময়কালে ২২,৭১১টি নতুন শ্রেণিকক্ষ তৈরি হয়; পাশাপাশি স্কুল ভবন, বিজ্ঞানাগার, গ্রন্থাগার, স্মার্ট শ্রেণিকক্ষ, খেলাধুলার পরিকাঠামো ও শ্রেণিকক্ষের আসবাবেরও উন্নতি করা হয়।
তবে এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য সম্ভবত সরকারি স্কুল সম্পর্কে জনমানসের ধারণার পরিবর্তন—সরকারি স্কুলকে ক্রমশ বেসরকারি স্কুলের বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প হিসেবে দেখা শুরু হয়। এর প্রতিফলন বোর্ডের ফলেও দেখা যায়: ২০২৫ সালে দিল্লির সরকারি স্কুলে দ্বাদশ শ্রেণির পাশের হার ছিল ৯০.৫%, যেখানে বেসরকারি স্বতন্ত্র স্কুলে তা ছিল ৮৭.৯%; ২০২৪ সালেও সরকারি স্কুলের পাশের হার ছিল ৯৬.৯৯%।
তবে এই পরিবর্তন সম্পূর্ণ সফল বললে ভুল হবে। শিক্ষক-ঘাটতি, স্কুলগুলির মধ্যে মানের বৈষম্য এবং এখনও কিছু স্কুলে দুই পালায় পাঠদান সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। তাছাড়া শুধু বোর্ড পরীক্ষার ফল দিয়ে প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি বা সামগ্রিক শিক্ষার মানের উন্নতি বিচার করা যায় না। তাই কেজরিওয়াল সরকারের শিক্ষাক্ষেত্রের রেকর্ডকে দিল্লির সরকারি স্কুলব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য শক্তিবৃদ্ধি ও তার প্রতি জনআস্থা বৃদ্ধির সাফল্য হিসেবে অবশ্যই স্বীকৃতি দিতে হবে।
তবে পুরো ব্যবস্থাকে সমানভাবে ‘বিশ্বমানের’ করে তোলার দাবি অনেকটাই অতিরঞ্জিত।
শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতির জন্য সরকারি বিনিয়োগ অপরিহার্য, কিন্তু বেশি অর্থ বরাদ্দ হলেই শিক্ষার মান একই অনুপাতে বাড়ে—এমন সরল সম্পর্ক ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের তথ্য থেকে দেখা যায় না। ২০২৬–২৭ সালে দিল্লি তার মোট ব্যয়ের ২১.১% শিক্ষা খাতে বরাদ্দ করেছে, অসম ১৭.৫%—উভয়ই ভারতের রাজ্যগুলির ২০২৫–২৬ সালের গড় ১৪.৫%-এর চেয়ে বেশি। অন্যদিকে কেরল ১৩.৬% এবং তামিলনাড়ু মাত্র ১২.২% বরাদ্দ করেছে; উত্তরপ্রদেশের বরাদ্দ ১২.৮%। অথচ শিক্ষার ফলাফলে এই ক্রমটি উল্টে যায়। অর্থাৎ বাজেটের আকার গুরুত্বপূর্ণ হলেও অর্থের পরিমাণ একা শিক্ষার মান নির্ধারণ করে না।
এর একটি ভালো উদাহরণ শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত। ২০২৪–২৫ সালের সরকারি তথ্য অনুযায়ী প্রাথমিক স্তরে প্রতি শিক্ষকের বিপরীতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা অসমে ১৯, তামিলনাড়ু ও উত্তরপ্রদেশে ২০, কেরলে ২২, কিন্তু দিল্লিতে ২৯। উচ্চ-প্রাথমিক স্তরেও অসমে অনুপাত ১৩, তামিলনাড়ুতে ১৮, কেরলে ১৮, উত্তরপ্রদেশে ২২, অথচ দিল্লিতে ২৮। অর্থাৎ বেশি শিক্ষা বাজেট থাকা সত্ত্বেও দিল্লিতে প্রাথমিক স্তরে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত অসম বা তামিলনাড়ুর তুলনায় ভালো নয়। আবার শুধু শিক্ষক সংখ্যা দেখেও শিক্ষার মান বিচার করা যায় না। ২০২৪–২৫ সালে দেশে মোট শিক্ষকের সংখ্যা প্রথমবার এক কোটির বেশি হয়েছে এবং সামগ্রিক শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাতও উন্নত হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন হল—এই শিক্ষক ও পরিকাঠামোর মাধ্যমে শিশুরা কতটা শিখছে। এখানেই শিক্ষণ-ফল (Learning Outcome) বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। এর অর্থ হল, একটি নির্দিষ্ট শ্রেণিতে পড়া শিশু বাস্তবে কী করতে পারে—যেমন একটি সহজ লেখা পড়ে বুঝতে পারে কি না, নিজের ভাষায় উত্তর দিতে পারে কি না, অথবা প্রয়োজনীয় অঙ্ক করতে পারে কি না। অর্থাৎ শুধু স্কুলে ভর্তি হওয়া বা পরীক্ষায় পাশ করাই শিক্ষণ-ফল নয়; শিশু বাস্তবে জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করেছে কি না সেটিই মূল বিষয়।
এই পার্থক্যটি আরও স্পষ্ট হয় এ্যনুয়াল স্ট্যাটাস অফ এডুকেশনাল রিপোর্ট,২০২৪( ASER,2024)-এর ফলাফলে। গ্রামীণ সরকারি স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির কত শতাংশ শিশু দ্বিতীয় শ্রেণির স্তরের একটি সহজ লেখা পড়তে পারে—এটিকে মৌলিক শিক্ষণ-ফলের একটি মাপকাঠি হিসেবে ধরা যায়। ২০২৪ সালে এই হার কেরলে প্রায় ৫৮%, উত্তরপ্রদেশে ৫০.৫%, তামিলনাড়ুতে ৩৭% এবং অসমে ৩২.৫%; সর্বভারতীয় সরকারি স্কুলের এই হার ছিল ৪৪.৮%। অষ্টম শ্রেণিতেও সরকারি স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণির স্তরের লেখা পড়তে পারার হার কেরলে প্রায় ৮২%, উত্তরপ্রদেশে ৬৭%, তামিলনাড়ুতে ৬২% এবং অসমে ৬১%। আবার উত্তরপ্রদেশের মতো একটি রাজ্যে ২০২২ থেকে ২০২৪-এর মধ্যে সরকারি স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির পড়ার সক্ষমতায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে, যদিও তার শিক্ষা বাজেটের অংশ দিল্লি বা অসমের তুলনায় কম।
ফলে এই তুলনা থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার হয়—সরকারি বিনিয়োগ শিক্ষার উন্নতির প্রয়োজনীয় ভিত্তি তৈরি করে, কিন্তু বিনিয়োগের পরিমাণ এবং শিক্ষার্থীর বাস্তব শেখার মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক সূচিত করেনা । একই অর্থে বেশি ব্যয় কোথাও পরিকাঠামো উন্নত করেছে, কোথাও শিক্ষক-ব্যবস্থা শক্তিশালী করেছে, আবার কোথাও সেই বিনিয়োগের শিক্ষণ-ফলে প্রতিফলন তুলনামূলকভাবে কম দেখা গেছে।
উপরোক্ত তথ্য থেকে এটা স্পষ্ট যে শুধু বাজেট বাড়িয়েই সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতি সম্ভব নয়। দরকার শিক্ষার মান, শিক্ষক, পরিকাঠামো ও জবাবদিহিতা—এই চারটি ক্ষেত্রে সমন্বিত সংস্কার ।
শিক্ষকের ঘাটতি পূরণ ও মানোন্নয়ন: শূন্যপদ দ্রুত পূরণ, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ এবং নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
প্রাথমিক শিক্ষায় মৌলিক দক্ষতাকে অগ্রাধিকার: তৃতীয় শ্রেণির মধ্যেই প্রতিটি শিশুর পড়া, লেখা ও মৌলিক গণিতের দক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে। দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়মিত অতিরিক্ত সহায়তা প্রয়োজন।
বিদ্যালয়ের পরিকাঠামো সম্পূর্ণ করা:নিরাপদ ভবন, পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, বিদ্যুৎ, পানীয় জল, পৃথক শৌচাগার, গ্রন্থাগার, খেলার মাঠ, প্রতিবন্ধীবান্ধব ব্যবস্থা ও প্রয়োজনীয় শিক্ষাসামগ্রী নিশ্চিত করতে হবে।
শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত ও শ্রেণিকক্ষের চাপ কমানো: অতিরিক্ত ভিড়ের বিদ্যালয়ে নতুন শ্রেণিকক্ষ ও শিক্ষক নিয়োগ করা জরুরি।
শিক্ষার ফলাফল নিয়মিত পরিমাপ: শুধু পরীক্ষায় পাশের হার নয়, পড়া বোঝা, লেখা, গণিত ও বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানকে নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে এবং ফলাফল প্রকাশ করে দুর্বল বিদ্যালয়গুলিতে বিশেষ হস্তক্ষেপ করতে হবে।
বিদ্যালয় পরিচালনায় জবাবদিহিতা: প্রধান শিক্ষককে পর্যাপ্ত প্রশাসনিক ক্ষমতা দিয়ে শিক্ষক উপস্থিতি, পাঠদান ও শিক্ষার্থীর অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
ডিজিটাল ও গ্রন্থাগার সুবিধা সম্প্রসারণ: প্রযুক্তিকে শিক্ষকের বিকল্প নয়, বরং শিক্ষাদানের সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করতে হবে।
অভিভাবক ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ:বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটিকে কার্যকর করে বিদ্যালয়ের কাজ ও শিক্ষার ফলাফলের সামাজিক নজরদারি বাড়াতে হবে।
বঞ্চিত শিশুদের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা: দরিদ্র, প্রথম-প্রজন্মের শিক্ষার্থী, মেয়েশিশু এবং প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি, পুষ্টি, শিক্ষা-সহায়ক সামগ্রী ও প্রয়োজনভিত্তিক সহায়তা বাড়াতে হবে।
অর্থ বরাদ্দের কার্যকর ব্যবহার: শুধু বরাদ্দ বৃদ্ধি নয়, প্রতি শিক্ষার্থীর পেছনে ব্যয়ের ফলাফল এবং বিদ্যালয়ভিত্তিক উন্নয়নকে পরিমাপ করা প্রয়োজন।
সিজেপির সদস্যরা দাবি করেছেন সরকারি নেতামন্ত্রী সহ আধিকারিকদের নিজেদের ছেলেমেয়েদের সরকারি স্কুলে ভর্তি করে সরকারি শিক্ষা ব্যাবস্থার প্রতি তাদের দায়বদ্ধতার প্রমাণ দিতে হবে। কেউ কেউ সরকারি স্কুল শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও একই দাবি তুলছেন। এই দাবি বিতর্কিত, হয়তো অবাস্তব, হয়তোবা কিছুটা রাজনৈতিক গিমিকও হতে পারে। তবে এর পেছনে যে অস্বস্তিকর সত্য লুকিয়ে আছে তাকে অস্বীকার করার জো নেই। এই বিতর্ক বাদ দিলেও দাবি অবশ্যই উঠতে পারে যে সরকারি স্কুলগুলোকে এতটাই উন্নত করতে হবে যাতে অভিভাবকরা স্বেচ্ছায় সরকারি স্কুলকে বেছে নেন। এবং এটি যে অবাস্তব দাবি নয় দিল্লিতে আংশিক স্তরে হলেও তা প্রমানিত হয়েছে।
সাম্প্রতিক জেন আলফা এবং সিজেপির আন্দোলন এই কারণেই আরো প্রাসঙ্গিক কারন এইসব আন্দোলন রাজনৈতিক বয়ানবাজির বিপক্ষে দাঁড়িয়ে স্কুলের নিরীক্ষা এবং প্রকৃত অবস্থা নিয়ে সরাসরি সরকারকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছে এবং মুখোমুখি সংঘাতের জন্ম দিচ্ছে।
সরকারি শিক্ষা ব্যাবস্থার উন্নয়নে এবার সরকার আরো মনোযোগী হবেন এই আশা করাই যায়।
(মতামত লেখকের ব্যক্তিগত)



